দেশের সিলেট অঞ্চলে বন্যা। ঠিক তার বিপরীত চিত্র রাজশাহী অঞ্চলে। দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যহীনভাবে পানি ব্যবহার করার কারণে দিনে দিনে খরার তীব্রতা বাড়ছে। মাঝে মাঝে ছিন্ন মেঘের বৃষ্টি। সেও এক-দুই ঘণ্টা। এরপর আবার তাপদাহ। এ অঞ্চলের নদ-নদীগুলো শুষ্ক। নেমে গেছে ভূ-গর্ভস্থ পানি। এমন অবস্থায় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ণ কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে।
বরেন্দ্র এলাকার বৃষ্টিপাত দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় অনেক কম। সাম্প্রতিক এর পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া বৃষ্টিপাত পূর্বের ন্যায় যথাসময়ে হচ্ছে না। সর্বোপরি সংস্কারের অভাবে নদী ও বিলগুলোর পানি ধারণক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ায় কৃষিকাজ ক্রমান্বয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দিনদিন নিচে নেমে যাচ্ছে। তাই ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন ও ব্যবহার সীমিত করে পুকুর পুনঃখনন ও সংস্কারের মাধ্যমে ভূপৃষ্টে পানির ব্যবহার বাড়ানো যায়। এজন্য পুকুর পুনঃখননের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যাতে শুষ্ক মৌসুমসহ সারা বছরে সবসময় চাষবাদে পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায়।
এছাড়া বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা নিরসন করে কৃষি কাজে সচল অবস্থার সৃষ্টি এবং শুকনো মৌসুমে পানির অভাবে পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি রোধসহ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পুকুরের পুনঃখনন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পুকুর পুনঃখনন ও ভূ-উপরিস্থ পানি উন্নয়নের মাধ্যম ক্ষুদ্র সেচ ব্যবহারের (এসডব্লিউআইপি) প্রতি বিশেষ জোর দিয়েছে বিএমডিএ। গত ২৫ মে এই প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী পবা উপজেলার কসবা মৌজায় অবস্থিত খাস পুকুরের পুনঃখনন কাজ পরিদর্শন কালে বিএমডিএ-এর চেয়ারম্যান সাবেক সংসদ সদস্য বেগম আখতার জাহান এ কথা জানান।
বিএমডিএ এর চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য বেগম আখতার জাহান বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা যেভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেভাবেই বাংলাদেশ কৃষি খাতকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে বিশ্ব দরবারে। তার একক প্রচেষ্টায় আজ বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে। এমন কি খাদ্য উদ্বৃত্ত পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ।
বিএমডিএ এর চেয়ারম্যান বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সংকট নিরসনের জন্য পুকুর পুনঃখনন যে প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে তা যুগ উপযোগী এবং বাস্তবমুখী একটি প্রকল্প। এ পুকুর পুনঃখননের ফলে মানুষ এখন জমিতে সেচ দেয়ার জন্য ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার করতে আগ্রহ বাড়ছে এতে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির যে সংকট তা অনেকাংশে লাঘব হবে। এই পানি ব্যবহার করে স্বল্প সেচের মাধ্যমে যেসকল ফসল উৎপাদন করা যায় মানুষ তা সহজে পানি ব্যবহার করতে পারবেন।
এছাড়া পুকুর খননের ফলে পুকুরের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধ গাছ রোপন করা হয়েছে যা আমাদের অক্সিজেনের ঘাটতি পূরণে অনেক সাহায্য করবে। পুকুর পুনঃখননের বরেন্দ্র অঞ্চলের সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাব্যক্ত করেন এবং প্রকল্পের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করেন তিনি।
এময় উপস্থিত ছিলেন, বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুর রশীদ, প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী শরীফুল হক, বিএমডিএর সচিব প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন, পবা জোনের সহকারী প্রকৌশলী কামরুল আলম।
প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী শরীফুল হক জানান, প্রকল্প এলাকাগুলো হলো- রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও বগুড়া জেলা। এর মধ্যে ৪৩টি উপজেলা রয়েছে। এই প্রকল্পে পুনঃখননের জন্য মোট ৭১৫টি খাস পুকুর আছে। তারমধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৫০টি পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে। (বিএমডিএ) এর চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য বেগম আখতার জাহান প্রকল্পের কার্যক্রম পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
এসময় উপকারভোগী কৃষক মজিদ মিয়া জানান, পুকুরগুলো দীর্ঘদিন খনন না করার কারণে পুকুরে পানি থাকতো না। এতে আশেপাশের জমিগুলো সঠিক সময়ে সেচ দিতে পারতাম না এর ফলে স্বল্প সেচের ফসলগুলো করতে অনেক ব্যয় হতো। কিন্তু পুকুর খননের ফলে এখন আমরা এই পানি দিয়ে স্বল্প সেচের ফসল করতে পারব এবং ব্যয় কম হবে যার ফলে অধিক মুনাফা পাবো আমরা।
উপকারভোগী আরেকজনকে কৃষাণী রানী বেগম বলেন, পুকুরে পানি না থাকার জন্য আমাদের অনেক সমস্যা হতো আমাদের গোসলের পানি, রান্নার পানি, হাঁস মুরগি পালন করতে পারতাম না। এই পুকুরটা খনন হওয়ার ফলে এখন আমরা সব কাজ এখান থেকেই পানি নিয়ে করতে পারব। যার ফলে আমাদেরকে কষ্ট করে আর দূর থেকে পানি নিয়ে আসতে হবে না। পুকুরটা খনন করাতে আমাদের অনেকেই উপকার হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ৭১৫টি খাস পুকুর, ১০টি দিঘী, ৮৫টি সোলার শক্তি চালিত এলএলপি, বৃক্ষরোপন ১ দশমিক ৫ লাখ এছাড়া ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ ৮০ কিলোমিটার আছে। ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে কাজ সম্পন্ন হয়েছে- ৪৫০টি পুকুর, ৬টি দিঘী, ৫০টি সোলার শক্তি চালিত এলএলপি, বৃক্ষরোপন দশমিক ৭৫ লাখ, এছাড়া ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ ৫০ কিলোমিটার। অন্যদিকে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২০০টি পুকুর, ৩টি দিঘী, ২৫টি সোলার শক্তি চালিত এলএলপি, বৃক্ষরোপন ৩৭ হাজার ৫০০টি (ফলজ ও বনজ)।
আনন্দবাজার/শহক









