যখন রাষ্ট্রয়াত্ব বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিমশিম খাচ্ছে পরিচালনা ব্যয় মেটাতে, তখন চমক দেখাচ্ছে রাষ্ট্রয়াত্ব একমাত্র ঔষধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এসেন্সিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)। তাছাড়া সেবা প্রদান করা বিভিন্ন বিভাগ বা কর্তৃপক্ষ যখন ভর্তুকি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে তখন ১০০ কোটি টাকার বেশি লাভের মুখ দেখছে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি।
মূলত সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সাথে সমন্বয়, কর্মীবান্ধব কাজের পরিবেশসহ কর্মকর্তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এমনটি হয়েছে এবং বাড়ছে কাজের পরিধি। এমনটাই মনে করছেন গোপালগঞ্জ প্লান্টের জেনারেল ম্যানেজার ইমাম হাসান। তিনি বলছেন, শুধু ইডিসিএল নয় সরকারি সকল প্রতিষ্ঠানই লা়ভ নিয়ে পরিচালনা করতে পারে শুধু পরিকল্পনা ও কর্মকর্তা, কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে কাজ করা দরকার। আমরা সরকারি টার্গেটের বাইরেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাথে যোগাযোগ করে উৎপাদন ও সেল বাড়ানোর চেষ্টা করছি সবসময়। যার কারণে আমাদের প্লাট বেড়েছে আর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে।
ইমাম হাসান বলেন, ঔষধের চাহিদা অনুযায়ী কাজের পরিধি বাড়ানোই ছিল প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়ানোর মূলমন্ত্র। আর আমাদের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্মীদের জন্য নতুন পে-স্কেলসহ ইনসেন্টিভের ব্যবস্থা করেছন যা কাজের ক্ষেত্রে সকলের আগ্রহ ও উৎসাহ বাড়িয়েছে।
এদিকে, প্রতিষ্ঠানটির অপারেশন ডিরেক্টর সত্যিজিৎ দাস বলছেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানকে মডেল হিসেবে দেখতে পারে অন্য রাষ্ট্রয়াত্ব প্রতিষ্ঠানগুলো। আমাদের সরকারি চাহিদা মিটিয়েই লাভ হয় ১১০ কোটি টাকার মতো আর উৎপাদন হয় প্রায় ১১০০ কোটি টাকার বেশি পণ্য। সেখানে সরকারি নিয়মে সর্বনিম্ন লাভ করেই আমাদের এমন প্রফিট হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো লাভ ধরলে তা আরো কয়েকগুণ হতো। এমন করে অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান লাভ করতে পারে ইচ্ছে থাকলে।
সত্যিজিৎ দাস আরো বলেন, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপে আমাদের প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যখাতে বিপ্লব তৈরি করেছে। আমরা দুই কোটি মানুষকে বিনামূল্যে ঔষধ দিয়ে থাকি, তাছাড়া করোনাকালীন একদিনও বন্ধ হয়নি ইডিসিএল। দেশের সেবায় আমাদের প্রতিষ্ঠান যা করছে তা সত্যি অনন্য উদাহরণ। ইডিসিএল এই কর্মকর্তা আরও বলেন, সাধারণ কর্মীদের বাসসার্ভিস ব্যবস্থা করেছি আমরা সেখানে বিআরটিসি আমাদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের ব্যবসা বাড়াতে পারে। আবার সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খাবারের জন্য চিনি কেনেন বাজার থেকে। সেখানে আমাদের সরকারি চিনিকল চিনি বিক্রি করে তাদের তাদের ব্যবসা বাড়াতে পারে। আমরা কিন্তু সেই কাজটিই করেছি। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করেই ধীরে ধীরে পরিসর বড় করছি। খুব শিগগিরই আমাদের গোপালগঞ্জ প্লান্ট পুরোদমে চালু হবে যাতে আমদের সক্ষমতা আরো বাড়বে। সাথে সাথে ভ্যাকসিন প্রজেক্ট আমরাই করছি যা এশিয়ার ভিতর অন্যরকম আলোড়ন তৈরি করবে। ইডিসিএলের ৫টি প্লান্টের ৩টিতে বিভিন্ন ঔষধ আর দুটিতে জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী তৈরি হয় যা এসএমসির মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাছে বিক্রিও করছে সরকারি চাহিদা মিটিয়ে ইডিসিএল।
প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এহসানুল কবির জগলুল অবশ্য ভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা দিলেন, কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও বাজার তৈরি, কর্মীদের নিরলস পরিশ্রম প্রতষ্ঠানটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ধীরে ধীরে ইডিসিএল পরিবার আরে বড় হবে। বর্তমানে ৬ হাজার কর্মীর এই প্রতিষ্ঠানটি নিজেদেরকে প্রমাণ করতে পেরেছে নানা প্রতিকুল অবস্থায়। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ইডিসিএলের ঔষধ দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশে যাচ্ছে মানুষের সেবায়। সর্বশেষ আমরা শ্রীলংকায় বিশ কোটি টাকার ঔষধ প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবেও পাঠিয়েছি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর নিদের্শনায় ভ্যাকসিন উৎপাদন প্লান্টের কার্যক্রম হাতে নিয়েছি যা দেশের জন্য অন্যরকম পাওয়া হবে।
অনিয়ম, দুর্নীতি বা নিয়োগ বাণিজ্যের কথা শোনা যায় এগুলো প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. এহসানুল কবির জগলুল বলেন, ওপেন টেন্ডারিং ব্যবস্থাসহ সিন্ডিকেট ভেঙেছেন যার কারণে আগের থেকে কম মূল্যে কাঁচামাল কিনতে পারছেন। আর নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিটি করে পরীক্ষা নিয়েই নিয়োগ দেওয়া হয়। ইডিসিএল এমডি আরো বলেন, ব্যবসা বাড়ছে ইডিসিএল এগিয়ে যাচ্ছে এটি একটি মহল ভালোভাবে নিবে না এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা প্রধানমন্ত্রীর সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের কাজের ক্ষেত্রে কর্মী দরকার হলে যথাযথ নিয়মে নিয়োগ দেই।
প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মী বলেন, ব্যবসায়িক চাহিদা থাকায় কর্মক্ষেত্র বাড়ছে ইডিসিএলে। যেখানে অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই হয় সেখানে আমাদের কর্মী প্রতিবছর বাড়ছে। আবদুর রহমান নামে এক কর্মী বলছেন, বর্তমান এমডি এইক্ষেত্রে বেশি প্রশংসার দাবিদার। কারণ মূল পরিবর্তন তার সময়ে হয়েছে। বিশেষ করে সেফালোস্পোরিন উৎপাদন কার্যক্রম ২০২০ সালে চালু করা, স্থবির হয়ে পড়া গোপালগঞ্জ প্রকল্পের কাজ ২০১৪ সালে তিনি জয়েন করার পর পুরোদমে চালু করা, ২.৫ বিঘা জমিতে ঢাকায় নতুন ওয়ারহাউস স্থাপন করাসহ কর্মীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা অন্যতম। যার কারণে ইডিসিএল এমন ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
একনেকে পাশ হয়েছে ইডিসিএলের নতুন প্রকল্প। মানিকগঞ্জে ৩১.৫ একর জমির ওপর নতুন আঙ্গিকে সাজানো হবো ৬২ বছরের পুরনো জরাজীর্ণ কারখানা। এই প্রকল্প আর গোপালগঞ্জের ভ্যাকসিন প্রজেক্ট হলে বিশ্বের বুকে ইডিসিএল জানান দিবে নতুন পরিসরে। এমনটাই বলছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা কর্মচারীরা।
আনন্দবাজার/শহক









