আর্থিক সংকটে কারবারে ঝুঁকছেন বেকাররা
পাকস্থলীতে ২৮ হাজার ইয়াবা, আটক ৯
পারিবারের উদাসীনতার কারণে তরুণ সমাজের অনেকেই আজকাল জড়িয়ে পড়ছে মাদকসেবন ও মাদক পাচারের মতো ভয়াবহ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। বেকারত্ব ও আর্থিক সংকটে মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে মাদক কারবারীদের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ফাঁদে পা দিচ্ছে সম্ভাবনাময় এসব তরুণরা। অভিনব কায়দায় পেটের ভেতর মাদক পাচারকালে কুমিল্লায় র্যাবের হাতে আটক এমন একদল তরুণের দেয়া তথ্যে বেরিয়ে আসে এমন চিত্র।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে কারবারীদের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ফাঁদে পা দেয়া ৯ তরুণ শিক্ষার্থীকে কুমিল্লা থেকে আটক করে র্যাব-১১। তারা পেটের ভেতর অভিনব কায়াদায় প্রায় ২৪ হাজার পিস ইয়াবা বহন করছিলো।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কুমিল্লা ক্যাম্পের একটি আভিযানিক দল রাতে কুমিল্লার কোতয়ালী থানার আমতলী বিশ্বরোড এলাকায় ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে ৯ শিক্ষার্থীকে একটি বাস থেকে আটক করে। র্যাব-১১ সিপিসি-২। পরে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে আটক ৯ শিক্ষার্থীর শরীর এক্সরে করলে তাদের প্রত্যেকের পেটে ইয়াবার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পরবর্তীতে চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর পেটের ভিতর থেকে ২৩ হাজার ৯৯০ পিস অক্ষত ইয়াবা এবং ৪০০ পিস ভাঙ্গা ইয়াবা বের করা হয়।
কুমিল্লা র্যাব-১১, সিপিসি-২ এর উপ-পরিচালক কোম্পানী অধিনায়ক মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন জানান, র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ৯ তরুণ জানায় তারা সকলেই শিক্ষার্থী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে তারা এ পথে নেমেছে। গ্রেফতারকৃতদের বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে অন্ধকার এ জগতের অনেক লোমহর্ষক গল্প।
গ্রেফতারকৃত তরুণদের দেয়া তথ্য অনুয়ায়ী ময়মনসিংহের জনৈক এক বড় ভাই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এ পদ্ধতি অনুসরণ করে তিনি টেকনাফ থেকে ইয়াবা বহন করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করত। তার গ্রুপের কয়েকজন ২০২০ সালের ডিসেম্বরে গ্রেফতার হয়। পরবর্তীতে সে এলাকার তরুণদের টার্গেট করে এবং প্রথমে আসামী সেলিমকে ম্যানেজ করার পর আসামী সেলিমের মাধ্যমে আসামী রিফাত, গোলাপ, রিশাদ, তোফায়েল ও আশিককে এ কাজে আসতে বাধ্য করে। অপরদিকে জনৈক মাদক ব্যবসায়ীর মহাখালীর বন্ধুর মাধ্যমে প্রথমে আসামী সোহেলকে এবং আসামী সোহেলের মাধ্যমে আসামী মিতুল ও সিয়ামকে মাদক পরিবহনের কাজে সম্পৃক্ত করা হয়। প্রথমে তাদেরকে গাঁজা ও ইয়াবা ফ্রিতে সরবরাহ করা হয় এবং মাদকের আসরে আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে তাদেরকে ধীরে ধীরে মাদকাসক্ত করে ফেলা হয়। পরবর্তীতে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার প্রলোভন এবং উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখানো হয়।
অপরদিকে মাদকাসক্ত হয়ে এ তরুণেরা মাদকের টাকা সংগ্রহ করার জন্য জনৈক মাদক ব্যবসায়ীর দেয়া প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। গত জানুয়ারি ২০২১-এ প্রথম পেটের ভিতরে করে ইয়াবা বহন করে সফলভাবে তা ডেলিভারী দিতে সক্ষম হয় তারা। তবে, তাদেরকে প্রাপ্ত টাকা না দিয়ে অর্ধেক টাকা ট্যাক্স হিসেবে রেখে দেয় জনৈক মাদক ব্যবসায়ীরা। তাই এ তরুণরা এ কাজ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে পূর্বের কাজের ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে পুনরায় এ কাজ করতে তাদেরকে বাধ্য করা হয়।
এক্ষেত্রে প্রথমে কলার রস দিয়ে খেজুরের মতো ছোট ছোট পলিথিনে মোড়ানো ইয়াবার পোটলিগুলো পিচ্ছিল করে তারা গিলে ফেলে। এরপর নাইটকোচে তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে। পথে সার্বক্ষণিক মাদক কারবারীরা তাদেরকে নির্দেশনা দিতে থাকে। মাদক কারবারীদের নির্দেশনা অনুযায়ী ইয়াবাগুলো কখনো নরসিংদী, কখনো আশুলিয়া আবার কখনো মহাখালীতে নির্ধারিত স্পটে মাদক কারবারীদের নিকট পৌছে দিতে হয়। আটককৃতরা র্যাবকে আরও জানায়, গত এক বছরে অসংখ্যবার তারা এ প্রক্রিয়ায় টেকনাফ থেকে ঢাকায় ইয়াবা এনেছে।
তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন আরো কয়েকটি তরুণ শিক্ষার্থীদের গ্রুপ এ পন্থায় মাদক কারবারীদের নির্দেশনায় ইয়াবা আনা নেয়া করে থাকেন। পারিবারিক দৈন্যদশা, বেকারত্ব ও মানসিক অবসাদের কারণে মাদক কারবারীদের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ফাঁদে পা দিতে হয়েছে তাদের বলেও জানায় তারা।
এ প্রক্রিয়ায় ইয়াবা বহন অনেক ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা: ইশবাল আনোয়ার বলেন, এ প্রক্রিয়ায় ইয়াবা বহন করতে গিয়ে যে কোনো সময় মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। তবে ঝুঁকি জেনেও টাকার লোভে মাদক ব্যবসায়ীদের এমন ফাঁদে পা দিচ্ছে বর্তমান সময়ের অনেক তরুণ।
কুমিল্লা র্যাব-১১, সিপিসি-২ এর উপ-পরিচালক কোম্পানী অধিনায়ক মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন বলেন, তরুণ শিক্ষার্থীদের এহেন কর্মকান্ড সম্পর্কে পিতা মাতা অদ্যবধি বিন্দু পরিমাণ কিছু আচ করতে পারেনি। এভাবে অনেক শিক্ষার্থীর উজ্বল ভবিষ্যত অন্ধকারে পতিত হচ্ছে এবং এতে করে জাতি হারাচ্ছে অনেক উজ্বল নক্ষত্র। তাই আমরা সকল অভিভাবককে অনুরোধ করবো আপনারা আপনাদের সন্তানদেরসার্বক্ষণিক খোঁজ খবর রাখুন এবং তাদের চাল চলন ও আচার ব্যবহারে কোন অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে অতিসত্বর কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। এতে করে আপনার সন্তানেরভবিষ্যত যেমন অটুট থাকবে এবং সমাজ তথা দেশ হবে উপকৃত।
গ্রেফতারকৃত আসামীদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা জেলার কোতয়ালি থানায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন। মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে র্যাবের অভিযান অব্যাহত থাকবে।









