‘মুজিবকে শুরুতেই না মেরে মহাভুল করেছি। এখন আপনাকে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে পেছনের তারিখ দিয়ে তাকে মেরে ফেলার সুযোগ আমাকে দিন’। তৎকালীন পিপলস পার্টির প্রধান ও সদ্যক্ষমতা নেয়ার সময় প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে এই প্রস্তাব রেখেছিলেন পরাজিত প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তবে ভুট্টো সেই ফাঁদে পা না রেখে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়ার বিষয়ে চিন্তা শুরু করেন। ১৯৭৩ সালের ২২ এপ্রিলে পাকিস্তানের করাচি থেকে প্রকাশিত আউটলুক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল।
এর আগে ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এতে পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের মধ্যেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সেখানকার ছাত্র-শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, আইনজীবী ও ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা এর তীব্রপ্রতিবাদ করে তাকে মুক্তি দেয়ার জন্য বিবৃতি প্রদান করেন। অবশ্য এর আগে ৩ আগস্ট পাকিস্তানের বিপক্ষে যুদ্ধঘোষণা ও অন্যান্য অপরাধের জন্য বিশেষ সামরিক আদালতে বঙ্গবন্ধুর বিচারের ঘোষণা দেন ইয়াহিয়া খান।
অবশ্য একাত্তরের ২৬ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধুকে নিজগৃহ থেকে গ্রেফতারের সময়ও তাকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় ধরার নির্দেশনা দিয়েছিলেন ইয়াহিয়া খান। এ বিষয়ে ১৯৯৭ সালে পাকিস্তানের লাহোর থেকে প্রকাশিত আহমেদ সালিমের লিখিত “ব্লাড বিটন ট্র্যাক” বইয়ে বলা হয়, এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছিলেন পাকিস্তানি মেজর বিলাল। রাত দেড়টার সময় এটা তিনি সমাধা করতে চেয়েছিলেন। তার অধীনে ছিল একটা ট্যাঙ্ক, একটা আরমড পারসনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) এবং কয়েকটি ট্রাকভর্তি জওয়ান। তারা রাস্তায় অনেক ব্যারিকেড ও বাধা অতিক্রম করে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। বাড়িটিকে তাক করে জওয়ানরা কিছুক্ষণ গোলাগুলি করে। শব্দ শুনে বাইরে বেরিয়ে আসেন শেখ মুজিব।
ডেভিড ফ্রস্টের করা আউটলুক ম্যাগাজিনে ১৯৭৩ সালের ২২ এপ্রিলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোমরা এখন গোলাগুলি বন্ধ করতে পারো। আমি এখানে আছি। তোমরা কেন গুলি ছুঁড়ছো? এরপর তারা আমাকে চারদিক থেকে আক্রমণ করতে এগিয়ে আসতে থাকে। তখন তাদের মধ্য থেকে এক জওয়ান আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে তোমরা একে হত্যা করো না।’
ভারতের নয়াদিল্লি থেকে ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ম্যাসকারেনহাস রচিত “দ্য রেপ অব বাংলাদেশ” গ্রন্থে বলা হয়, ‘বঙ্গবন্ধুকে জীবিত গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয় ঢাকার শের-ই-বাংলানগরে অবস্থিত পাকিস্তানের সামরিক হেড কোয়াটার্স থেকে। একজন সামরিক অফিসার এসে বলে, স্যার আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।’ বঙ্গবন্ধুকে ২৯ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানে নেয়া হয়।
ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদণ্ডাদেশের খবরে তৎপর হয়ে পড়ে মুজিবনগর সরকার। তা ছাড়া উদ্বেগ জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ২৪টি দেশে চিঠি লেখেন। আমেরিকার সরকারও এই উদ্বেগ প্রকাশে অংশ নেয়। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব উ থান্ট এই বিচারবন্ধে ইয়াহিয়াকে সতর্ক করে বলেন, ‘এতে সংকট পাকিস্তানের বাইরে বিস্তৃত হয়ে যাবে।’ লায়লপুরের কারাগারে মৃত্যুদূতকে পাঠাতে ইয়াহিয়া খানের জোর তদবির চলে।
১৯৯৬ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ওবায়দুল হক রচিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব: এ লিডার উইথ এ ডিফারেন্স’ গ্রন্থে লেখেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সব সতর্কতা উপেক্ষা করে বিচার কাজ এগিয়ে নিতে থাকে লায়লপুর কারাগারে। বঙ্গবন্ধু আইনজীবীর সহায়তা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, ‘আমি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। আমার ও আমার জনগণের বিচার করার অধিকার এদের নেই।’
আহমেদ সালিম তা ‘পাকিস্তানের কারাগারে শেখ মুজিবের বন্দিজীবন’ বইতে লেখেন, ‘প্রহসনমূলক বিচারকাজ সপ্তাহকাল পর্যন্ত চলছিলো। আদালতের কার্যক্রম শেখ মুজিবকে দেয়া হলে তিনি এর ওপর লেখে দেন ‘সব মিথ্যে’। মানুষের হাতে যদি এটি থাকতো তবে তিনি নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে পারতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাগ্যে লেখা ছিল ভিন্ন কথা। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নেতা হিসেবে বিশে^র সামনে হাজির হবেন এটাই হয়তো ছিল প্রতিপালকের ইচ্ছা।
সাপ্তাহিক নিউজউইকের এক প্রতিবেদন জানায়, ‘২৬ ডিসেম্বর একটি সামরিক হেলিকপ্টারে লায়লপুরের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রাওয়ালপিণ্ডির বাইরে এক বাংলোতে নিয়ে রাখেন। সেখানে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আর্মি কমান্ডোদের প্রহরায় তাকে বন্দি রাখা হয়।’
হোসেন তওফিক ইমাম (এইচ টি ইমাম) তার ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১-৭৫’ বইতে লেখেন, ‘পাকিস্তানের নবনিযুক্ত মন্ত্রী আজিজ আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ড. কামাল হোসেনকে জানান, প্রেসিডেন্ট ভুট্টো অচিরেই করাচিতে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিষয়ে জনমত যাচাই করবেন। ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি করাচির জনসভায় ভুট্টো জনমত যাচাইয়ে তাকে মুক্তি দিতে জনগণের সমর্থন লাভ করেন। তখন সান্ধ্যকালীন সিহালা অতিথিশালায় বসে তা দেখেন বন্ধবন্ধু।’
১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি পিণ্ডিতে নৈশভোজে প্রেসিডেন্ট ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে প্রস্তাব দেন, ‘আমাদের পৃথক জাতি হলে চলবে না। যে করেই হোক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তবে আগের মতো নয়, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান বলে চেনা যায় এমন একটি দেশ হিসেবে। এটি পাকিস্তানে বসে ভাবতে হবে বিষয়টি এমন নয় তেহরান বা সুইজারল্যান্ডেও আমরা বসতে পারি। জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমার দেশের মন্ত্রীদের সাথে আলোচনা ছাড়া আপনার কথার কোনো জবাব আমার নেই। এরপর ১০ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আপনারা সুখে থাকুন। আপনাদের সঙ্গে আর না। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। আমরা স্বাধীন একটি জাতি।’
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের আত্মসমর্পনের ২৩ দিন পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পান বঙ্গবন্ধু। ব্রিটিশ লেখক রবার্ট পেইন তার ‘দ্যা টরচারড অ্যান্ড ড্যামড’ বইয়ে লেখেন, ‘এদিন মধ্যরাতে পাকিস্তানের বিমানবন্দর থেকে ভুট্টো তাকে বিদায় জানান। ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে বিমান আকাশে ডানা মেলে।’ পাকিস্তানের বাইরে বোয়িং ৭০৭ এ লন্ডন নিয়ে আসেন দেশটির মার্শাল জাফর চৌধুরী। তার লেখা ‘মোজাইক অব মেমোরি’ বইয়ে লেখেন, ‘ভোর ৬টায় লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছালে বাংলাদেশ কনস্যুলেটর তদানীন্তন বাঙালি কর্মকর্তা উপপ্রতিনিধি রেজাউল করিম বঙ্গবন্ধুকে প্রথমে সংবর্ধনা জানান। নিজের গাড়িতে করে তাকে ব্রিটিশ আতিথ্যগ্রহণ করতে ক্ল্যারিজেস হোটেলে নিয়ে যান। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ও লেবার পার্টির তৎকালীন লিডার (পরে প্রধানমন্ত্রী) হ্যারল্ড উইলসন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সাংবাদিকদের সামনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কথা বলেন।’
ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জি লন্ডন থেকে দিল্লি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সহযাত্রী ছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি ভোর ছয়টায় লন্ডন হিথরো বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানান ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিভাগের কর্মকর্তা ইয়ান সাদারল্যান্ড ও লন্ডনে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার আপা বি পন্থ। ৯ জানুয়ারি সকালে লন্ডনে বসেই টেলিফোনে ইন্দিরা গান্ধী-বঙ্গবন্ধু কথা বলেন’।
দিল্লির ‘এক্সপ্রেস’ পত্রিকার প্রতিবেদন জানায়, ‘কালো-ধূসর ওভারকোট পরে বঙ্গবন্ধু উড়োজাহাজের সিঁড়ি বেয়ে নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে নামলে ভারতের প্রেসিডেন্ট ভি ভি গিরি তাকে আলিঙ্গন করেন। তখন পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে স্বাগত জানান। অভিনন্দিত করা হয় ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি ঢাকা ফিরে আসেন দুপুর ১টা ৪১ মিনিটে। বিমানবন্দর ও রাস্তার দুপাশে তখন অপেক্ষমান লাখো জনতা। সবার কণ্ঠে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী, ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ তার বেশ কয়েকটি লেখায় বলেন, ‘১০ জানুয়ারি চির স্মরণীয় ও অনন্য ঐতিহাসিক একটি দিন। ১৯৭২ সালের এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন করে। বিমানে সিঁড়ি স্থাপনের সাথে সাথে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্যান্য নেতারা, মুজিব বাহিনীর চার প্রধান, কেন্দ্রীয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা তাকে অভ্যর্থনা জানায়। জাতির জনককে মাল্যভূষিত করার সাথে সাথেই তার সংযমের সকল বাঁধ ভেঙে যায়, তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। সে এক অবিস্মরণীয় ক্ষণ, অভূতপূর্ব মুহূর্ত। বিমানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু জনতার মহাসমুদ্রের উদ্দেশে হাত নাড়েন। তার চোখে তখন স্বজন হারানোর বেদনা-ভারাক্রান্ত অশ্রুর নদী, আর জ্যোতির্ময় দ্যুতি ছড়ানো মুখাবয়ব জুড়ে বিজয়ী বীরের পরিতৃপ্তির হাসি।
বাংলায় পদার্পণের সাথে সাথে একত্রিশবার তোপধ্বনি করে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি সম্মান জানানো হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। চারদিক থেকে তার ওপর পুষ্পবৃষ্টি হতে থাকে। বাংলাদেশ সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী রাষ্ট্রপ্রধানকে গার্ড অব অনার দেয়। মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু সালাম গ্রহণ করেন। এ সময় বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল আতাউল গণী ওসমানী, লে. কর্নেল শফিউল্লাহ্ এবং বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র লেফটেন্যান্ট শেখ কামাল জাতির জনকের পাশে ছিলেন। গার্ড অব অনার পরিদর্শনের পর বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দরে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতারা, ঢাকাস্থ বিদেশি মিশনের সদস্যরা, মিত্রবাহিনীর পদস্থ সামরিক অফিসার, বাংলাদেশ সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে করমর্দন করেন। পরে তাকে রেসকোর্স ময়দানে নিয়ে আসা হয়। এখানে তিনি ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন আবার সেখানেই আবার ভাষণ দেন।’
আনন্দবাজার/শহক









