রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে চলছে অর্থনৈতিক টানপোড়েন। বেড়েছে মুদ্রাস্ফীতি, কমেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। পরিস্থিতি সামলাতে বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে আমদানি নানা পণ্যে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। তবে দেশের স্বার্থে খাদ্যপণ্য রপ্তানি বন্ধের পদক্ষেপ নেয়ারও ঘোষণা দিয়েছে কিছু দেশ। করোনায় উৎপাদন ব্যহত হওয়া এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে গম ও ভোজ্যতেলে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখছে বিশ্ব। এর মধ্যে ভারতের চিনি রপ্তানি সংকোচনের খবরে সংকট আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত ৬ বছরে প্রথমবারের মতো চিনি রপ্তানি সীমিতকরণের ঘোষণা দিয়েছে ভারত। চলতি মৌসুমে ১০ মিলিয়ন টনের বেশি চিনি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারির ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। দেশের বাজারে উচ্চমূল্য রোধ করতেই ভারতের এমন সিদ্ধান্ত। ফলে তেল এবং গমের পর এবার চিনি নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের শীর্ষ চিনি গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং দুবাই।
ভারত বিশ্বের বৃহত্তম চিনি উৎপাদনকারী এবং ব্রাজিলের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। স্থানীয় দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে চিনি রপ্তানি কমানোর পরিকল্পনা করছে ভারত। ভারতের এ পরিকল্পনার কথা জানার পর হতেই লন্ডনে সাদা চিনির দাম ১ শতাংশের ওপর বৃদ্ধি পায়।
শুরুতে ভারত ৮ মিলিয়ন টনের বেশি চিনি রপ্তানি না করার কথা ভাবছিল। কিন্তু পরে উৎপাদনের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী বিবেচনা করে, সরকার কারখানাগুলোকে আরও কিছু চিনি বিক্রি করার অনুমতি দেয়। ভারতের চিনি উৎপাদনকারী ইন্ডিয়ান সুগার মিলস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, তাদের এবারের উৎপাদন হতে পারে ৩৫.৫ মিলিয়ন টন; যা তাদের আগের অনুমান (৩১ মিলিয়ন টন) থেকে বেশি। ভারতীয় চিনিকলগুলো সরকারি ভর্তুকি ছাড়াই চলতি ২০২১-২২ সালে ৯.১ মিলিয়ন টন চিনি রপ্তানির চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিবদ্ধ ৯ মিলিয়ন টনের মধ্যে ইতোমধ্যেই প্রায় ৮.২ মিলিয়ন টন চিনি রপ্তানি করা হয়েছে।
দেশীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর দেশীয় কারখানার চিনির ১৫ শতাংশ যোগান দেয় ভারত। এই চিনি বন্ধ হয়ে গেলে গম এবং ভোজ্যতেলের মতো চিনির দামও বেড়ে যেতে পারে। পাইকারি বাজারে চিনির দাম গত এক মাসে প্রতি কেজি ২ টাকা থেকে ৩ টাকা বেড়ে ৭৪ টাকায় ঠেকেছে। খুচরা বাজারে এর দাম প্রতি কেজি ৭৮ থেকে ৮০ টাকা। আমদানিকারকদের মতে, ভারতের চিনি রপ্তানি সীমিত করার সিদ্ধান্তের প্রভাব দেশের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। এর আগে মে মাসে ভারত থেকে গম রপ্তানি নিষিদ্ধ করার পরেই বাজারে তার প্রভাব দেখা গিয়েছিল।
সূত্রমতে, গেল ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকারি ১৫টি মিলে যে ৮২ হাজার ১৪০ টন চিনি উৎপাদন হয় গত দুই অর্থবছরে তা কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৪ হাজার ৪৯৬ টনে। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) হিসাবে, গত কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলোতে তিন-চতুর্থাংশ উৎপাদন কমে গেছে। এতে নিজস্ব কয়েক হাজার ডিলারকে দীর্ঘদিন ধরে চিনি বরাদ্দ রেখে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে বিএসএফআইসি। তাছাড়া বছর দুয়েক ধরেই উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, শ্যামপুর, রংপুর, পাবনা ও কুষ্টিয়া সুগার মিলের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে চিনির চাহিদা মেটাতে আমদানিনির্ভরতা থেকে উৎপাদনশীলতায় ফেরার পরামর্শ অনেকের।
ব্যবসায়ীদের মতে, দেশে মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই ব্রাজিল থেকে আসে। তবে ভারত রপ্তানি বন্ধ করলে বৈশ্বিক বাজারেই চিনির দাম বাড়বে। ভারতের মতো সহজ সোর্স বন্ধ হলে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে সংকট তৈরি হবে। অন্যদিকে, ব্রাজিলে চিনির উৎপাদন কম হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বেশি হওয়ায় দেশটিতে আখ-ভিত্তিক ইথানল উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী খাদ্য মূল্যের ওপর।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা ১৫ লাখ টন। সরকারি মিলগুলোতে প্রায় ২৫ হাজার টন চিনি উৎপাদন করা হয়। বাকি চাহিদা মেটাতে বেসরকারি পরিশোধনকারীরা কাঁচা চিনি আমদানি করেন। সিটি, পার্টেক্স, এস আলম, আব্দুল মোনেম, দেশবন্ধুসহ ৭টি বেসরকারি কোম্পানি ব্রাজিল, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও মালয়েশিয়া থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে দেশে উৎপাদন করে।
গত বছর ৬ হাজার ৯২৪ কোটি টাকার অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে এসব কোম্পানি। এর মধ্যে ভারত থেকে এসেছে ১ হাজার ৮ কোটি টাকার। অন্যদিকে শুধু ব্রাজিল থেকেই এসেছে ৫ হাজার ৫২৭ কোটি টাকার চিনি। এর আগে আর্জেন্টিনা ও ইন্দোনেশিয়া ভোজ্যতেলের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ভোগান্তিতে পড়েন বাংলাদেশি ভোক্তারা।
শুধু ভারত নয়, বিভিন্ন দেশ খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিচ্ছে। মালয়েশিয়া সরকার অভ্যন্তরীণ বাজারে ঘাটতি পূরণে তারা মুরগি রপ্তানি বন্ধ করতে যাচ্ছে। তা কার্যকর হবে জুনেই। ভারত এরইমধ্যে গম রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। পাম-ওয়েল রপ্তানি তিন সপ্তাহের জন্য বন্ধ রেখেছিল ইন্দোনেশিয়া। সামনের দিনগুলোতে বিশ্ব বড় ধরনের খাদ্য সংকটে পড়তে যাচ্ছে বলে বারবার সতর্ক করছে জাতিসংঘ। ফলে অনেকেই নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছে।
প্রসঙ্গত, অস্থিতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে ‘খাদ্য জাতীয়তাবাদ’–এর সম্ভাব্য উত্থান দেখছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। ফলে খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলো যেমনি বেকায়দায় পড়বে, তেমনি ভূ-রাজনৈতিক হাতিহারে পরিণত হতে পারে খাদ্যপণ্য। জ্বালানি তেলের পর খাদ্যপণ্য এখন তুরুপের তাস হতে যাচ্ছে।
আনন্দবাজার/শহক









