কারণ জানতে ওরিয়ন ফার্মাকে ডিএসই’র নোটিশ
- বিনিয়োগকারীরাও থেকে যাচ্ছেন অন্ধকারে
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ‘এ’ ক্যাটাগরির ওরিয়ন ফার্মার শেয়ার দর পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে। কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়ে কোথায় যাবে, নেই তার কোনো ধারণা। শেয়ারটির অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি ইতোমধ্যে সবাইকে চিন্তায় ফেলেছে। শেয়ারটির দর কেন বাড়ছে ব্যাখ্যা নেই কোম্পানিটির কর্তৃপক্ষের কাছে।
এদিকে শেয়ার দর ধারাবাহিকভাবে বাড়ার কারণে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে কোম্পানিটিকে (ওরিয়ন ফার্মা) নোটিশ পাঠিয়েছিল। নোটিশের জবাবে কোম্পানি গত ৮ সেপ্টেম্বর ডিএসইকে জানায়, শেয়ার দর এভাবে বাড়ার পেছনে কোনো কারণ নেই। কোনো রকম অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই তাদের শেয়ার দর এভাবে বাড়ছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ১২৫ দশমিক ৯০ টাকা। ডিএসসইর নোটিশের পরও শেয়ারটি দর থেমে থাকেনি। বরং দ্রুত গতিতে আরো বেড়েছে। বর্তমানে শেয়ারটির দর দাঁড়িয়েছে ১৪১ দশমিক ২০ টাকায়।
গত দুই মাসে বা ৪১ কার্যদিবসে ওরিয়ন ফার্মার মোট শেয়ারের মাধ্যমে বাজার মূল্যে বেড়েছে ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। অপরদিকে এই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের মাধ্যমে বাজার মূল্যে বেড়েছে ৯৭৭ কোটি টাকা। বৃদ্ধির প্রসঙ্গে মতিঝিলের একাধিক সিকিউরিটিজ হাউজের ১২ বিনিয়োগকারী বলছেন, ওরিয়ন ফার্মার শেয়ার দর সামনে আরো বাড়বে। কেন বাড়বে, সেটা বলতে পারছেন না। তাদের ওইসব কথা শুনে অনেকেই অতি উচ্চ দরে শেয়ারটি কিনছে। যদিও ওইসব কথা ভিত্তিহীন বলে মনে করছে পুঁজিবাজার বোদ্ধারা।
২০১০ সালের ধসের পর গত ১২ বছরের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েই শেয়ার দর আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে এমন কোম্পানি ভুরি ভুরি। সময়ের পালাক্রমে সেই কোম্পানিগুলোর শেয়ার শুকিয়েও গেছে, এমন চিত্র অনেক। পুঁজি নিরাপত্তা স্বার্থে বিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা সব সময় বলে আসছে বুঝে, শুনে ও বিশ্লেষণে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করতে। পাশাপাশি পুঁজিবাজার বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে পযাপ্ত পরিমাণে জ্ঞান রাখতে। কিন্তু কে শুনে কার কথা। অতি লোভে পড়ে অর্থ হারানোর গর্তে পা দিচ্ছেন অবুঝ বিনিয়োগকারী বলে জানান পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।
ফাঁদ দিয়ে দুষ্টচক্র হাতিয়ে নিচ্ছে নিরীহ বিনিয়োগকারীদের অর্থ জানিয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলেন, অর্থ হাতিয়ে নেবার দুষ্টচক্রের হাত খুব লম্বা। রেগুলেটর থেকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী পর্যন্ত তাদের লোকজন সাজানো রয়েছে। যেকোনো শেয়ার নিয়ে তারা খেলতে পারেন। খুব সহজেই নিরীহদের বোকা বানিয়ে চক্রটি কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে থাকে। চক্রটি এতো ধূর্ত যে, কোনো আইনে তাদের ধরা সম্ভব হয় না। কোনো কারণে ধরা পড়লেও সামান্য সাজায় মাফ পেয়ে যায়। এসব কারণে পুঁজিবাজারে পতন লেগেই থাকে।
গত দুই মাসে পুঁজিবাজারে লেনদেন করে ওরিয়ন ফার্মার শেয়ার ৭৮ দশমিক ৭০ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ১৪১ দশমিক ২০ টাকায় চলে এসেছে। শেয়ারটির দর আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে। কারণবিহীন শেয়ারটির দর ৪১ কার্যদিবসে বেড়েছে ৬২ দশমিক ৫০ টাকা। এসময় শেয়ারটির বাজার মূলধন বেড়েছে ১ হাজার ৪৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। শেয়ার দরের এ ধরনের বৃদ্ধি নিয়ে কোম্পানির শেয়ার ধারন করা বিনিয়োগকারীদের মাঝে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যা এই কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ ক্ষেত্রে সুখবর নয়। অপরদিক এ কোম্পানির শেয়ার দর কেন এতো বাড়ছে, তার প্রকৃত কারণ জানে না ধারন করা বিনিয়োগকারীরা।
বৃদ্ধির প্রসঙ্গে ওরিয়ন ফার্মার সচিব ফেরদৌস জামানকে মুঠোফোনে কল করলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, শেয়ার দর বাড়ার মতো কোনো মূল্য সংবেদনশীন তথ্য নেই। যা ছিল তা ডিএসইকে জানিয়েছে। এর বাইরে বলার কিছু নেই। কেন এতো দরে শেয়ারটি কিনছে, সেটা কেবল বিনিয়োগকারীরাই বলতে পারবে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, পুঁজিবাজারে আমাদের (ওরিয়ন ফার্মা) কেউ (পরিচালক) শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করে না।শেয়ার দর বাড়া কমা নিয়ে আমাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই। কোম্পানিটিটির পরিচালকরা খুবই স্বচ্ছ। এসব কাজ করবে না।
এদিকে শেয়ার দর ধারাবাহিকভাবে বাড়ার কারণে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক কর্মকর্তা বলেন, ওরিয়ন ফার্মার শেয়ার দর নিয়ে কাজ করছি। দর বাড়ার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অতি দরের ব্যাপারে প্রয়োজনে কোম্পানিটিকে ফের নোটিশ পাঠাবো। প্রয়োজনে জরুরি ব্যবস্থা নিবো। শেয়ার দর বৃদ্ধির একই বিযয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, পুঁজিবাজারের কোনো কোম্পানির শেয়ার দর বাড়লো বা কমলো, সেটা আমাদের বিবেচ্য নয়। আমরা দেখি শেয়ার দর বাড়া বা কমার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা। সেই হিসেবে ওরিয়ন ফার্মা শেয়ার দর বাড়ার বিযয়টি আমাদের নজরে রয়েছে।
বৃদ্ধি পাওয়া অনেক কোম্পানি আমাদের নজরে রয়েছে জানিয়ে রেজাউল করিম বলেন, আমরা খতিয়ে দেখছি, ওরিয়ন ফার্মাসহ আরো অনেক কোম্পানির শেয়ার দর বাড়ার পেছনে কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা। শেয়ারগুলোর দর বাড়ানো ক্ষেত্রে অনিয়ম পাওয়া গেলে, কেবল সেই ক্ষেত্রে কোম্পানির বা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই মাস ধরে ওরিয়ন ফার্মার শেয়ার দর শুধুই বাড়ছে। শেয়ার দর বেড়ে ১৪১ টাকার ওপরে চলে এসেছে। কোনো কারণ বা কোনো পরিকল্পনায় শেয়ার দর এভাবে বেড়েছে তার কারণ জানা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। নিয়ম অনুসারে কোম্পানির কর্মকর্তারা শেয়ার দর বাড়া-কমার পেছনে কাজ করে না জানিয়ে তারা বলছেন, এটা আমরা জানি। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোম্পানির শেয়ার দর বাড়া-কমার তাদের (কর্মকর্তা) অদৃশ্য ছোঁয়া থাকে। তাদের ছোঁয়া ছাড়া কোনো কোম্পানির শেয়ার দর লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যায় না। কারণ তারাই জানেন কোম্পানির মূল্য সংবেদনশীল তথ্য। যেসব তথ্য শেয়ার বাড়া-কমার ক্ষেত্রে জাদুকরি ভূমিকা রাখে। তাই শেয়ার দর বাড়ার জাদুকরি ওরিয়ন ফার্মার প্রতি বিশেষ নজর দিতে অনুরোধ জানান পুঁজিবাজার রেগুরেটরকে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার ওরিয়ন ফার্মার শেয়ার দর দাঁড়ায় ১৪১ দশমিক ২০ টাকা। এর আগে ২৮ জুলাই কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ৭৮ দশমিক ৭০ লাখ টাকা। গত ৪১ কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ৬২ দশমিক ৫০ টাকা। কোম্পানিটির শেয়ার সংখ্যা ২৩ কোটি ৪০ লাখ। সেই হিসাবে গতকাল কোম্পানিটির মোট শেয়ারের বাজার মূল্যে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩০৪ কোটি ৮ লাখ টাকা। গত ২৮ জুলাই শেয়ারের বাজার মূল্যে ছিল ১ হাজার ৮৪১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এই সময়ের ব্যবধানে কোম্পানিটির মোট শেয়ারের বাজার মূল্যে বেড়েছে ১ হাজার ৪৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
ওরিয়ন ফার্মার মোট শেয়ারের মধ্যে ৩৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ ধারন করেছে সাধারণ বিনিয়োগকারী। ২৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ ধারন করেছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। সেই হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের বাজার মূল্যে বেড়েছে ৯৭৭ কোটি ২৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এ ধরনের বৃদ্ধি কোনো মতে মানতে রাজি নন বিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা। তাই শেয়ার দর কমার কারণ জানার জন্য সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।
ডিএসইর সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওরিয়ন ফার্মার ২০২০-২০২১ (জুলাই টু জুন) সমাপ্ত অর্থবছরে হিসেবে শেয়ার প্রতি সম্পদ (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছিল ৭৯ দশমিক ৭৬ টাকায়। ওইসময় কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদে ৮৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদে ১ হাজার ৫৯২ কোটি ৯৫ লাখ টাকার লোন রয়েছিল। বর্তমানে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ২৩৪ কোটি টাকা এবং রিজার্ভ ৮৩১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। শেয়ার সংখ্যা ২৩ কোটি ৪০ লাখ। কোম্পানিটি মোট শেয়ারের ৩১ দশমিক ৯৮ শতাংশ উদ্যোক্তা পরিচালক একাই ধারন করেছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ২৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ, বিদেশি ১ দশমিক ২০ শতাংশ ও সাধারন বিনিয়োগকারী ৩৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ শেয়ার ধারন করেছে।









