- একাত্তরে পাকিস্তানিরা রেখে গিয়েছিল ১৬ ডলার
- ১৯৭২ সালে রিজার্ভ ছিল ১১০ কোটি টাকা
- ২০২১ সালে রিজার্ভ ৪৮০০ কোটি টাকা
- ২০২১ সালে বিনিয়োগ প্রস্তাব ৪৩ হাজার কোটি টাকার
- ২৩ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ চুক্তি সই
গত এক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে পেছনে ফেলে জিডিপিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ। ২০৩৫ সালে বিশ্বের ২৫তম অর্থনৈতিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে বাংলাদেশ। সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতির চাকা।
-আ হ ম মুস্তাফা কামাল, অর্থমন্ত্রী
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে সব ধরনের উদ্যোগ আর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। বিনিয়োগের লভ্যাংশ সহজেই নিজ দেশে নিয়ে যাওয়ার সব পথ সহজ করা হয়েছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বড় বড় বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নিচ্ছেন।
ইতোমধ্যে বহু দেশের উদ্যোক্তা তাদের বড় বিনিয়োগের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন। তাছাড়া সম্প্রতি আয়োজিত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন থেকে জাপান, চীন, ভারত, সৌদি আরব ও তুরস্কসহ বিশ্বের বহু দেশ থেকে বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। গত পঞ্চাশ বছরে শূন্য থেকে বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। মাথা পিছু আয়, শিক্ষার হার, আয়ু বেড়েছে বহুগুন। এক সময়ের আমদানি নির্ভরতার অপবাদ ঘুচে গেছে। এখন রফতানিমুখী শিল্পের জয়জয়কার দেশে।
মূলত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা এখন একেবারেই দৃশ্যমান। একাত্তরে পাকিস্তানিরা ব্যাংকের সব অর্থ পুড়িয়ে দিয়ে শুধু পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স পোর্টসিটি চট্টগ্রামের একাউন্টে রেখে গিয়েছিল মাত্র ১৬ ডলার। এমনকি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম বার্ষিক রিপোর্ট (১৯৭১-১৯৭৩) অনুযায়ী স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরপর বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার কোনো সঞ্চয় ছিল না। ১৯৭২ সালের ৩০ জুন রিজার্ভ ছিল মাত্র ১১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পরের বছর ১৯৭৩ সালের ২৯ জুনে রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১২৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকায়। আজ সেই বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাংক রিজার্ভ ৪৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বা চার হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এই রিজার্ভ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
দেশে প্রবাসী আয় এবছরই সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে। করোনার মধ্যেও দেশের অর্থনীতি সচল ছিল। প্রযুক্তিখাতে বাংলাদেশ দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম টার্গেট এখন বাংলাদেশ। আরো বিনিয়োগ টানতে চেষ্টা করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি দেশে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। যে সম্মেলন থেকে অভুতপূর্ব সাড়া পাওয়া গেছে।
তথ্যমতে, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিনিয়োগ বোর্ড ও বেসরকারীকরণ কমিশনকে একীভূত করে গত ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর গঠন করা হয় হয় বিডা। সংস্থাটি ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে সফল রোড শো করার পর দেশের মাটিতে বিনিয়োগের শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করে। প্রকৃতপক্ষে বিনিয়োগের পরিমাণের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রত্যাশা না করে শুধু নতুন বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরাই ছিল সম্মেলনের মূল লক্ষ্য। এতে আগামী কয়েক বছরে দেশে ৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের সুযোগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। নির্মাণাধীন ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ১২টি হাই-টেক পার্ক এবং নতুন পাওয়া সামুদ্রিক অঞ্চল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য বড় সুযোগ বলে ব্যাখ্যা করা হয় বিনিয়োগকারীদের সামনে।
বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অবকাঠামো, পুঁজিবাজার ও ফাইন্যান্সিয়ালসেবা, তথ্য-প্রযুক্তি, ইলেক্ট্রনিক্স উৎপাদন, চামড়া-স্বয়ংক্রিয় ও হালকা প্রকৌশল, কৃষিপণ্য ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ, পাট-বস্ত্র ও ব্লু-ইকোনোমিসহ ১১টি খাত যে বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। সম্মেলনে প্রথমে ইনভেস্টমেন্ট কম্পেটেটিভনেস অ্যান্ড বিজনেস এনভাইরনমেন্ট, ব্লু ইকোনোমি, বিজনেস সেশনের প্যারালাল ইকোনোমিক জোন, লেভারেজিং ফোর্থ আইআর, হেলথ অ্যান্ড ফামাসিউটিকেলসসহ পাঁচটি সেশন হয়। পরে ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড লজিস্টিকস, ক্যাপিটাল মার্কেট, পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি, লিগাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার, এগ্রিবিজনেস, লেদার অ্যান্ড লেদারগুডস, রেডিমেট গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল ও ইলেক্ট্রিকেল অ্যান্ড ইলেক্ট্রোনিক্স মেনুফেকচারিং অ্যান্ড প্লাস্টিক গুডস শীর্ষক ৮টি সেশন হয়। এসব সেশনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন দেশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।
সম্মেলনের তুলে ধরা হয়, করোনা পরবর্তী ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে চমাড়াজাত পণ্যের রফতানি বেড়েছে ৫৪ শতাংশ। জুতা উৎপাদনে বিশ্বে অষ্টম অবস্থানে থাকলেও চীনের দখলে রয়েছে বিশ্ব বাজারের ৬৩ শতাংশ। এ বাজার দখলে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে সুবর্ণ সুযোগ। ভিয়েতনাম বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজার দখলকারী হলেও দেশটিতে বাংলাদেশের মতো দক্ষ শ্রমিক নেই। ২০২৪ সালে এ খাত থেকে ৫০০ কোটি ডলায় আয়ের লক্ষ্যে সরকার ১৭ ধরণের প্রণোদনা দিচ্ছে।
অন্যদিকে, পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাত থেকে প্রায় তিন হাজার ১৫০ কোটি ডলার আয় হয়েছে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। বিশ্বের সেরা ১০০ কারখানার ৪০টিই বাংলাদেশের। তা ছাড়া ১৫০টি সবুজ কারখানা রয়েছে এ দেশে। ৭৪ ভাগ তুলা থেকে সুতা উৎপাদন হয় এখানে। তবে বিশ্বে সিনথেটিক সুতার চাহিদা বাড়তে থাকায় এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ আছে। বাংলাদেশে এখন জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি, পর্যটন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে ভোক্তা চাহিদা বৃদ্ধি ও বৈদেশিক চাহিদা থাকায় তৈরি হয়েছে বড় বাজারের। ফলে ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা, প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে বিনিয়োগের নতুন স্থান হিসেবে বিবেচনায় নিতে পারেন।
অন্যদিকে, উন্নত দেশের কাতারে যেতে হলে পরিবহন অবকাঠামো খাতে ২০৪০ সাল নাগাদ অন্তত সাড়ে ২৮ হাজার ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও রফতানি বহুমুখী করতে গতিশীল লজিস্টিকের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে উন্নত সড়ক অবকাঠামো তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করা সহজ হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান জানান, পাঁচ বিলিয়ন ডলার বা ৪২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাবনা এসেছে। যার মধ্যে চুক্তি হয়েছে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২২ হাজার ৯৫০ কোটি টাকার। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আরও কিছু সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। শুধুমাত্র সৌদি আরবই দেড় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। চট্টগ্রামে ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগও করবে তারা। এসব বিনিয়োগকে বোনাস উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা। সেই তুলে ধরার সম্মেলনেই এসেছে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রস্তাব। এটি বোনাস পাওয়া।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম বলছেন, বরিশাল ইলেকট্রনিক পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, কর্ণফুলী ড্রাই ডক, আয়গ্যাস তার্কি, ইউনাইটেড এলপিজিতে মোট ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব স্বাক্ষরিত হয়েছে। শুধু সৌদি আরব থেকেই এসেছে ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব। সৌদির ইঞ্জিনিয়ারিং ডাইম্যানশন ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন, আয়গ্যাস অ্যান্ড ইউনাইটেড গ্রুপের ১৫০ মিলিয়ন, কর্ণফুলী ড্রাই ডক ইকোনমিক জোন লিমিটেড ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) মধ্যে ১১৮ মিলিয়ন ডলার, বরিশাল ইলেক্ট্রিক পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব নিশ্চিত হয়েছে। চীনের মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৫০ কোটি ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইটি হাব হাই-টেক পার্কে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছে।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল বলেছেন, ২০০৯ হতে ২০১৯ পর্যন্ত গত ১০ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে পেছনে ফেলে জিডিপিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ। চীনের ১৭৭ শতাংশ, ভারতের ১১৭ শতাংশকে টপকে বাংলাদেশের অর্জন ১৮৮ শতাংশ। গত ১২ বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ হতে ৬ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগ ১৫ হতে ১০৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০৩৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৫তম অর্থনৈতিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা।
আনন্দবাজার/শহক









