অর্থের বিনিময়ে জীবন, সম্পদ বা মালামালের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির ন্যায়সঙ্গত ও নির্দিষ্ট ঝুঁকি স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে কার্যক্রম চালানো বীমা খাতের আওতা গোটা বিশ্বে দিন দিন সমৃদ্ধ আর সম্প্রসারিত হলেও দেশে কমে আসছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে বীমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করে আস্থা আর ভরসার প্রতীক হয়ে উঠলেও শুধু আস্থাহীনতার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশীয় বীমা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম। মূলত পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও গ্রাহকের বীমা দাবির অর্থ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিশোধ না করা নানা জটিলতা সৃষ্টির কারণে চরম আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে। আর সে কারণেই বীমার আওতা বাড়ানো কিংবা নতুন গ্রাহক তৈরির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাচ্ছে না কোম্পানিগুলো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ বীমা কোম্পানি কালক্ষেপণের দায় কৌশলে গ্রাহকের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। এতে গ্রাহক হয়রানি বেড়ে যায়। বীমা খাতের সেবা গ্রহণে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন সাধারণ মানুষ। এ খাতকে আধুনিক, যুগপোযোগী করে আস্থার জায়গা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কঠোর হতে হবে। বীমা দাবির অর্থ যাতে কোম্পানিগুলো সময়মতো পরিশোধ করে, সে ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি থাকতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উচ্চ কমিশনের বিনিময়ে প্রিমিয়াম সংগ্রহ, কম পুনর্বীমা, দেরিতে দাবি নিষ্পত্তি, অন্যায্য প্রভাব, দুর্বল জনশক্তির মান, পরিচালন দুর্বলতা, ব্যাংকারদের কমিশন বাণিজ্য, সার্ভেয়ারদের মনগড়া সার্ভে এবং বিভিন্ন অনিয়মের কারণে এ খাত অগ্রসর হতে পারছে না। এতে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে এ সেবার আওতায় নিতে পারছে না বেশিরভাগ কোম্পানি। বিশেষ করে, প্রবাসী শ্রমিক তথা দেশের রেমিট্যান্সের প্রধান সরবরাহকারী থেকে শুরু করে কৃষিজীবীসহ বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ এখনও রয়ে গেছে বীমা সেবার আওতার বাইরে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, দরিদ্রতা, শিক্ষায় পাশ্চাদপদতা এবং সচেতনতার অভাব দেশের এই শিল্পখাতের বিকাশে প্রধান অন্তরায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশের সম্ভাবনাময় ও বিকাশমান খাতগুলোর মধ্যে সামনের সারিতে রয়েছে বীমা শিল্প। দ্রুত সম্প্রসারণশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে বীমার গুরুত্ব ও ব্যাপকতা দিন দিন অপরিসীম হয়ে উঠছে। তথ্যমতে, গোটা বিশ্বের বীমা শিল্পখাতে অবদান ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৬তম। যা প্রমাণ করে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বীমা শিল্প খুবই নগণ্য, অর্থাৎ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ মাত্র। এখানে মাথাপিছু বীমা ব্যয় কেবল দুই দশমিক ছয় মার্কিন ডলার বা মাত্র ৫১০ টাকা। জিডিপি অনুপাতে বীমা প্রিমিয়াম দাঁড়িয়ে আছে মাত্র দশমিক নয় শতাংশে। এর মধ্যে দশমিক সাত শতাংশ জীবন বীমা এবং বাকি দশমিক দুই শতাংশ সাধারণ বীমা।
বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বীমা কোম্পানির সংখ্যা বেশি হলেও সেবার মান বিশ্বমানের করতে সুদূর প্রসারি কোনো পরিকল্পনা নেই। যেখানে প্রায় ১৩০ কোটির বেশি জনসংখ্যার প্রতিবেশী দেশ ভারতে বীমা কোম্পানির সংখ্যা মাত্র ৬০টি, সেখানে মাত্র ১৮ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে সেবা দিচ্ছে ৭৯টি বীমা কোম্পানি। জনসংখ্যা অনুপাতে কোম্পানির সংখ্যা বেশি হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকছে। দেশের বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৩৩টি লাইফ বীমা এবং ৪৬টি নন লাইফ বীমা কোম্পানি। লাইফ বীমার মধ্যে মাত্র একটি সরকারি এবং ৩২টি বেসরকারি মালিকানাধীন। অন্যদিকে নন লাইফ বীমা কোম্পানির মধ্যে একটি সরকারি এবং ৪৫টি বেসরকারি মালিকানাধীন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বীমা খাতের যে বাজারের তাতে নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা অনেক বেশি। সাধারণ বীমার ৩৬ শতাংশই শীর্ষ চার কোম্পানি বা করপোরেশনের দখলে। আর জীবন বীমা মূলত নিয়ন্ত্রণ করে মূলত বিদেশি কোম্পানি। দেশে সাধারণ বীমার বাজার পরিচালিত হয় শাখার মাধ্যমে। আর এজেন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয় জীবন বীমা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, জীবন বীমার আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনায় এক সময় প্রান্তিক পর্যায়ে সেবা দেয়ার প্রচলন হয়। মফস্বল বা গ্রামে অনেক কোম্পানির শাখা পরিচালিত হতে দেখা যায়। তবে বর্তমানে সেসব শাখার বেশিরভাগই বন্ধ করে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে অন্যান্যা কোম্পানির বেশিরভাগ শাখাগুলোও টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তাদের এই লড়াই কতদিন চালিয়ে যেতে পারবে তা নিয়ে শঙ্কিত কোম্পানিগুলো।
বীমা খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগামীতে বৈশ্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বীমা কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বেশিরভাগ ছোট ও অসংগঠিত কোম্পানি পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হবে। বহির্বিশ্ব বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ কিংবা অন্য একই ধরনের দেশে যা ঘটছে, তা বিবেচনায় নিলে আমাদের বীমা খাতের আরো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
আনন্দবাজার/শহক








