- সক্ষমতা থাকলেও কর দিতে আগ্রহ নেই
দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে আয়কর সীমায় আছে প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ। সক্ষমতা থাকলেও জনগোষ্ঠির বড় অংশ কর দিচ্ছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন হিসাব পাওয়া যায়। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি পাঠিয়ে করজালের আওতা বাড়াতে জোরালো পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে। এনবিআর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, করদাতার সংখ্যা বাড়াতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
করদাতার সংখ্যা বাড়াতে অর্থনীতিবিদরা শহর অঞ্চলের পাশপাশি উপজেলা পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া ইটিআইএন না থাকলে সকল নাগরিক সুবিধা বন্ধ করে দেয়া এবং রিটার্নে মিথ্যা তথ্য প্রদানকারীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার সুপারিশ জানিয়েছেন।
সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আনন্দবাজারকে বলেন, বিভিন্ন সময়ে তথ্য সংগ্রহ করে দেখা গিয়েছে দেশে ৫ কোটির বেশি মানুষ করযোগ্য। এ জনসংখ্যা করজালে আনতে পারলে কর আদায়ের পরিমাণ কয়েকগুণ বাড়বে।
একই মত জানিয়ে বেসরকারী গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আনন্দবাজারকে বলেন, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান সিঙ্গাপুরসহ বিশে^র অনেক উন্নত দেশে সচেতনতা বাড়িয়ে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এসব মানুষকে করসীমায় আনতে বিভিন্ন সরকারী সেবা ও সুবিধা নিতে ইটিআইএন ব্যবহৃাওে কঠোরতা আনা প্রয়োজন। এছাড়া মিথ্যা তথ্যে করসীমায় না আসলেও কঠোর শাস্তির আওতায় আনা উচিত।
এনবিআরের করনীতি শাখার সদস্য আলমগীর হোসেন আনন্দবাজারকে বলেন, ১৬ কোটি মানুষের এদেশে করযোগ্য মানুষ চিহিৃত করতে এনবিআর জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আশাকরি সুফল পাওয়া যাবে। চলতি করবর্ষের নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর। ২০১৩ সালে এনবিআর পুরানো ১০ ডিজিটের টিআইএন বাতিল করে ১২ ডিজিটের ইটিআইএন গ্রহণ বাধ্যতামুলক করে। এনবিআরের সর্বশেষ হিসাবে গত ২০১৩ থেকে এপর্যন্ত ইটিআইএনধারীর সংখ্যা ৬৮ লাখ ছাড়িয়েছে।
করদাতার সংখ্যা বাড়াতে নতুন বছরের (২০২১) শুরু থেকে এনবিআর কয়েকটি ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপ করেছে। বিশেষভাবে তরুণ করদাতা সংগ্রহে জোর দিয়েছে। ১৮ বছর হলেই প্রত্যেক নাগরিককে ইটিআইএন গ্রহণ করতে বলা হলেও এনবিআর বাধ্যতামূলক করেনি। এবিষয়ে এনবিআর নজরদারি বাড়িয়েছে।
২০১২সালে তৎকালিন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত শহরের পাশপাপাশি উপজেলা পর্যায়ের সম্পদ শালীদের চিহিৃত করতে দেশের ৪০০ শতাধিক উপজেলায় রাজস্ব দপ্তর স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। দুই শতাধিক উপজেলায় রাজস্ব দপ্তর স্থাপন করা হলেও বাকীগুলোতে এখনো হয়নি। অর্থমন্ত্রণালয় থেকে উপজেলা পর্যায়ে নতুন কর দাতা সংগ্রহের হার বাড়াতে জোর দিয়েছে।
পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর আনন্দবাজারকে বলেন, উপজেলার বড় বড় বাজারে উপস্থিত হয়ে কে বা কারা বড় অংকের বাণিজ্য করে তার খোঁজ করা যেতে পারে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ের ব্যাংকগুলিতে কে বা কারা বেশি টাকার হিসাবধারী তা চিহ্নিত করা সম্ভব।
একই মত জানিয়ে এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ আনন্দবাজারকে বলেন, উপজেলায় বসবাসরত কোন কোন পরিবারের সদস্য বিদেশে থাকে, তারা কোন চ্যানেলে কত পাঠায় তা চিহিৃত করতে হবে। এসব সূত্র ধরে করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে সঠিক হিসাবে রাজস্ব আদায়েরও সুযোগ আছে বলে জানিয়েছেন এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান। এক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে রাজস্ব দপ্তর স্থাপন করে নিয়মিত এনবিআর কর্মকর্তাদের উপস্থিত থেকে নজরদারির প্রয়োজন বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের অনেকে প্রকৃত বেতন গোপন করে কর সীমার বাইরে আছে। তথ্য গোপনে অনেক সময় বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সহায়তা করে থাকে। এ বিষয়ে এনবিআর নজরদারি বাড়িয়েছে।
অনেক গৃহীণি স্থায়ী ও অস্থায়ী সম্পদের মালিক হলেও আয়কর রিটার্ন জমা দেন না। ইটিআইএন গ্রহণ পর্যন্ত করেন না। অনেক সময় এনবিআরের নজরদারি এড়াতে স্ত্রীর নামে লেনদেন করে অসাধু ব্যাক্তিরা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে থাকে। অন্যদিকে অনেক ব্যবসায়ী মোটা অংকের অর্থ আয় করলেও নিকটাত্মীয়, বিশ্বস্ত কর্মচারী বা বন্ধুর নামেও লেনদেন করে থাকে। নতুন করদাতা চিহিৃতে এসব ক্ষেত্রে এনবিআর নজরদারি বাড়িয়েছে।
বিভিন্ন জনবহুল স্থানে করদাতা সংগ্রহে হঠাৎ পরিদর্শনে এনবিআর কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এসব টাস্কফোর্স হাসপাতাল, বড় বড় শপিং মল সহ বিভিন্ন জনবহুল স্থানে উপস্থিত হয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের, উপস্থিত ক্রেতা বা সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের ইটিআইএন আছে কিনা তা যাচাই করে তাৎক্ষণিক ইটিআইএন প্রদান করা হবে।
আনন্দবাজার/শহক








