পণ্যের সঙ্গে বাড়ছে খরচ-
চাহিদায় কাটছাঁট, রান্না-বান্নায় হিসাব
জাকির হোসেন গত নয় বছর ধরে ব্যবসা করেন রাজধানী ঢাকার কাঁটাবন কাঁচাবাজারে। এর আগে তিনি সাত বছর কাটিয়ে এসেছেন সৌদি আরবে। সেখানকার বাজারের সঙ্গে এখানকার বাজারের পার্থক্য খুঁজতে গিয়ে প্রায়ই হতাশ হন। হতাশা প্রকাশ করেই প্রতিবেদককে বললেন, আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা কয়েকজন মিলে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দেন। এমনটা কখনও দেশের বাইরে দেখিনি।
কিছুটা ব্যাখ্যা দিয়ে জাকির হোসেন বলেন, ধরুন, কয়েকজন মিলে আলু কিনে মজুদ করে নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে দিলেন। আবার আরেক গ্রুপ অন্য আরেকটা পণ্য কিনে স্টক করলেন। এরপর বাজারে সেই পণ্যের পণ্যে চাহিদা বেড়ে গেলে নিজেদের ইচ্ছেমতো দামি বাড়িয়ে টাকা কামিয়ে নিলেন। সরকার যদি বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তাহলে আগে এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের ঠিক করতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই বাজারের মাংস ব্যবসায়ী সুলতান বলেন, গরুর মাংসের দাম কীভাবে কমাবো বলেন? তেলের দাম বেশি। আবার রাস্তায় খরচও বেশি। গরু কিনতে হয় বেশি দামে। তাহলে দাম কোথায় কমাবো? আমাদেরও তো বাঁচতে হবে। বাজারে সিটি করপোরেশন থেকে পণ্যের দামের যে চার্ট দেয়া হয় সেই দামের চেয়ে অনেক সময় বেশি দাম নেয়া হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে একই বাজারের বিক্রেতা মনির হোসেন বললেন, চার্টের সঙ্গে বাজারে দামের কোনো মিল নেই। চার্টে বেশি লেখে রাখে। দাম কিছুটা কম নেয়। চার্ট অনুযায়ই দাম হওয়ার কথা তবে এমন কেন করা হয় প্রশ্নের জবাবে বলেন, এই চার্ট নিজেরাই আলোচনা করে করে থাকে। বা আশপাশের বাজারের সঙ্গে খোঁজ নিয়ে লেখে রাখে। সরকারের দেয়া চার্টের সঙ্গে মিল নেই। ব্যবসায়ীরাই নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে লেখে। দাম বাড়ায়, কমায়।
দেশে নির্মাণসামগ্রীর দাম গত দুই মাসের ব্যবধানে অনেক বেড়ে গেছে। ৪১০ টাকার সিমেন্ট এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৯০-৫০০ টাকায়। রড, বালুসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলামোটরে সিমেন্ট ও রড ব্যবয়ী সাঈদুর প্রতিবেদককে বলেন, মানুষ নির্মাণ কাজ কমিয়ে দিয়েছে। এতে আমরা বিপদে পড়েছি। কারণ বেশি টাকায় একান্ত দরকার না হলে কেন মানুষ বাড়ি বানাবে? দাম তো আমরা বাড়াই নয়। চাহিদা অনুযায়ী দাম বাড়ে।
একই এলাকার মোহাম্মদী গ্লাস অ্যান্ড থাই এলুমিনিয়াম ব্যবসায়ী শামছুল হক প্রতিবেদকে বাজার নিয়ে কিছুটা রাজনৈতিক গল্প শোনালেন। বললেন, দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্রের ও সুশাসনের অভাবে বিপদে পড়েছে ব্যবসায়ীরা। ব্যবসার সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক কী? এমন প্রশ্ন করলে শামছুল হক জবাবে বলেন, রাজনীতিবিদরা ভালো নীতিমালা দিতে না পারলে ব্যবসা হবে না। এতে অর্থনীতির চাকা থমকে যাবে। কারণ ভালো আইন না থাকলে একজন আরেকজনকে ঠকাবেই। সেজন্য প্রয়োজন সুশাসন।
আরেকজন অনেকটা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, দেশের অনেক সেক্টরেই উন্নয়ন হয়েছে, হচ্ছে। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। কিন্তু টাকা তো আসছে না। বড় ব্যবসায়ীরা করোনার প্রণোদনার অর্থ নিজেদের পকেটে ভরলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পায়নি। যা পেয়েছে তা নামকাওয়াস্তে। যেই নেতা হয় সেই খাওয়া শুরু করে। এ থেকে বের হতে না পারলে কোনো ভবিষ্যৎ নেই বলে হতাশা প্রকাশ করেন।
এ তো গেল রাজধানীর ব্যবসায়ী আর সাধারণ মানুষের কথা। রাজধানীর বাইরে কারা কী ভাবছেন? উত্তরাঞ্চলের জেলা লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার বাসিন্দা দুলু মিয়া সামান্য সাইকেল মেকার। জিনিসের দাম বাড়ায় তিনি পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। জিনিসের দাম যাত বাড়ছে খরচও বাড়ছে। খরচ যত বাড়ছে ততোই তিনি ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন।
নওগাঁ জেলার আরজি নওগাঁয় একটি ভাড়া বাসায় স্বামী আর দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন লিপি আখতার। স্বামী মনোয়ার হোসেন কাপড়ের দোকানে কাজ করেন। স্বামী কাজে চলে যাওয়ায় পর ছোট ছেলেকে নিয়ে বাজারে এসেছেন লিপি আখতার। বললেন, আজকাল যেটাই কিনতে যাই চোখ বড় করতে হচ্ছে। হিসেব কষতে গিয়ে গোলকধাঁধায় পড়ে যাচ্ছি। বাজারে দাম বাড়ায় সংসারের খরচ বেড়েছে দুই থেকে তিন হাজার। কোথা থেকে আসবে এই বাড়তি টাকা জানি না। তাই নামতে হয়েছে কাটছাঁটের হিসেবে। মাছ-মাংস কেনা কমিয়ে দিয়েছি। ছেলেদের খেলনা কেনা বন্ধ করে দিয়েছি। আগে ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিতাম রিকশায়। এখন পায়ে হেঁটে যাই। বাসায় রান্না-বান্না করি হিসেব করে।
একই শহরে ভাড়ায় রিকশা চালান কবির হোসেন। বলেন, আগে পরিবার নিয়ে মানুষ রিকশায় ঘুরে বেড়াতো। এখন আর কেউ ঘোরে না। ফলে রিকশা ভাড়াও কমে গেছে। সারা দিন খেটে মহাজনকে দিয়ে পকেটে তেমন কিছুই থাকে না। এরপর বাজারে গেলে চোখ কপালে উঠে যায়। একার রোজগারে পাঁচ জনের মুখে খাবার তুলে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই পরিবারের খরচ মেটাতে এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি ২০ হাজার টাকা। এখন সাপ্তাহিক কিস্তি নিয়ে পড়েছি দুশ্চিন্তায়। সময়মত কিস্তি দিতে না পারলে গালা-গালি শুনতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে কলেজপড়ুয়া বড় ছেলেকে গত মাসে কাজে লাগিয়ে দিয়েছি।
এদিকে, বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ মাসে ফেব্রুয়ারির তুলনায় মোটা চালের দাম বেড়েছে সাড়ে ৪ শতাংশ, চিকন চাল সোয়া ৩ শতাংশ, আটা ৯ শতাংশ, মসুর ডাল ৯ শতাংশ, পেঁয়াজের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। প্রতিকেজি আদা ১৫ শতাংশ ও রসুন ১৪ শতাংশ, গরু ও খাসির মাংসের দাম প্রায় ৬ শতাংশ ও চিনি ৩ দশমিক ২৭ শতাংশ। আর ভোজ্যতেলের মধ্যে পাম তেলের দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশ, সয়াবিনের খুচরায় ২৮ শতাংশ এবং বোতলজাতের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ। সবজির বাজার ৪ শতাংশ। আর এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে প্রতিটি পণ্যেই বেড়েছে ৫ থেকে ২০ টাকা ও নির্মাণসামগ্রীতে ৬০ টাকা পর্যন্ত।
গত সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে সবজিভেদে ৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। যে করলা রমজানে বিক্রি হয়েয়ে ৪০ টাকায় ঈদের পরে তা ৫ টাকা বাড়লেও বর্তমানে তা ১৫ টাকা বেড়েছে। টমেটোতে বেড়েছে ২০ টাকা। বেগুনে ২০ টাকা।
গত ৫ মে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফাচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক বার্তায় ভোজ্যতেলের নতুন দর ঘোষণা করেছে। সে হিসেবে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮০ টাকা। যা এতদিন ১৪০ টাকা ছিল। বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৮ টাকা করা হয়। ৫ লিটারের বোতলের দাম হবে ৯৮৫ টাকা। পরিশোধিত পাম সুপার তেল প্রতি লিটারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য হবে ১৭২ টাকা, যা এতদিন ছিল ১৩০ টাকা। সেই হিসাবে পাম তেলের দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশ। আর সয়াবিনের দাম খুচরায় বেড়েছে ২৮ শতাংশ, বোতলজাতের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন লালমনিরহাট ও নওগাঁ প্রতিনিধি)









