বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির ভয়াবহতা যখন অনেকটা নিয়ন্ত্রিত, ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতি ঠিক তখনই নতুন করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে হাজির নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন। বলা যায়, দেশে দেশে আছড়ে পড়ছে এর ঢেউ। বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রমণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানও শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আর বিজ্ঞানীরাও নানা সতর্কবাণী দিচ্ছেন।
বিদায়ী বছরের ২৪ নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো ওমিক্রনে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এরপর ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের ৩০টি দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন বছরের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত ধরা হলে তা শতকের ঘর ছাড়িয়েছে। তবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া করোনার নতুন এ ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে একবারে ঠিকঠাক কোনো তথ্য মিলছে না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাই একেক সময় একেক কথা বলছেন। এমনকি এ তালিকায় রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডাব্লিউএইচও)।
ডাব্লিউএইচও মহাপরিচালক তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস গত ৫ জানুয়ারি বলেছিলেন, চলতি বছরের জুলাইয়ের মধ্যে প্রতিটি দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে সব দেশকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। আর এটা করতে পারলে বর্তমান করোনা মহামারি অবসানের (শেষ) দিকে যেতে পারবে বিশ্ব। অর্থাৎ মহামারির অবসান ঘটাতে পারে টিকা বণ্টনের ক্ষেত্রে সমতার মাধ্যমে। তবে তার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করেছেন সংস্থাটির ইউরোপ অঞ্চলের পরিচালক হ্যানস ক্লুগ।
ডাব্লিউএইচও’র ইউরোপ অঞ্চলের পরিচালক বললেন, পশ্চিম থেকে পূর্বে ইউরোপে জলোচ্ছ্বাসের মতো ওমিক্রন ছড়াচ্ছে। আগামী ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে ইউরোপের অর্ধেক মানুষ ওমিক্রনে সংক্রমিত হতে পারে। সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে ডেল্টাকে ছাড়িয়ে গেছে ওমিক্রন। ২০২২ সালের প্রথম সপ্তাহে ইউরোপজুড়ে ৭০ লাখ মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছে। ইউরোপে দুই সপ্তাহের মধ্যে করোনা সংক্রমণ দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের পূর্বাভাস উদ্ধৃত করে হ্যানস ক্লুগ বলেন, ইউরোপের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি আগামী ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে ওমিক্রনে সংক্রমিত হবে। তিনি স্বীকার করেন, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে থাকায় ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছে। পূর্ণ ডোজ টিকা নেওয়া ব্যক্তিরাও ওমিক্রনে সংক্রমিত হতে পারেন। তবে ওমিক্রনে সংক্রমিত মানুষ গুরুতর অসুস্থ হন কম।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্স (আইসিএমআর) এর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এপিডেমিওলজিস্টের সায়েন্টিফিক অ্যাডভাইসরি কমিটির চেয়ারম্যান ড. জয়প্রকাশ মুলীয়িল ১১ জানুয়ারি বলেছেন, ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট প্রায় অপ্রতিরোধ্য। শেষপর্যন্ত সবাই এতে আক্রান্ত হবে। এমনকি কোভিড-১৯ টিকার বুস্টার ডোজও এর ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পারবে না। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সেটিই হচ্ছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যর্থ হচ্ছে বুস্টার ডোজ।
এর আগে গত ৫ জানুয়ারি ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের (আইএইচএমই) অধিকর্তা চিকিৎসক ক্রিস্টোফার মারে সর্বভারতীয় সাংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ডেল্টার প্রভাবে যেভাবে গোটা ভারতজুড়ে সংক্রমণ বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছেছিল, ওমিক্রনের কারণে একই রকম ছবি দেখা যেতে পারে। আগামী দুই মাসের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে ৩০০ কোটি মানুষ ওমিক্রনে আক্রান্ত হবে। তবে ড. জয়প্রকাশের ভিন্ন সুর হচ্ছে, করোনা আর ভয়ংকর কোনো রোগ নয়। কারণ এর নতুন ভ্যারিয়েন্টে সংক্রমণের গুরুতর আকার ধারণ করার সম্ভাবনা অনেক কম। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংখ্যাও অনেক কম।
এদিকে, ফাইজারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলবার্ট বোরলা বলেছেন, ওমিক্রনের টিকা আগামী মার্চে প্রস্তুত হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার এ টিকা নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। টিকা তৈরির কাজ চলছে।
টিকার কার্যকারিতার বিষয়ে সিএনবিসিকে তিনি বলেন, করোনার বর্তমান টিকার যে দুই ডোজ এবং বুস্টার ডোজ ওমিক্রনে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে ভালো সুরক্ষা দিয়ে থাকে। একই বিষয়ে বায়োএনটেকের সিইও স্টিফানে ব্যানসেল বলেন, ওমিক্রনের বিষয়টি বিবেচনা করে তারা একটি বুস্টার ডোজ তৈরির কাজ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউসি বলেছেন, দেশটিতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ওমিক্রনের সংস্পর্শে আসতে পারেন সবাই। ফাউসি ১১ জানুয়ারি বলেন, ওমিক্রন পরিস্থিতি নিয়ে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিসের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে স্টিফেন মরিসনের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। মরিসন বলেন, ওমিক্রনের সংক্রমণক্ষমতা অস্বাভাবিক। শেষমেশ হয়তো এটি সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। বুস্টার ডোজ নেয়ারাও এর সংস্পর্শে আসতে পারেন, আক্রান্ত হতে পারেন। তবে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া টিকা নেওয়া যারা আক্রান্ত হবেন, তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া কিংবা মারা যাওয়ার আশঙ্কা কম। যারা টিকা নেননি, তাদের এতে ভুগতে হতে পারে বলেন ফাউসি।
২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বর চীনের উহান রাজ্যে করোনাভাইরাসটির উৎস হলেও খুব অল্প সময়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে। ২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয়ে ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালের শেষের দিকে যখন এই ভাইরাসটি প্রথম চিহ্নিত হয়ে এটির হাজার হাজার মিউটেশন হয়েছে। মিউটেশনের মাধ্যমে এভাবে যে পরিবর্তিত ভাইরাস তৈরি হয়, তাকে বলা হয় ভ্যারিয়েন্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বেশিরভাগ মিউটেশনের ফলে ভাইরাসটির মূল গঠনের ওপর খুব কম বা একেবারে কোনো প্রভাবই আসলে পড়ে না। সময়ের সঙ্গে এটি বিলুপ্তও হয়ে যায়। কিন্তু কোন কোন মিউটেশন এমনভাবে ঘটে, যা ভাইরাসটিকে টিকে থাকতে এবং বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
আনন্দবাজার/শহক









