- তিস্তার চরে বাড়ি বাড়ি কাঁশের আঁটির স্তুপ
- ঘরের বেড়া-ছাউনি, আলু সংরক্ষণের মাচা ও ঝাড়ু তৈরিতে জুড়িনেই কাঁশের
- চরের অভাবি পরিবারের অনেকটা আয়ের পথ করে দিয়েছে কাঁশ
‘প্রত্যেকদিন যত বেশি ঝাড়ু বানবার (তৈরি করি) পাই, অভাব তত দূরোত চলি যায়। সংসারে ঠেকার (অভাবের) সময়টাতে ঝাড়ুই হামাক বাঁচে থুইছে।’ তিস্তার চরে আপনা থেকে গজিয়ে ওঠা কাঁশ থেকে ঝাড়ু বানানোর প্রাক্কালে কথাগুলো বললেন, রংপুরের পাইকান হাজিপাড়া গ্রামের আজিজুল ইসলামের স্ত্রী ছাপিয়া বেগম। এমনি করে ওই গ্রামের শতাধিক পরিবার ঝাড়ু তৈরি করে অভাবকে জয় করে চলছেন প্রায় দুই দশক ধরে। শুধু তাই নয়, চরাঞ্চলে আপনা থেকে গজিয়ে ওঠা কাঁশবন কেটে এনে গ্রামাঞ্চলের লোকজন এখনও ঘরের ছাউনি কিংবা বেড়া তৈরির কাজ করছেন।
জানা যায়, শরৎকালে (ভাদ্র-আশ্বিন মাসে) নদীর ধারে ফোটা কাঁশফুল কার না নজর কাড়ে। ওই সময় প্রকৃতিতে অপরুপ দৃশ্যের এই কাঁশবনকে নিয়ে কবি-সাহিত্যিকরা কতইনা গান, গল্প, কবিতা রচনা করেছেন। অথচ কাঁশবন শুধু অপরূপ দৃশ্যরই অবতারণা করেনি, অনেকটা প্রভাব ফেলেছে অর্থনীতিতেও। প্রকৃতিগতভাবে তিস্তাসহ উত্তরের নদীপারে জন্মায় কাঁশবন। শরৎকালে ফোটা কাঁশফুল ঝরে যাওয়ার পর বিশেষ করে চরাঞ্চলের অভাবি পরিবারের লোকজন ওই কাঁশ কেটে নিয়ে বাড়ির উঠানে স্তুপ করে রাখেন। শুকানোর পরে তা দিয়ে তৈরি করেন ঘরের মজবুত ছাউনি কিংবা বেড়া। এছাড়া স্থানীয় পদ্ধতিতে আলু সংরক্ষণে মাচা তৈরি ও ঝাড়ু তৈরিতে জুড়ি নেই এই কাঁশবনের।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সীমান্তবর্তী পূর্ব ছাতনাই, ঝাড়শিংহেশ^র এলাকায় দেখা যায়, তিস্তার চরাঞ্চলের প্রায় বাড়ির উঠানে স্তুপ করে রাখা হয়েছে কাঁশের আঁটি। বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে রিকশা-ভ্যানে নিজেদের প্রয়োজনে সেখান থেকে তা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় হাট-বাজারেও বিক্রি হচ্ছে কাঁশ।
ঝাড়শিংহেশ^র এলাকার আব্দুর রহিম, সোনা মিয়া, মোহাম্মদ আলীসহ চরবাসি জানান, তিস্তার চরে প্রতি বছর কাঁশ জন্মায়। ভাদ্র-আশি^ন মাসে কাঁশফুল ঝরে যাওয়ার পর তারা সেগুলো কেটে এনে শুকিয়ে সংরক্ষণ করেন। তারা আরো জানান, এক বোঝা (আঁটি) কাঁশ বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চরাঞ্চলের প্রত্যেক অভাবি পরিবার প্রতি বছর ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকার কাঁশ বিক্রি করেন বলেও জানান তারা।
পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খাঁন বলেন, স্থানীয় পদ্ধতিতে আলু সংরক্ষণে মাচা তৈরির জন্যও কাঁশের চাহিদা রয়েছে। এছাড়া ঝাড়ু তৈরির জন্য পুরো বছর ধরে বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা এসে কাঁশ নিয়ে যান।
অভাবি এলাকা বলে পরিচিত রংপুরের গঙ্গাচড়ার আলমবিদিতর ইউনিয়নের পাইকান হাজিপাড়া গ্রাম। নদী ভাঙনে নিঃস্ব হওয়া শতাধিক পরিবার বসতি গড়ে তুলেছে এ গ্রামের তিস্তা প্রতিরক্ষা বাঁধে। অভাব-অনটন ছিল যাদের নিত্যসঙ্গী। প্রয়োজনের তাগিদে তারা প্রায় দুই দশক আগে শরৎকালে (ভাদ্র-আশ্বিনে) চরাঞ্চলে আপনা থেকে গজিয়ে ওঠা কাশিয়া (কাঁশ) থেকে ঝাড়ু তৈরি শুরু করেন। সে থেকে অনেকটাই ভালো আছেন তারা।
সরেজমিনে পাইকান হাজিপাড়া গ্রামে দেখা যায়, ঘনবসতিপূর্ণ এ গ্রামের প্রতি উঠোনে চলছে ঝাড়ু তৈরির কাজ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব পরিবারের লোকজনের কর্মব্যস্ততায় গ্রামটির আদল যেন বদলে গেছে। বিশেষ করে মহিলা ও শিশুদের একমাত্র কাজ হলো ঝাড়ু তৈরি করা। আর পুরুষরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে এসব ঝাড়ু বিক্রি করেন। ওই গ্রামে রয়েছে কয়েকজন মহাজন। যারা পাইকারি দামে ঝাড়ু বিক্রি করেন। অনেক অভাবি পরিবারের সদস্য ঝাড়ু কিনে অন্য কোনো গ্রামে গিয়ে বিক্রি করে মহাজনের টাকা পরিশোধ করেন। ঝাড়ু বিক্রির লাভ দিয়ে চলে তাদের সংসার। বাড়িতে ব্যবহারিক কাজে ঝাড়ুর প্রয়োজন থাকায় বর্তমান সময়ে এর চাহিদা বেশি বলে তারা জানান।
১০ বার তিস্তা নদীর ভাঙনের শিকার ওই গ্রামের বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম। তিনি জানান, তিস্তার চরে যা কাঁশ হয় তা দিয়ে এখন আর ব্যবসা চলে না। পার্শ্ববর্তী নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার টুনিরহাট হয়ে ভারত থেকে কাঁশ আনতে হয়। ভাড়াসহ প্রতি ট্রলি কাঁশ আনতে খরচ পড়ে ১৫ হাজার টাকা। যা দিয়ে ৮ হাজার ঝাড়ু তৈরি করা যায়। এতে লাভ হয় ১৫ হাজার টাকা। ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে এসব ঝাড়ু বিক্রি হয়ে যায়।
প্রতিদিন আড়াইশ’ ঝাড়ু তৈরি করেন ছাপিয়া বেগম। তিনি বলেন, ঝাড়ু বিক্রি করে এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি। গ্রামের মনিমালা ও সরো বালা জানান, গড়ে প্রতিদিন একশ’ ঝাড়ু বিক্রি করা যায়। এতে লাভ হয় ১০০ থেকে ১২০ টাকা। এমনি করে ঝাড়ু বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন মুকুল মিয়া, জোনাব আলী, মোলাই চন্দ্র, সোহরার, অজবালা, ঝরণা রাণী, শিল্পী, জ্ঞানবালা, দৈবকী, করুণা বালাসহ পাইকান হাজিপাড়া গ্রামের শতাধিক পরিবার।
আলমবিদিতর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোকারম হোসেন সুজন জানান, পাইকান হাজিপাড়া গ্রামের অভাবি পরিবারগুলো ঝাড়ু তৈরির মাধ্যমে বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে পেয়েছে। প্রায় দুই দশক থেকে এই কাজ করে তারা জীবন যাপন করছে।
আনন্দবাজার/এম.আর









