জাপান-বাংলাদেশের সম্পর্কের আরও উন্নতি হবে: ইতো নাওকি, জাপান রাষ্ট্রদূত
উন্নয়ন অংশীদার জাপান
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে বাংলাদেশের। এ সম্পর্ককে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে বিষয়টিকে ভিত্তি ধরে ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’ বিষয়ে ধারাবাহিক বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে দৈনিক আনন্দবাজার। জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার আমন্ত্রণে নভেম্বেরের শেষ সপ্তাহে তিনদিনের সরকারি সফরে দেশটিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ-জাপানের দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে নিয়ে আজ প্রথম বিশেষ প্রতিবেদন ‘স্বপ্ন নয় বাস্তবতা’।
বাংলাদেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পে জাপান, ফ্রান্স, ভারত ও বাংলাদেশের আটটি প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক নিযুক্ত করেছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। এমআরটি লাইন-১ এর সার্বিক নির্মাণ কাজ তদারকি করবে এসব প্রতিষ্ঠান। এতে পরামর্শক সেবার চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা।
এমআরটি লাইন-১ এর মধ্যে রয়েছে দুটি রুট। প্রথম রুট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পুরোপুরি পাতালপথে হবে। আর নতুনবাজার-পূর্বাচলের দ্বিতীয় রুটটি হবে উড়ালপথে। আর চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী মেট্রোরেল ৬ এর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত উদ্বোধন করবেন। ২০৩০ সালের মোট ৬টি মেট্রোরেলের কাজ শেষ হবে। এতে করে পাতালপথে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পুর্যন্ত ২৪ মিনিটে যাওয়া যাবে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এ সম্পর্কিত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী, ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি, মেট্রোরেল বাস্তবায়ন ও তদারকি সংস্থা ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম এ এন সিদ্দিক, বাংলাদেশে জাইকা অফিসের চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ ইচিগুচি টমোহাইড, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রওশন আরা মান্নান।
ওবায়দুল কাদের বলেন, আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হবে। আর ২০৩০ সালের মধ্যেই ছয়টি লাইনই দৃশ্যমান হবে। তিনি জানান, হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে খিলক্ষেত-কুড়িল ও যমুনা ফিউচার পার্ক হয়ে বাড্ডা-রামপুরা-মালিবাগ হয়ে রাজারবাগ-কমলাপুর এবং কুড়িল থেকে কাঞ্চন সেতুর পশ্চিম পাশ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে এই লাইন। ৩১.২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকল্পের মোট খরচ ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপান সরকার দেবে ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা, বাকি ১৩ হাজার ১১১ কোটি টাকা আসবে সরকারি তহবিল থেকে।
প্রকল্পে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৬ দশমিক ২১ কিলোমিটার হবে পাতালপথে এবং কুড়িল থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার হবে উড়ালপথে। নতুন বাজার থেকে কুড়িল পর্যন্ত ৩ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রানজিশন লাইনসহ ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করা হবে। এই মেট্রোরেলের ১২টি স্টেশন থাকবে মাটির নিচে এবং ৭টি থাকবে উড়াল সেতুর ওপর। সরকার ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়ে ২০২৬ সালে চালু করার প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নির্মাণ কাজ দৃশ্যমান হয়নি।
সেতুমন্ত্রী বলেন, এমআরটি লাইন-৬ চলতি ডিসেম্বরে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমাদের পরবর্তী লক্ষ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়া। স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন স্মার্ট পরিবহন। সেজন্য পরিবহন আধুনিক করতে হবে। পৃথিবী এগিয়ে চলছে, আমরা পিছিয়ে থাকতে পারি না। জাপান আমাদের উন্নয়নের অংশীদার। আমরা আজকের বাংলাদেশকে উত্তরত্তর পরিবহন খাতে, যোগাযোগ খাতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছি।
ইতো নাওকি বলেন, সাতজন জাপানি নাগরিক হোলি আর্টিসান হামলায় নিহত হয়েছেন। আমরা এমন ট্রাজেডি দুঃখের সঙ্গে স্মরণ করি। তারপরেও আমরা উন্নয়ন কর্মসূচিতে একসঙ্গে কাজ করছি। আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রীর সফর দুই দেশের সম্পর্ক আরো জোরদার করবে বলে মনে করি। আশা করি জাপানের বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও উন্নতি হবে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, মেট্রোরেল আমাদের স্বপ্ন নয়,বাস্তবতা। জাপান, বাংলাদেশ সম্পর্ক এগিয়ে যাক।
এদিকে, রাজধানী ঢাকায় মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য ২৪ সেট ট্রেন তৈরি করছে জাপানের কাওয়াসাকি-মিতসুবিশি। প্রতি সেট ট্রেনের দুই পাশে থাকবে দুটি ইঞ্জিন। এতে থাকবে চারটি করে কোচ। ট্রেনগুলোয় ডিসি ১৫০০ ভোল্ট বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকবে। স্টেইনলেস স্টিল বডির ওই ট্রেনগুলোতে থাকবে লম্বালম্বি আসন। প্রতিটি ট্রেনে থাকবে দুটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থাও। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রতিটি বগির দুই পাশে থাকবে চারটি করে দরজা। প্রতিটি ট্রেনের যাত্রী ধারণক্ষমতা হবে ১ হাজার ৭৩৮ জন।
এদিকে, গত আগস্টে গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ডিএমটিসিএলের এমডি এম এ এন ছিদ্দিক জানান, প্রথমে ১০টি ট্রেন দিয়ে মেট্রোরেল চালু করা হবে। প্রথম দিন ১০ মিনিট পর পর ট্রেন চালু হবে। দ্বিতীয় দিন হয়তো ৭ মিনিটে নামিয়ে আনা যাবে। বেশি যাত্রী অপেক্ষমাণ থাকলে আমরা সাড়ে ৩ মিনিট পর পর ট্রেন ছাড়বে। ফজরের নামাজের সময় থেকে শুরু করে রাত ১২টা পর্যন্ত ট্রেন চলবে।
মেট্রোরেল প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রসঙ্গে এম এ এন ছিদ্দিক জানান, এমআরটি লাইন ৬-এর সার্বিক অগ্রগতি ৮১ দশমিক ৭০ শতাংশ। প্রথম পর্যায়ে নির্ধারিত উত্তরা থেকে আগারগাঁও রুটে কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৯৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। দ্বিতীয় পর্যায়ে নির্ধারিত আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৮১ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৮৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ।









