- আনারস পাতাও দেখাচ্ছে সম্ভাবনা
- উৎপাদিত পণ্য রফতানি হচ্ছে বিদেশেও
- হতদরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ
অল্প কিছুদিন আগেও পরিত্যাক্ত কলাগাছ আর আনারস পাতা কোন কাজেই আসতো না। সেই পরিত্যাক্ত কলাগাছ আর আনারস পাতা এখন অপার সম্ভাবনার খাত হয়ে উঠেছে। এগুলো থেকে এখন তৈরি হচ্ছে সৌখিন সব পণ্য। যা বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। এমন হস্তশিল্পের জন্য টাঙ্গাইলের মধুপুরের জাঙ্গালিয়া গ্রামে তৈরি হয়েছে পুরো একটি কারখানা। যেখানে কাজ করছে শতাধিক দরিদ্র নারী। বর্তমানে পুরুষেরাও এ কাজে ঝুঁকছে। হস্তশিল্পের পণ্য তৈরি করে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে পেয়েছেন এখানকার নারী পুরুষেরা।
আনারসের রাজধানী টাঙ্গাইলের মধুপুর। আনারসের পাশাপাশি কলাচাষও হয় এখানকার বনাঞ্চলে। ফল দেওয়ার পর কলাগাছ ও আনারস পাতা ফেলে দেয়া হতো। ফেলে দেয়া কলাগাছ আর আনারসের পাতা দিয়ে তৈরী হচ্ছে এখন নানা রকম সৌখিন পণ্য। শুরুতে কাজটি অনেক কঠিন মনে হলেও এখন আর ওদের কব্জায় চলে এসেছে। পরিবেশ বান্ধব হওয়ায় এসব পণ্য দেশের সীমানা পেরিয়ে চলে যাচ্ছে উন্নত দেশগুলোতে।
২০১৫ সালে সামাজিক সেবা সংগঠন (এনজিও) ব্যুরো বাংলাদেশের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমে এসব পণ্য তৈরি শুরু হয়। পরে ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুরে এ হস্তশিল্পের কারাখানায় রুপ নেয়। পরিত্যাক্ত কলাগাছের বাকল আর আনারসের ফেলে দেয়া পাতা থেকে এখানে গ্রামের দরিদ্র নারীরা তৈরি করছেন টিসু বক্স, ডেক্স অর্গানাইজার, নেট, পর্দা, ফ্লাওয়ার বক্স, ওয়াল হ্যাঙ্গিং, চাবির রিংসহ নানা সৌখিন পণ্য। গ্রামের নারীরদের নিপুন হাতে তৈরি আকর্ষনীয় এসব পণ্য যাচ্ছে চীনসহ উন্নত দেশগুলোতে। এখানে কাজ করা নারীরা হয়ে উঠছে স্বাবলম্বী। আগে যে সব মহিলার বনে-জঙ্গলে কলা ও আনারসের বাগানে কাজ করে যে টাকা আয় করতেন, তার চেয়ে অনেক বেশি আয় করেন এ হস্তশিল্পে কাজ করে।
এসব কর্মীরা কলা গাছ ও আনারসের পাতা থেকে আঁশ বের করে প্রথমে পানিতে ধুয়ে পরিস্কার করে। এরপর ভেজা আঁশ আবার রৌদ্রে শুকায়। কারখানায় নারী কর্মীরা দলবদ্ধভাবে কাজ করে। কেউ রঙ করে, কেউ আঠা লাগিয়ে টিস্যু বক্স, চাবির রিং, ডেক্স অর্গানাইজার, নেট, পর্দা, ফ্লাওয়ার বক্স, আবার কেউ ওয়াল হ্যাঙ্গিংসহ নানা প্রকার পণ্যের কাজ করে থাকে।
ফিরোজ নামের এককর্মী বলেন, আমরা ফেলে দেয়া কলাগাছ ও আনারসের পাতা থেকে এ সুন্দর হস্তশিল্প হতে পারে তা আমরা কখনও জানতাম না। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সব জানতে পেরেছি। মেশিন দিয়ে কলা গাছ ও আনারসের পাতা থেকে আঁশ বের করা হয়। পরে এ আঁশ কর্মীরা টিসু বক্স, ডেক্স অর্গানাইজার, নেট, পর্দা, ফ্লাওয়ার বক্স, ওয়াল হ্যাঙ্গিং, চাবির রিংসহ নানা পণ্য তৈরি করে।
আমিনুর নামের এককর্মী বলেন, আমরা প্রশিক্ষণ শেষে এখানে হস্তশিল্পের কাজ করছি। আমাদের পণ্যগুলো আকর্ষনীয় হওয়ায় ক্রেতাদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তাই কাজের অর্ডার অনেক বেশি। এখানে কাজ করে আমার মতো শতাধিক মানুষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্বাবলম্বী হচ্ছে। তবে করোনার প্রভাবে কাজ কম থাকলেও বর্তমানে স্বাভাবিকভাবে কাজ হচ্ছে।
রুমা নামে এক নারী শ্রমিক বলেন, আমি আগে বনে কাজ করতাম। সেখানে বেশি পরিশ্রমে যে পরিমান টাকা পেতাম তার চেয়ে এখানে কম পরিশ্রম করে অনেক বেশি টাকা পাই।
হোসনে-আরা নামে অপর এক শ্রমিক বলেন, আমরা চাই আমাদের এ হস্তশিল্পগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে যাক ও দেশের বাহিরে রপ্তানি করে বাংলাদেশের সুনাম বয়ে আনুক। শ্রমিক সমেলা বেগম বলেন, ব্যুরো বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শিখেছি। কাজ করতে আমাদের খুব ভালো লাগে। এখানে কাজ করে আমরা যা আয় করি তা অন্য পেশায় পাই না। এটি উপার্জনের অন্যতম একটি মাধ্যম।
প্রশিক্ষক রিমা হাজং গারো বলেন, নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন সৌখিন জিনিসপত্র তৈরী করানো হচ্ছে। এতে করে তারা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। আগে যারা বন, আনারস ও কলা বাগানে কাজ করতো সেসকল নারীরাও আমাদের এখানে কাজ করছেন।
তবে স্থানীয়রা বলছেন, এ প্রকল্পটি শেষ হলে এসব শিল্পীরা বেকার হয়ে পড়বে। যেহেতু এটি একটি পরিবেশ বান্ধব উৎপাদন পণ্য সেহেতু এ হস্তশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
নারী উদ্যোক্তা ও ব্যুরো ক্রাফটের মুখ্য সমন্বয়ক রাহেলা জাকির আনন্দবাজরকে বলেন, এ ফাইবার দিয়ে এতো সুন্দর হস্তশিল্প তৈরী হয় এটা আমাদের জানা ছিলনা। এটা বাজারজাত হতে পারে বা নারীদের কর্মসংস্থান হতে পারে সে বিষয়ও ছিলো কল্পনার বাহিরে। এ হস্তশিল্প মধুপুরে করার কারণ এখানে ক্ষুদ্র ণৃ-গোষ্ঠী বসবাস করে ও পিছিয়ে পড়া দরিদ্র নারীদের কর্ম সংস্থান দেয়া যাবে। এ কারণে মধুপুরে এ প্রকল্প নেয়া হয়েছে। বর্তমানে শতাধিক নারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে হাজার হাজার নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, চায়নাতে একটি মেলায় অংশগ্রহণ করলে বেশ কিছু ওয়ার্ডার পাই। এছাড়াও আরো অনেক দেশই হস্তশিল্পের এ পণ্য গুলো নেয়া আগ্রহ দেখাচ্ছে। অন্যদিকে কলা গাছ ও আনারসের কিছু পাতা আছে যেগুলো দিয়ে আঁশ বানানো সম্ভব নয়। সেগুলো দিয়ে আমরা টিস্যু পেপার বানাতে পারবো। এ ছাড়াও ওয়ান টাইম প্লেট ও গ্লাস বানানোর চিন্তা রয়েছে। পরিত্যাক্ত প্রাকৃতিক কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পরিবেশ বান্ধব এসব পণ্য পঁচনশীল হওয়ায় ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বহিঃবিশ্বে। সঠিক পৃষ্টপোষকতা পেলে বিশ্বে দরবারে আলাদা স্থান করে নেবে টাঙ্গাইলের মধুপুরের পরিবেশ বান্ধব এ সকল পণ্য।
তিনি আরও বলেন, করোনার প্রভাবে গত দেড় বছর উৎপাদন কম করানো হতো। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও রপ্তানী সমস্যায় উৎপাদন কমিয়ে আনা হয়েছিল। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে উৎপাদন কাজ স্বাভাবিকভাবে চলছে। বর্তমানে এর সাথে পাটের আঁশ সংযোগ করা হয়েছে। এটাও পরিবেশ বান্ধব।
আনন্দবাজার/এম.আর









