- কোটি পরিবারে ১১০ টাকা লিটার
- সরবরাহ না বাড়িয়ে দাম কমানো
এবাররের ঈদ যাত্রাটা আগের সময়ের তুলনায় কিছুটা জটিলতামুক্ত হলেও আলোচনায় ছিল তেলের বাজার। হঠাৎ করেই সরকারি ঘোষণায় সয়াবিনের দাম প্রতি লিটারে ৪০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপে পড়ে মানুষ। গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে সংবাদ মাধ্যমের প্রধান খবরের জায়গা দখলে নেয় ভোজ্যতেল।
খোলা সয়াবিন তেল যা এতদিন ১৪০ টাকা ছিল, নতুন দর অনুযায়ী, প্রতি লিটার ১৮০ টাকা হয়েছে৷ বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৮ টাকা করা হয়েছে৷ ৫ লিটারের বোতলের দাম হবে ৯৮৫ টাকা৷ শতকরা হারে পাম তেলের দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশ। আর সয়াবিনের দাম খুচরায় বেড়েছে ২৮ শতাংশ, বোতলজাতের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ। এ নিয়ে গত চার মাসে তৃতীয়বারের মতো ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হলো।
অর্থনীতির ভাষায় যদি চাহিদা বাড়ে, সরবরাহ স্থির থাকে- জিনিসের দাম বাড়বে। যদি চাহিদা বাড়ে, সরবরাহও বাড়ে, তাহলেও দাম স্থির থাকবে। যদি সরবরাহ বাড়ে, চাহিদা কমে- দাম কমবে। তেলের দাম বেড়েছে, এর পেছনে অবশ্যই কারণ আছে- হয় চাহিদা বৃদ্ধি, নয়তো সরবরাহ হ্রাস।
বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ সয়াবিন তেল আমদানিকারক দেশে এখন চলছে ভোজ্যতেলের রাজত্ব। সারা দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে ৫টি আমদানিকারক কোম্পানি। কৃত্রিম সংকট তৈরির কারণে ১৬০ টাকার বোতলজাত সয়াবিন তেলের লিটার ২২০ টাকায়ও বাজারে পাওয়া যাচ্ছিল না৷ আর এখন ১৯৮ টাকা লিটার বেঁধে দিলেও বাজারে সরবরাহ শুরু না হওয়ায় তেল পাওয়া যাচ্ছে না বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্যসংকটও দেখা যাচ্ছে।
এদিকে দাম বৃদ্ধি নিয়ে মিলাররা বলছেন খুচরা বিক্রেতাদের কথা আর আমদানিকারকরা দিচ্ছেন বিশ্ববাজারের দোহাই। যদিও বিশ্ব বাজারে দাম বাড়লেও বাড়তি মূল্যের তেল দেশে আসতেও তিন মাস লাগে সেখানে তাৎক্ষণিক মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে মিল মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ভোজ্যতেলের দাম ঘোষণা করা হলেও এবার মিল মালিকরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজেরাই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন। গত মার্চের মাঝামাঝিতে তেলের আমদানি, পরিশোধন ও বিক্রয় পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহারের পর ঈদের আগে লিটারে ৭ টাকা করে দাম কমানো হয়েছিল৷
এই পরিস্থিতিতে এপ্রিল ও মে মাসে ধীরে ধীরে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিতে থাকেন মিল মালিকরা। দাম বৃদ্ধির আশায় ডিলার ও পাইকারি বিক্রেতারাও তেলের মজুদ শুরু করেন৷ এসব ঘটনা ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ধরাও পড়ে অনেকে।
মিল মালিকদের দাবি, বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেলের নিয়মিত মূল্য প্রতিটন ১২০০ ডলার থেকে বেড়ে ১৮০০ ডলারে উঠেছে। পরে সেটা কিছুটা কমে ১৬০০ ডলারে হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটেই দেশের বাজারে তেলের দাম বাড়াতে হচ্ছে। যেখানে ভোজ্যতেলের চাহিদার ৭০ ভাগই করা হয় আমদানি। দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২০ লাখ টন। ইন্দোনেশিয়ার তেল রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তে দেশসহ সারাবিশ্বে ভোজ্যতেলে বড় ধরনের সংকটে আশঙ্কার মধ্যে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে পরিস্থিতি সামালের কৌশল নির্ধারণ।
বিচারপতি সাত্তাররের আমলে ‘আমাদের খাদ্য-অভ্যাস পরিবর্তন করিতে হইবে- রাষ্ট্রপতি।’ কিংবা ‘ভাতের বদলে আলু খাও- সাত্তার’ এমন শিরোনামে দাম বাড়ায় বিকল্প থিওরি নিয়ে কথা হয়েছিল। রোজায় বেগুনিতে কুমড়ার ব্যবহার নিয়ে অনেক আলাপ হয়েছে। পেঁয়াজ ছাড়া-তেল ছাড়া রান্নার ভিডিও বাড়ছে। এখন আবার বাদামের তেল নিয়েও আলাপ হবে তবে এতে কি মুক্তি মিলবে?
এমন অবস্থা সামাল দিতে ঘোষণা এসেছে প্রতি লিটার ১১০ টাকা দরে এক কোটি পরিবারের কাছে সয়াবিন বিক্রি করবে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। আগামী জুন থেকে ন্যায্যমূল্যে এ তেল কিনতে পারবেন টিসিবি কার্ডধারীরা।
সাম্প্রতিক টিসিবি লাইনের পেছনে মানুষের ছুটোছুটি প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতি নিয়ে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণেই নিম্নবিত্তের সঙ্গে মধ্যবিত্তও লাইনে শামিল হচ্ছিলেন। তাদের অনেকেই আবার সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা দেখলে আড়াল হচ্ছিলেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়তে থাকায় আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেলাতে না পেরে তারা টিসিবির পণ্যের জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের। বাণিজ্যমন্ত্রীও মধ্যবিত্তের লাইনে দাড়াঁনোর কথা স্বাচ্ছন্দের সঙ্গে বলেছিলেন। সে সময়ের টিসিবির ট্রাকের পেছনের দীর্ঘ লাইনকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বিশেষ বিশেষ গণমাধ্যমের নতুন করে বাসন্তী খোঁজার প্রয়াস বলে মন্তব্য করেছিলেন।
টিসিবির তেল বিক্রির ঘোষণা কি নতুন করে ট্রাকের পিছনে তেলের মিছিল তৈরি করবে না? কোটি মানুষকে লাইনে সামাল দেওয়াটাও হয়তো সহজ হবে না। এক কোটি পরিবার কি পাবে সেই তেল? তাতে কি সামধান মিলবে? দেশব্যাপী এক কোটি নিম্ন আয়ের পরিবারকে দুই কিস্তিতে পণ্য দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল রোজায়। সেটা কতটা বাজার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছে সেই পর্যালোচনা করার সময় এসেছে।









