- সুরক্ষা ছাড়াই চলছে নির্মাণাকাজ
- প্রকল্পের আশপাশে চলাচলে আতঙ্ক
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিআরটি প্রকল্পের কাজ সুরক্ষা ছাড়াই চলছে। অতি সম্প্রতি অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি দুর্ঘটনায় ৬জন নিহত ও কমপক্ষে তিনজন আহতের ঘটনার পরও যানবাহনসহ সাধারণ মানুষ শঙ্কা নিয়ে চলাফেরা করছেন। ভারী যন্ত্রপাতি উঠানামা, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় গার্ডার ও অন্যান্য নির্মাণাধীণ উপকরণ সংরক্ষণ করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ঝুঁকি কমছে না।
বুধ ও বৃহস্পতিবার মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় বিআরটি প্রকল্পের চলমান থাকায় ঘুরে দেখা গেছে, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সড়কের ওপর রোড ডিভাইডারের কাটা অংশ ফেলে রাখা হয়েছে। গার্ডার, স্লাব সড়কের পাশে উম্মুক্তভাবে রাখা হয়েছে। ইট, বালু, সিমেন্ট, রডসহ নানা নির্মাণসামগ্রীও একইভাবে রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে নিরাপত্তা বেষ্টনী দেখা যায়নি। ঢাকার আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী মোড় পর্যন্ত চলছে বিআরটি প্রকল্পের কাজ।
টঙ্গী স্টেশন রোড থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত মিল গেট, টঙ্গী কলেজ গেট, হোসেন মার্কেট, চেরাগআলী, বাসন সড়ক, কুনিয়া তারগাছ, বোর্ড বাজার, ভোগরা বাইপাস পর্যন্ত কমপক্ষে ১৫টি জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ চলছে। বিআরটির স্টেশন, ফ্লাইওভার, গার্ডার পিলার নির্মাণের কাজ। বেশিরভাগ স্থানেই নিরাপত্তাবেষ্টনী ব্যবহার করা হয়নি। বাঁশ, টিন ও কাঠের বেড়া দিয়ে কোনো কোনো জায়গায় নামে মাত্র নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যবহার করা হয়েছে ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ গাজীপুরের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতি ২৪ ঘন্টায় গাজীপুরের অভ্যন্তরে এবং সড়ক-মহাসড়ক ব্যবহার করে কমপক্ষে ৫৫ হাজার যানবাহন চলাচল করছে। অর্ধেকের বেশি চলাচল করছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে।
ময়মনসিংহের আলম এশিয়া পরিবহনের চালক আব্দুল বাতেন বলেন, সড়ক উন্নয়নকাজে কোনো জায়গায় চলছে ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ আবার কানো জায়গায় গার্ডার উঠানোর কাজ। নির্মাণাধীন এসব কিছুর নিচ দিয়ে প্রতিনিয়ত যানবাহন, মানুষ চলাচল করছে। এসব কাজে আগে কখনো নিরাপত্তা প্রাচীর দেওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়নি।আগের মতোই চলছে নির্মাণকাজ। কোথাও রোড ডিভাইডার শুরু হয়ে এমন জায়গায় শেষ করা হয়েছে যেখানে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বিদ্যমান। চান্দনা চৌরাস্তায়ই এমনটি রয়েছে।
গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা মসজিদ মার্কেটের ইলেক্ট্রিক ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মার্কেটের তিন তলা থেকে প্রতিদিন কাজের দৃশ্য দেখা যায়। নিচ দিয়ে যাতায়াত করা কোনো মানুষ কাজের দৃশ্য দেখলে নিচ দিয়ে যেতে চাইবে না। সব লোহা লক্করের কাজ। কোনো একটি লোহার দন্ড নিচে পড়ে গেলে নিশ্চিত দুর্ঘটনা। এসবের নিচে কোনো পাটাতন বা পড়ে যাওয়া বস্তু ঠেকানোর প্রতিবন্ধক রাখা হয়নি।
ঢাকা থেকে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় চলাচলকারী প্রভাতী-বনশ্রী পরিবহনের চালক আরজু মিয়া বলেন, কোথাও কোথাও যানবাহন চলাচলে ডিভাইডারের কাটা অংশ ফেলে চলাচলের গতি নির্দেশ করা হয়েছে। আবার কোথাও কোনো নির্দেশক নেই। যানবাহন যে যার মতো পথে চলছে। প্রথম দিকে সড়কের টঙ্গীসহ কোনো কোনো অংশে টিন দিয়ে প্রাচীর করে গার্ডারের পিলার নির্মাণের কাজ হয়েছিল। নিরাপত্তার এ পদ্ধতিটি বেশিদিন চোখে পড়েনি।
গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাাকার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এখানে বিশাল জায়গা নিয়ে উড়ালসেতু নির্মাণের কাজ চলছে। প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত হাজার হাজার পথচারী চৌরাস্তা দিয়ে চলাচল করেন। চৌরাস্তার চারপাশে ইট, বালু সিমেন্ট ও নির্মাণ সামগ্রী ছড়িয়ে রয়েছে। ভারী যন্ত্রাংশ, নির্মাণসামগ্রী মাথার ওপর ঝুলে থাকলেও নিচে রাখা হয়নি কোনো বেষ্টনী। ঝুঁকি মাথায় নিয়েই প্রতিদিন হাজার হাজার পথচারী ও যানবাহন চলাচল করছে।
মহানগরের ছায়াবিথী এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম। শ্রীপুরের একটি পোশাক কারখানায় টেকনিক্যাল ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করেন। তিনি বলেন, গত প্রায় তিন বছর যাবত সকালে চান্দনা চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকি অফিসের গাড়ীর জন্য। ভয়ের মধ্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বিআরটি প্রকল্পের কাজের চরম অব্যবস্থাপনায় হতাশ যাত্রী ও চালকেরা।
বিআরটি প্রকল্প পরিচালক এ এস এম ইলিয়াস শাহ জানান, এ প্রকল্পের ৮২ শতাংশ কাজের অগ্রগতি হয়েছে। এ বছরেই বাকি কাজ শেষ হবে না। সময় বাড়ানোর জন্য সংশোধন করতে হবে। এজন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। তিনি এর বেশি কিছু বলতে চাননি।
টঙ্গী কলেজগেট এলাকায় গাজীপুর পরিবহনের চালক মহসীন উদ্দিন বলেন, নিরাপত্তার শক্তিশালী কোনো প্রতিবন্ধক না থাকায় কর্মীরাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। সড়কের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণাধীন পিলারগুলোর আশপাশে মাথায় হেলমেট পরিহিত কর্মীদের লোহা পেটানো এবং ঝালাইয়ের কাজ করছে।
চান্দনা চৌরাস্তা থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত সড়কের প্রধান দুটি অংশে ডিভাইডার রয়েছে। কোথাও পাশর্^ রাস্তায় ডিভাইডার রয়েছে। কিন্তু পাশর্^ রাস্তাগুলোতে যানবাহন সহজেই লেন পরিবর্তন করতে পারছে। এক ফুট পরিমাণ ড্রেন অতিক্রম করে যাাচ্ছেতাইভাবে যানবাহনগুলো লেন পরিবর্তন করছে। ফলে সড়কের সার্ডি রোড, গাজীপুর জেলা কারাগার, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, পল্লী বিদ্যুৎ অফিসসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ চলছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান বলেন, প্রকল্প কর্মকর্তারা বিভিন্ন বৈঠকে ঝুঁকি প্রতিরোধের আশ^াস দিয়েও তা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত নয়। তারা বিকল্প রাস্তার কথা বলেও তা করেননি। গাজীপুর মহানগরের ওপর দিয়ে হাজার হাজার যানবাহন এবং লক্ষ কোটি মানুষ চলাচল করছে নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্য দিয়ে।
গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নয়ন মিয়া বলেন, নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকা, ধুলোবালি নিয়ন্ত্রণে পানি না ছিটানো, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ মোকাবিলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না রাখার কারণে ঠিাকাদারী প্রতিষ্ঠানের লোকদেরকে বেশ কয়েকবার দন্ড দিয়ে জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ১৫ আগস্ট উড়ালসড়কের গার্ডারের চাপায় রাজধানীর উত্তরায় প্যারাডাইস টাওয়ারের সামনে একটি প্রাইভেট কারের পাঁচ আরোহী নিহত ও দুজন আহত হন। ওই দিন বিকেলে ব্যস্ত সড়কে গার্ডার ওঠানোর কাজ করার সময় একটি ক্রেন কাত হয়ে গেলে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় গত ১৫ জুলাই উড়ালসড়কের লঞ্চিং গার্ডার পড়ে এক নিরাপত্তাকর্মী নিহত ও দুজন আহত হন।









