
শিল্পোন্নত বিশ্বের কারখানাগুলোর বিষাক্ত ধোঁয়া, বর্জ্য আর কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে গিয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে দিনকে দিন বিষাক্ত ও বিপজ্জনক করে তুলছে। এতে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু বদলে গিয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসছে। এসব বিপর্যয় ঠেকাতে গেল কয়েক দশক ধরে বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার দাবি সারাবিশ্বে জোরালো হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পোন্নত দেশগুলো এ ব্যাপারে বরাবরই নীরব ভূমিকা পালন করে চলেছে। অথচ সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণ করেও বেশি ক্ষতির শিকার হওয়া শিল্প সম্প্রসারণমুখী দেশগুলো এ ব্যাপারে ইতিবাচক উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশেষ করে একেবারেই নামমাত্র কার্বন নিঃসরণকারী দেশ হয়েও বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব শিল্প-কারাখানা স্থাপনে বিশ্বে অগ্রনায়ক হিসেবে নজির সৃষ্টি করেছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ধারায় বিশ্বজুড়ে যে সবুজ শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছে, সে যাত্রাতেও নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।
পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনে বিশ্বজুড়ে বিপ্লব সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে দেশের প্রধান রফতানিখাত পোশাক শিল্পে পরিবেশসহায়ক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ সবুজ কারখানা স্থাপন করে নজির সৃষ্টি করেছে। বিশ্বে পোশাক খাতে সবুজ শিল্প সবচেয়ে বেশি এখন বাংলাদেশেই। এই সংখ্যা বর্তমানে দেড়শ। তবে দিন দিন এ সংখ্যা বেড়েই চলছে। আবার পরিবেশবান্ধব সর্বোচ্চমানের শিল্পকারখানার বিবেচনাতেও এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এসব কারণেই সম্প্রতি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৬) বাংলাদেশের সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে মানবিক প্রতিচ্ছবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে তাঁকে ভূষিত করা হয়েছে ‘এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কারে’।
সূত্রমতে, বিশ্বসেরা ১০০টি কারখানার মধ্যে ৪৩টিই এখন বাংলাদেশে অবস্থিত। এর পরের অবস্থানই রয়েছে ইটালি, আয়ারল্যান্ড, মেক্সিকো, পোল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ। মূলত, সবুজ শিল্পের তালিকায় শিল্পোন্নত ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোকে টপকে গেছে বাংলাদেশ। সবুজ শিল্পায়নে সাফল্যের জন্য পৃথিবীর প্রথম ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনকে (বিজিএমইএ) ‘২০২১ লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি)। আরো অন্তত ৫০০ সবুজ কারখানা সনদের অপেক্ষায় রয়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্বের সেরা ১০ সবুজ পোশাক কারখানার মধ্যে সাতটি বাংলাদেশের। এসব কারখানা হচ্ছে এনভয় টেক্সটাইল, রেমি হোল্ডিংস, প্লামি ফ্যাশনস, ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও, এসকিউ সেলসিয়াস, জেনেসিস ফ্যাশনস ও জেনেসিস ওয়াশিং এবং এসকিউ কোলবেন্স ও এসকিউ বিরিকিনা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ১৫০টি কারখানা শক্তি ও পরিবেশগত ডিজাইন (এলইইডি) সার্টিফিকেশন পেয়েছে তার মধ্যে ৪৪টি কারখানা প্লাটিনাম, ৯৩টি স্বর্ণ, নয়টি রৌপ্য এবং চারটি রয়েছে সীসা ক্যাটাগরিতে।
সূত্রমতে, বিগত ২০১২ সালের মে মাসে বাংলাদেশের ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও বিশ্বের প্রথম এলইইডি প্লাটিনাম সার্টিফায়েড কারখানা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে সবুজ কারখানার খেতাব পাওয়া বাংলাদেশের তিনটি পোশাক কারখানা হচ্ছে রেমি হোল্ডিংস, তারাসিমা অ্যাপারেলস এবং প্লামি ফ্যাশনস। ২০১৩ সালে রাজধানীতে রানা প্লাজা ভবন ধসে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণ হারান এক হাজার ১৩৪ জন। সেই ঘটনার পর সবুজ উদ্যোগে প্রচুর বিনিয়োগ আসতে থাকে পোশাক উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে।
শুধু রাজধানী বা আশপাশের এলকাতেই নয়, ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও সবুজ কারাখানার পরিধি বেড়ে চলেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল, রংপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, হবিগঞ্জ, যশোর, পাবনা ও মানিকগঞ্জে বহু সবুজ কারাখানা স্থাপন করা হয়েছে। গেল প্রায় এক দশক ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনাইটেড স্টেটস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল’ থেকে ধারণা নিয়ে দেশীয় উদ্যোক্তারা গ্রিন ফ্যাক্টরি বা সবুজ কারখানা তৈরিতে মনোযোগী হয়েছেন। মূলত কাউন্সিলের সার্টিফিকেট নিয়েই নতুন যাত্রা শুরু করেছে দেশের পোশাক খাত।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসানের মতামত হচ্ছে, পোশাক খাতে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার পর আমরা শিল্পটিকে পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ নিই। গত এক দশকে উদ্যোক্তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, নিরাপত্তা খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় এবং সরকার-ক্রেতা-উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় আজ আমাদের পোশাকশিল্প একটি নিরাপদ শিল্প হিসেবে বিশ্বে রোল মডেল হয়েছে।
আনন্দবাজার/শহক








