
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওমিক্রনের কার্যকর টিকা এলে বিশ্ব অর্থনীতি আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আশা করা যায়। যত দ্রুত সম্ভব প্রতিষেধক তৈরি জরুরি। তবে তাতে কত সময় লাগবে তা নিয়ে ভাবতে হবে।
মহামারি করোনা লন্ডভন্ড করে দিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। স্বাভাবিক উন্নয়নের গতিকে করেছে স্তব্ধ। গেল প্রায় দুই বছর ধরে করোনার সঙ্কটে থাকা দেশগুলো অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে বর্তমানে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। শিল্প-কারখানার চাকাও ইতোমধ্যে সচল হয়েছে। বিশ্বব্যাপী সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থাও দ্রুতগতি পেয়েছে। ঠিক এমনি সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুত্থান প্রচেষ্টাকে চোখ-রাঙাচ্ছে করোনার নতুন ভেরিয়েন্ট ওমিক্রন।
বিশ্বের বড় বড় শেয়ারবাজারে সূচকে বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে। তেলের বাজারও নিম্নমুখী। উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীরা বলছেন, করোনার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা একন ওমিক্রন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, করোনার চেয়ে মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ব অর্থনীতি। আবারও হুমকিতে ফেলতে পারে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার।
ই-পেপার পড়তে : ই-আনন্দবাজার
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গেল বছরের (২০২০) এপ্রিলে রেকর্ড ধসের পর বিশ্ববাজারে তেলের দামের সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে এবারই। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমেছে ১০ শতাংশের বেশি। মার্কিন তেলের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দর ১৩ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল দাঁড়িয়েছে ৬৮ দশমিক ১৫ ডলারে। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১২ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল বিক্রি হয়েছে ৭২ দশমিক ৭২ ডলারে। শুধু তেলের বাজারই নয়, ওমিক্রনের ধাক্কায় অস্থিরতা দেখা দিয়েছে শেয়ারবাজারেও। বিগত ১৭ মাসের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ইউরোপীয় শেয়ারবাজারগুলোতে। যুক্তরাষ্ট্রের ডো জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজের সূচক কমেছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
সিএনএন বিজনেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরো মুদ্রা ব্যবহারকারী ১৯ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে করোনার প্রভাব এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের অন্যতম পরিমাপক আইএইচএস মার্কিটের সূচক। গত অক্টোবরে এ সূচক ছয় মাসে সর্বনিম্ন হওয়ার পর নভেম্বরে বেড়েছে। কিন্তু অমিক্রনের কারণে ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আইএইচএস মার্কিটের ব্যবসাবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্রিস উইলিয়ামসন বলছেন, নভেম্বরে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড অর্থনীতিবিদদের ধারণাকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে নতুন সংক্রমণ যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে ডিসেম্বরে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হবে। ফলে চতুর্থ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি হবে শ্লথ।
ইউরোপীয় কমিশনের এক হিসাবে বলা হচ্ছে, ইউরোজোনে নভেম্বরে ভোক্তা আস্থা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। গেল বছরে করোনা মহামারিতে ইউরোপে অর্থনৈতিক উৎপাদন কমে যায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক টিকা কার্যক্রমের পরিসর বাড়ার ফলে কর্মকাণ্ড বেড়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ইউরোজোনে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আগের প্রান্তিকের চেয়ে হয়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ। ইউরোপের ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ জেসিকা হিন্ডস বলছেন, যদি এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দেশটি লকডাউনে যায়, তাহলে পুরো ইউরোপ আবারও অচলাবস্থায় পড়ে যেতে পারে।
ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেছেন, আফ্রিকার ছয়টি দেশ থেকে আকাশপথে ভ্রমণ স্থগিত করবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। এসব কারণে আকস্মিকভাবে তেলের দরপতন হয়। ফলে বৃটেনের অনেক তেল ও গ্যাস কোম্পানি বড় লোকসান গোনে। গত ২৬ নভেম্বর সকালের মাঝামাঝি বৃটেনের তেল বিষয়ক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান রয়েল ডাচ শেল-এর মূল্য পড়ে যায় শতকরা ৫ দশমিক ৫ ভাগ। অন্যদিকে বিপি বা বৃটিশ পেট্রোলিয়ামে দরপতন হয়েছে শতকরা ৬ দশমিক ৭ ভাগ।
এদিকে, ওমিক্রনের কারণে আসন্ন মন্ত্রিপর্যায়ের সম্মেলন স্থগিত করেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। আগামী সপ্তাহে সম্মেলনটি হওয়ার কথা ছিল। পুনঃনির্ধারিত বৈঠকের জন্য কোনো নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। বৈঠক স্থগিত হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য সুবিধা হয়েছে উল্লেখ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, এখন বরং দর-কষাকষি করার বাড়তি সময় পাওয়া গেল। আশঙ্কা ছিল, মৎস্য বিষয়েও বাংলাদেশের ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে। স্থগিত হয়ে যাওয়ায় এখন কিছুটা দম পাওয়া গেল।
মার্কিন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া, বতসোয়ানা, জিম্বাবুয়ে, মোজাম্বিক, লেসোথো, মালাউই এবং এসওয়াতিনিতে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। বাইডেন বলেছেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা সতর্ক থাকব। করোনার নতুন ধরন সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই জানি না। নতুন ধরনটি খুব দ্রুত ছড়ায় এবং এটি বেশ উদ্বেগের। এছাড়াও সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, জর্ডান ও মরক্কোও একই পথে হাঁটছে। ইউরোপে সর্ব প্রথম করোনার এই ধরন শনাক্ত হয়েছে বেলজিয়ামে। দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, বাতসোয়ানা, ইসরায়েল ও হংকংয়েও শনাক্ত হয়েছে।
গেল ২৫ নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শনাক্ত করোনার বি.১.১৫২৯ নামের রূপান্তরিত ধরনটি। পরে গ্রিক বর্ণমালা অনুসারে নাম দেওয়া হয় ওমিক্রন। ইতোমধ্যে এই ধরনটি ১১টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশ আন্তর্জাতিক চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ শুরু করেছে। সতর্কতা হিসেবে বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন ধরন আসার জন্য বসে না থেকে স্বাস্থ্য বিভাগকে মাঠে নামতে হবে। রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা জোরদার,কোয়ারেন্টিন, ও আইসোলেশন ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। হাসপাতালে রোগী ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করতে হবে। মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
করোনার নতুন ভেরিয়েন্ট ওমিক্রন ভারতে শনাক্ত হওয়া ডেলটার চেয়েও অনেক বেশি সংক্রামক হতে পারে উল্লেখ করে ভারতেরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান বিজ্ঞানী সৌম্য স্বামীনাথন। তার মতে ওমিক্রনের বিরুদ্ধে লড়তে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক কৌশল প্রণয়ন জরুরি। টিকাদান ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষামূলক পদক্ষেপগুলোকে এখনো অগ্রাধিকার দিতে হবে।
করোনার নতুন এই ধরনটিকে ‘উদ্বেগজনক’ আখ্যায়িত করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলেছে, ধরনটির স্পাইক প্রোটিনে ৩২ বার রূপ বদল ঘটেছে। সাধারণত ভাইরাসের এ ধরনের বারবার রূপ বদল সেটিকে আরও বেশি সংক্রামক এবং বিপজ্জনক করে তোলে। তবে প্রভাব বুঝতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। কারণ, এটি কতটা সংক্রমণযোগ্য তা নির্ধারণ করতে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। এখন পর্যন্ত ভ্যারিয়েন্টটির ১০০ সিকুয়েন্সের খবর পাওয়া গেছে।
করোনার এ ধরনটির বিরুদ্ধে কোভিড প্রতিরোধী টিকার কার্যকারিতা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। এর মধ্যেই ওমিক্রন মোকাবেলায় শক্তিশালী বুস্টার ডোজ তৈরির ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মডার্না। খুব দ্রুতই এই টিকা প্রস্তুত করতে পারবে বলে আশা করছে কোম্পানিটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা কতটুকু কার্যকর হবে সেটাই দেখার বিষয়। কার্যকর টিকা আসলে বিশ্ব অর্থনীতি আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তবে কত সময় লাগবে তা নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের। যত দ্রুত সম্ভব এর প্রতিশেধক নিয়ে আশা জরুরি।
আনন্দবাজার/শহক








