বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা প্রকৃতিক সৌন্দর্য্যরে দ্বীপ জনপদ কুকরী-মুকরী। ভোলার দক্ষিণ উপকূল চরফ্যাশনের ম্যানগ্রোভ বাগানকে সুন্দরবনের আদলে গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ‘আন্ডার প্লান্টিং ট্রায়েল উইথ ম্যানগ্রোভ স্পেসিস ইন দ্য কোস্টাল বেল্ট অব বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় বন গবেষণা ইউনিট মানবসৃষ্ট সুন্দরবন গড়ার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। কুকরী দ্বীপের একদল নারী শ্রমিকের হাতধরে মানবসৃষ্ট সুন্দরবনের আদলে এ জনপদে গড়ে উঠেছে সবুজ বেস্টুনী।
জানা যায়, ১৯৯০ সালে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে কুকরীতে সুন্দরবন প্রজাতির গাছের চারা উৎপাদন এবং বনায়ন শুরু করা হয়েছে। এ পর্যন্ত কুকরীর চরদিগল, নার্সারীর খাল, চরশফি, চরজমির, চর ইসলাম এবং জাইল্যার খালের ১৬ একর বাগানে সুন্দরবন প্রজাতির বৃক্ষ রোপন করা হয়েছে এবং যাদের শতকরা ৮০ ভাগ বৃক্ষই টিকে গেছে, যা প্রত্যাশার চেয়ে বেশী। কুকরীর বিভিন্ন বাগান ঘুরে ৩০ থেকে ৪০ ফুট উচ্চতার সুন্দরি গাল সেগুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ চোখে পড়েছে। এসব বাহারি প্রজাতির গাছপালা আর জীববৈচিত্রের সমারহ যেন মন কাড়ে ভ্রমণ পিঁপাসুদের। দখিনা জনপদের কাছে এটি এখন পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নানা প্রজাতির বৃক্ষ-তরুলতা আর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্যরে কারণেই কুকরী-মুকরীর বাঁকে বাঁকে যেন সুন্দরবনের প্রতিচ্ছবি লক্ষ্য করা হয়। সে কারণেই দ্বিতীয় সুন্দর বন হিসাবে গড়ে উঠছে কুকরী-মুকরী।
বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, চরদিঘল, চরজমির, চরসুফী, চরআলীম, চর পাতিলা ও কুকরী-মুকরী নিয়ে কুকরী-মুকরী রেঞ্জ। ৬ হাজার ৪৩০ হেক্টর এলাকায় রয়েছে কেওড়া, গোলপাতা, সুন্দরী, কাকড়া, গেওয়া, বাইন, রেন্ড্রি, আকাশমনি ও মেহগনির বৃক্ষের সমারোহ। যেখানে জীবিত গাছের সংখ্যাই প্রায় সাড়ে ৩ কোটি। পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে এখানে একের পর এক স্থাপনা গড়ে উঠছে। ইতিমধ্যে পাখি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন হয়েছে। এখন নির্মিত হয়েছে ফাইভ স্টার মানের একটি টুরিস্ট হোটেল। দর্শনীয় স্থান হিসাবে রয়েছে নারিকেল বাগান, বালুর ধুম, লাল কাকড়া, সাগর পাড়ে প্রকৃতিকভাবে গড়ে উঠা সি-বীজ ও সাগরের গর্জন। নারিকেল বাগানের কাছে বন বিভাগ পর্যটকদের জন্য চেয়ার স্থাপন করেছে, সেখানে বসেই সাগরের উত্তাল ঢেউ ও অতিথি পাখিসহ সবুজ বনানির দৃশ্য দেখা যাবে। এছাড়াও কুকরী বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে সূর্যদয় ও সূর্যাস্তের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যাবে। ৭০- এর বন্যায় বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো দক্ষিণাঞ্চলের এ ছোট দ্বীপ কুকরী-মুকরীতে। সাগরের কোল ঘেঁষা এ দ্বীপে ১৯৯৯ সালে বনায়ন কার্যক্রম শুরু হয়। ধীরে ধীরে সেখানে সবুজের বেস্টুনি গড়ে উঠেছে। ঝড়-জলোচ্ছাসসহ নানা প্রকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেয়ে আসছে কুকরী-মুকরীর ১৮ হাজার মানুষ। সিডর ও আইলায় কুকরী-মুকরীর মানুষ রক্ষিত ছিলো।
কুকরী-মুকরীর বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন জানান, দ্বীপের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে বিশেষ করে শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসেন মানুষ। এখানে পিকনিকসহ নানা বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে যোগাযোগ, থাকা ও খাওয়ার সু-ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই বিড়ম্বনায় পড়তে মানুষ ভ্রমণ পিপাসুদের।
কুকরীর বাসিন্দা ফারুক বলেন, কুকরী-মুকরী অনেকটা সুন্দর বনের মতই দেখতে, বাহারি প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য্য নজরকাড়ে ভ্রমণ পিপাসু মানুষের।
ঘুরতে আসা শাহিন, মাইন উদ্দিন, কারুল হাসান বলেন, কুকরী- সৌন্দর্য্যরে কথা আগে শুনেছি, তবে আসা হয়নি, এখন এখানে এসেই মুগ্ধ হলাম। কি নেই এখানে, সব কিছুই যেন সুন্দরবনের মতই।
কুকরী-মুকরী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল হাসেন মহাজন বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন এলাকার মধ্যে কুকরী-মুকরী একটি নান্দনিক সৌন্দর্য্যরে স্পট। যা পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে হাজার হাজার মানুষ ঘুরতে আসেন। এখানে ফাইভ স্টার মানের রিসোটসহ নানা স্থপনা নির্মাণ করা হয়েছে। যাতে করে পর্যটকরা ঘুরতে এসে বিড়ম্বনার মধ্যে না পরে।
চরকুকরী রেঞ্জ কর্মকর্তা সুমন চন্দ্র দাস বলেন, কুকরী-মুকরী সুন্দরবনের মতই এখানে হরিন, বানর, ভাল্লুকসহ নানা প্রজাতির বৈচিত্রময় প্রাণি ও নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি রয়েছে। বন মন্ত্রনালয় ইতোমধ্যে একটি টুরিস্ট হোটেল নির্মাণ করেছে। এখন শুধু যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নয়ন হলেই দেশের মধ্যে অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠবে কুকরী-মুকরী।









