
প্রতিবেদটি তৈরিতে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করেছেন আনন্দবাজারের রাজশাহী বিভাগীয় প্রতিনিধি উপল আরাফাত, লালমনিরহাট প্রতিনিধি রবিউল হাসান, যশোর থেকে শাহরুল ইসলাম ফারদিন, গাজীপুর থেকে আতিকুর রহমান আতিক।
ফসল উৎপাদনে কৃষকের ঘাম ঝরলেও দাম পান না তারা। লাভ উঠে যায় পাইকারের ঘরে। রোদ-বৃষ্টিতে কষ্ট আর পরিশ্রম যায় বিফলে। উৎপাদনকারী কৃষকের কাছ থেকে পানির দামে পণ্য কিনে লাভ তুলে নেয় ব্যবসায়ীরা। ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে দাম যে কয়েকগুণ বেড়ে যায় সেই মুনাফার মুখ দেখতেই পান না চাষীরা। বছরের পর বছর ধরে এমনটাই হয়ে আসছে। বিশেষ করে শীতের সবজির বাজারে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হতে হয় উৎপাদক চাষীদের।
দেশের বিভিন্ন জেলা শহরের সবজির সিংহভাগই চলে আসে রাজধানীসহ অন্যান্য বড় শহর নগরে। বিভাগীয় জেলার বাজারের তথ্য থেকে দেখা যায়, এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে দামের ফারাক অনেক বেশি। আর উৎপাদক কৃষকের পর্যায়ে পণ্যের দাম প্রায় একই রকম থাকে। বাড়তে দেখা যায় না। যত বাড়ে পাইকারদের কাছে। চাষীর কাছ থেকে সবজি কিনে সুযোগ বুঝে দাম বাড়িয়ে দেয় পাইকারী ব্যবসায়ীরা। তারাই এই দাম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এসব পাইকার প্রতি কেজি পণ্য থেকে ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত লাভ তুলে নেয়। যেটা পাওয়ার কথা ছিল চাষীদের।
আটটি বিভাগী শহরের চারটি বিভাগের বিভিন্ন জেলা শহরের বাজারগুলোতে চাষীদের বিক্রি করা পণ্য পাইকারের হাত ঘুরে ভোক্তার কাছে পৌঁছা অবধি তথ্য নিয়ে এমন চিত্রই দেখা গেছে। তথ্য পাওয়া যায়, কৃষকের হাত বদল হলেই দামের ঘোড়া দৌড়ানো শুরু করে। স্থানীয় বাজারগুলোতে কেজি প্রতি বেড়ে যায় ২০ টাকা পর্যন্ত। সেব পণ্য আবার জেলা বা বিভাগীয় শহরে দাম আরো বেড়ে যায়। আর এই বাড়তি দামও যায় মধ্যসত্ত্বভোগীদের পকেটে। এখানেও দারুণভাবে বঞ্চিত হন চাষীরা।
দৈনিক আনন্দবাজারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, খুলনা বিভাগের যশোর জেলাতে লালশাক কৃষক বিক্রি করে থাকেন ২০ টাকা কেজি দরে। সেটি পাইকারী বাজারে এসে বেড়ে হয় ৩০ টাকা। পালং শাক কৃষক বিক্রি করে ২০ টাকায়। আর পাইকার ৩০ টাকায় বেচে লাভ করে ১০ টাকা। পেঁপে কৃষক বেচে ১০ টাকায় আর পাইকার ২০ টাকায়। বেগুন কৃষক বেচে ৩০ টাকায়, পাইকার ৪০ টাকায়। চিচিঙ্গা কৃষক বেচে ২০ টাকায়, সেখানে পাইকার বিক্রি করে ৩০ টাকায়। টমেটোতে কৃষক পায় ৬০ থেকে ৭০ টাকা। আর পাইকার কৃষকের কাছ থেকে কিনে বেচে ৮০ টাকা দরে। অর্থাৎ কেজিতে লাভে অংক ১০ থেকে ২০ টাকা অবধি।
অপরদিকে এক কেজি করলা কৃষক বিক্রি করেন ৫০ টাকা দরে যা পাইকার বিক্রি করেন ৮০ টাকা দরে। করলায় কেজিতে ৩০ টাকা পর্যন্ত তুলে নেন পাইকার। একইভাবে ফুলকটি কৃষক ৪০, পাইকার ৪৫ টাকা; বাঁধাকপি কৃষক ২০ ও পাইকার ২৫ টাকা; আলু কৃষক ১৮ ও পাইকার ২২ টাকা; শিম কৃষক ২৫ ও পাইকার ৩০ টাকা; মিষ্টিকুমড়া কৃষক ২৫ টাকা ও পাইকার ৩০ টাকা; চাল কুমড়া কৃষক ১২ ও পাইকার ২০ টাকা; কাঁচামরিচ কৃষক ৩০ ও পাইকার ৪০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট জেলায় একজন কৃষক লাল শাক বিক্রি করেন ১০ টাকা দরে। সেটি পাইকারী বাজারে বিক্রি হয় ২০ টাকায়। লালশাক চাষী বিক্রি করেন ১০ টাকায়, পাইকারি বাজারে বিক্রি হয় ২০ টাকায়। পালং শাক ১০ টাকায় কিনে পাইকাররা বাজারে বিক্রি করেন ২০ টাকায়। মুলাশাক ১০ টাকায় কিনে বাজারে বিক্রি ২০ টাকায়। ফুলকপি ২৫ টাকা ও বাজারে বিক্রয় ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, বাঁধাকপি ২০ টাকা ও বাজারে বিক্রয় ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, আলু ২৫-৩০ টাকা ও বাজারে বিক্রি ৪০ থেকে ৫০ টাকা। এখানে ৫ থেকে ২০ টাকা লাভ করেন পাইকাররা। বেগুন ২৫ টাকা ও বাজারে বিক্রি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, শিম ২০ ও বাজারে বিক্রি ৩০, টমেটো ১০ ও বাজারে বিক্রি ২০ টাকা, করলা ২০ ও বাজারে বিক্রি ৩০ থেকে ৪০, মিষ্টি কুমড়া ২০ ও বাজারে বিক্রি ৫০ থেকে ৬০ টাকা। চাল কুমড়া ২০ টাকা ও বাজারে বিক্রি ৩০ থেকে ৫০ টাকা। এতে ১০ থেকে ২০ টাকা লাভ করেন মধ্যসত্ত্বভোগীরা।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার কৃষক বকুল হোসেন চলতি বছর আগাম ফুলকপি, বাঁধাকপি, আলু, বেগুন চাষ করে দাম পেয়েছেন ভালো। তবে তিনি বলেন, পরিশ্রমের ন্যায্যমূল্য তাদের হাতে আসে না। তা ছাড়া অনেক সময় সফলের ক্ষয়ক্ষতি হয় তার দায়ভারও কৃষকের। একই জেলার কৃষক সাহিদা বেগম (৪০) জানান, ২৫ শতক জমিতে মাত্র ৩ হাজার টাকা খরচ করে মূলাশাক লাগিয়ে বাড়িতে বিক্রি করেছেন ১৫ হাজার টাকা। প্রতি বছর তিনি মূলাশাক ও লালশাক লাগিয়ে আয় করছেন। এতে তিনি অনেক খুশি। তবে বাজারে যে দামে বিক্রি হয় সে দাম তিনি পান না। বাজারের দাম পেলে আরো আয় হতো। এতে চাষীরা বেশি উৎসাহী হতো।
ঢাকা বিভাগের গাজীপুর শহরে চাষীরা লাল শাক বিক্রি করেন ২০ টাকা দরে। সেই শাক পাইকাররা বিক্রি করেন ৩০ টাকা দরে। পালং শাক কৃষক বেচে ২০ টাকায়, পাইকার ৩০ টাকা, মূলা শাক কৃষক ১৫ টাকা ও পাইকার ২০ টাকা, ফুলকপি বড় সাইজ ২০ টাকা ও পাইকার ৩০ টাকা পিস, বাঁধাকপি বড় সাইজ ২২ ও পাইকার ৩০ টাকায় বিক্রি করেন। এতে কেজিপ্রতি পাইকারের লাভ ৮ থেকে ১০ টাকা। নতুন আলু কৃষক ৩০ টাকা ও পাইকার ৪০ টাকা, বেগুন লম্বা কৃষক ২৩ টাকা, পাইকার ৩০ টাকা, গোল বেগুন কৃষক ৩০ টাকা, পাইকার ৪০ টাকা, চিচিঙ্গা কৃষক ৩৫ টাকায় যা পাইকার ৫০ টাকা দরে বিক্রি করেন। তাতে ১০ থেকে ১৫ টাকা লাভ করেন পাইকাররা। শিম ২০ টাকা দরে বেচে কৃষকরা। যা পাইকাররা বেচেন ৩০ টাকায়, টমেটো কৃষক ৭০-৮০ টাকা ও পাইকার ১০০ টাকা, করলা কৃষক ৩৫ টাকা ও পাইকার ৫০ টাকায় বেচেন। এসব পণ্য কৃষকের হাত থেকে পাইকারের হাতে পড়লেই তাদের পকেটে উঠে ১০ থেকে ২০ টাকা লাভ।
রাজশাহীর বিভাগীয় শহরে প্রতিকেজি শিম কৃষক ৩০ ও পাইকার ৪০ টাকা, করলা ২৫ ও পাইকার ৪০ টাকা, ঢেড়শ ২০ ও পাইকার ৩০ টাকা, বেগুন কৃষক ২০ ও পাইকার ৩০ টাকা, বাধাকপি ২৫ ও পাইকার ৪০ টাকা, ফুলকপি কৃসক ৩০ ও পাইকার ৪০ টাকা দরে বিক্রি করেন। এতে কৃষকের চেয়ে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা লাভ করেন পাইকাররা। পটল ১৫ ও পাইকার ২০ টাকা, মূলা কৃষক ১০ ও পাইকার ২০ টাকা, বরবটি ৩০ ও পাইকার ৪০ টাকা, কুমড়া প্রতি পিস ১৫-২০ ও পাইকার ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি করেন। এখানে কেজিতে ১৫ টাকার মতো বেশি লাভ। কাঁচামরিচ ৪০ টাকা ও পাইকার ৬০ টাকা, আলু ১৫ টাকা ও পাইকার ২০ টাকা, পেঁয়াজ ৪০ ও পাইকার ৬০ টাকা, মিষ্টিকুমড়া ২৫-৩০ ও পাইকার ৪০ টাকা কেজি বিক্রি করেন। এসব পণ্যেও ২০ টাকার মতো লাভ পান পাইকাররা।
অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বিশ্লেষকদের দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সার্বিক মূল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সার্বক্ষণিক সব ধরনের কার্যক্রমের সমন্বয় এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে আগাম করণীয় নির্ধারণ ছাড়া কোনো বিকল্পও নেই। স্বাধীনতা-উত্তরকালে দেশ পুনর্গঠনের সময় এটি উপলব্ধি করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য মন্ত্রণালয়ে বিজনেস অ্যাফেয়ার্স এবং কনজ্যুমারস অ্যাফেয়ার্স নামে পৃথক দুটি ডিভিশন সৃষ্টি করেছিলেন। ভারতও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সন্তোষজনক এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে ‘কনজ্যুমার অ্যাফেয়ার্স, ফুড অ্যান্ড পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন’ নামে পৃথক একটি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করেছে।
বাজারে পণ্যের দামে কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাণিজ্য, কৃষি, খাদ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় ছাড়াও মৎস্য ও পশুসম্পদ, যোগাযোগ, রেল, নৌপরিবহন ও অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, মাঠ-প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীরও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে একক কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ দেশে নেই। মূলত দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। সেখানেও এ ধরনের কার্যক্রমের সমন্বয় প্রতিষ্ঠায় পৃথক কোনো বিভাগ নেই।
আনন্দবাজার/শহক








