- দেশের বিভিন্ন স্থানে নিহত ৩
সিলেটে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে সিলেটে ভয়ঙ্কর কালবৈশাখীতে একজনের প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়াও এতে লন্ডভন্ড হয়েছে মানুষের ঘর-বাড়ি, ভেঙে পড়েছে গাছ-পালা এবং বিধ্বস্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টার দিকে ওই কালবৈশাখী হয়।
জানা গেছে, সিলেটে কালবৈশাখী ঝড়ে গাছের নিচে চাপা পড়ে এক পথচারীর মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের একটি টিম গাছ সরিয়ে লাশ উদ্ধার করে। সিলেট-সুনামগঞ্জ বাইপাস সড়কে এ ঘটনা ঘটে। তবে নিহতের পরিচয় এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতে কাজ করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। বিষয়টি বুধবার (২৭ এপ্রিল) বিকেলে জানান জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা খান।
ফায়ার সার্ভিস সিলেটের সিনিয়র স্টেশন অফিসার বেলাল হোসেন বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ে গাছ ভেঙে ওই পথচারীর উপর পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
তিনি বলেন, রাতে সিলেটের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে বিভিন্ন স্থানে গাছ ভেঙে পড়ে। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে সিলেট সদর উপজেলার তেমুখী বাইপাস এলাকায় গাছ ভেঙে পড়ে। এতে সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে গাছ সরাতে গিয়ে চাপা পড়া অবস্থায় এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়।
খবর পেয়ে মহানগর পুলিশের জালালাবাদ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
ওসি নাজমুল জানান, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে গাছ সরানোর পর নিহতের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। লাশটি ওসমানী হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
এদিকে, মধ্যরাতের এ ঘূর্ণিঝড়ে সিলেটের অনেক জায়গায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। কোথাও খুঁটি পড়েছে, কোথাও লাইন ছিড়েছে, আবার কোথাও লাইনের উপর পড়েছে গাছ। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে রাত থেকেই কাজ শুরু করেন সংশ্লিষ্টরা।
পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি : দিনাজপুরের পার্বতীপুরে কালবৈশাখী ঝড়ে খনিজ শিল্পাঞ্চল মধ্যপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র, মুন্সিপাড়া, পলিপাড়া, সুকুরডাঙ্গা, আদিবাসী, শাহপাড়া, মৌলভীডাঙ্গা ও কোটালপাড়াসহ ৭ গ্রামের ৫ শতাধিক কাঁচাপাকা ঘর-বাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। ঝড়ে ভেঙে পড়েছে কাঁচা পাকা ঘর। উড়ে গেছে ঘরের চালা। ঝড়ে বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পরে বিদ্যুৎৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে অসংখ্য হাজার হাজার গাছপালা। এছাড়া ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে ঘরের দেয়াল চাপা পড়ে কুলসুম খাতুন (১৩) নামের ৬ষ্ঠ শ্রেণির এক মাদ্রাসাছাত্রী নিহত হয়েছে। এছাড়া ঝড়ে বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন নারী-শিশুসহ কমপক্ষে অর্ধশত মানুষ। গত মঙ্গলবার রাত সোয়া ৯টার দিকে তারাবির নামাজের সময় উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের উপর দিয়ে প্রচণ্ড বেগে বয়ে যাওয়া ঝড়ে ফসল, আম, লিচু. ভুট্টা, শাক-সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে, আজ বুধবার সকাল ৮ টায় ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো পরিদর্শনে করেন পার্বতীপুর-ফুলবাড়ী এলাকার সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী অ্যাড. মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার ও উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ¦ মোঃ হাফিজুল ইসলাম প্রামানিক। এসময় তিনি তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে মুন্সিপাড়া ও শুকুরডাঙ্গা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে নগদ ৪০ হাজার টাকা ও নিহতের পরিবারকে ১০ হাজার সহয়তা দেন।
মধ্যপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের (আইসি) পুলিশ পরিদর্শক সিরাজুল হক জানান, প্রচন্ড ঝড়ে ফাড়ির ইটের প্রাচীর ভেঙ্গে যায় এবং ঝড়ে ফাড়ির টিন উড়ে যায়।
মুন্সিপাড়া গ্রামের ইব্রাহিম খলিল বলেন- আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়ে এমন ঘুর্নিঝড় জীবনে ও দেখিনি। মাত্র ২ মিনিটের ঝড়ে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। খোলা আকাশের নীচে আমি আমার পরিবার ও গবাদিপশু। কালবৈশাখী ঝড়ে আমার বসত বাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ঘরের দেয়ালের ইট পড়ে তার পরিবারের ৪ জন আহত হয়েছেন।
অপরদিকে, ঝড়ের পরপরই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। রাত ১টায় উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামে ছুটে যান, পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুহাম্মদ ইসমাঈল, সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রীতম সাহা, পার্বতীপুর মডেল থানার (ওসি) ইমাম জাফর, মধ্যপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের (আইসি) পুলিশ পরিদর্শক সিরাজুল হক ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোজাহেদুল ইসলাম সোহাগ। পরে রাত ১টার দিকে নিহত মাদ্রাসা ছাত্রীর বাবার শওকত আলীর হাতে নগদ ২৫ হাজার টাকা তুলে দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুহাম্মদ ইসমাঈল।
হরিরামপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোজাহেদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, ঝড়ে ৫ শতাধিক বাড়ি লন্ডভন্ড হয়েছে। শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত ১০ থেকে ১২ জনকে রংপুর ও ফুলবাড়ী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পার্বতীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ রাকিবুজ্জামান বলেন, ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে ঝড়ে ১৫ হেক্টর আধাপাকা বোরো ধান, ১২ হেক্টর ভুট্টা ক্ষেত, ১৬ হেক্টর আম এবং ৫ হেক্টর লিচুর ক্ষতি হয়েছে।
পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ ইসমাঈল জানান, ঝড়ে এক মাদ্রাসাছাত্রী নিহত হয়েছে। বেশ কিছু গবাদিপশু মারা গেছে। মেডিকেলটিমসহ প্রতিটি বিভাগ কাজ করছে। দুপুরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবন, চিড়া, লুডসসহ ৫০টি পরিবারকে শুকনো খাবার দেয়া হয়েছে। নিহতের পরিবার নগদ ২৫ হাজার নগদ টাকা সহায়তা দিয়েছি। ঝড়ে ঘড়-বাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রাতে সেহরির ব্যবস্থা করেছি। জেলা প্রশাসক ও ত্রাণ অধিদফতরে অবহিত করা হয়েছে।
দিনাজপুর প্রতিনিধি : দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ , খানসামা পার্বতীপুর, উপজেলায় শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে শতশত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এ সময় দেয়ালচাপা পড়ে পার্বতীপুর উপজেলায় এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ের সময় কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়েছে। এসব উপজেলায় আম, লিচু ও ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
দেয়াল চাপা পড়ে নিহত কিশোরী পার্বতীপুর উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের শওকত আলীর মেয়ে উম্মে কুলসুম (১৩) বলে জানা যায়।
স্থানীয়রা জানায়, গতকাল মঙ্গলবার রাতে পার্বতীপুর, নবাবগঞ্জ ও খানসামা উপজেলায় শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়। ঝড়ে ঘরবাড়ি গাছ-পালাসহ আমলিচু ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ সময় ঘুমন্ত অবস্থায় দেয়াল চাপা পড়ে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে।
ঝড়ে মারা যাওয়ার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইসমাঈল ও পার্বতীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমাম জাফর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছেন। তারা দেয়ালচাপা পড়ে কিশোরীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সুুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি: গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে ও শিলাবৃষ্টিতে ঘরবাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে উপজেলার ১৫ ইউনিয়ন ও পৌর সভার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়ার ঘন্টাব্যাপি শিলা বৃষ্টিতে বাড়িঘর গাছপালাসহ কালবৈশাখী ঝড়ো হাওয়ায় পাঁকা ও আধাপাঁকা ইরি ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শিলা বৃষ্টি হওয়ায় পাকাঁ ধান ঝরে পড়ে এবং ধানের গাছ নুয়ে পড়ায় কৃষকের মাথায় যেনো বাজ পড়েছে। এছাড়াও নিচু এলাকার অধিকাংশ ধানক্ষেত আংশিক ডুবে যাওয়াসহ সবজি ক্ষেত, আমের কুড়ি, ভুট্টা ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তারাপুর ইউনিয়নের উত্তর তারাপুরের কৃষক তারেকুল ইসলাম তারেক জানান, আমার জমি ধান মাড়াই করার সময় হয়েছিলো তবে আর আমার ধান মাড়াই করার আগে ধান জমির মধ্যে পড়ে গেছে। এদিকে ঝড়ো হাওয়ায় উপজেলার সোনারায়, তারাপুর, বেলকা, দহবন্দসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ভেঙ্গে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে কাঁচা ঘর বাড়ি। তবে সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
দহবন্দ ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল আলম রেজা জানান, কালবৈশাখী ঝড়ে ও শিলা বৃষ্টিতে তার ইউনিয়নে ইরি ধানক্ষেতের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেয়ার মতো নয়। উপজেলা কৃষি অফিসার রাশেদুল কবির জানান, কালবৈশাখী ঝড়ো হাওয়ায় ও শীলা বৃষ্টিতে ফসলের যে, পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা নিরুপনের জন্য উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন।









