চায়ের আরেক সাম্রাজ্য গড়ে উঠছে দেশের চায়ের রাজ্যখ্যাত পঞ্চগড়ের প্রতিবেশী জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে। অপার সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে জেলার সীমান্ত ঘেঁষে গড়ে উঠা দিগন্তবিস্তৃত চা-বাগানে। তবে শুধু সীমান্তেই নয় চা চাষ ছড়িয়ে পড়েছে জেলার প্রতিটি উপজেলার গ্রামে গ্রামে। জেলার চাষিরা ছোট-বড় অসংখ্য চা-বাগান গড়ে তুলছেন সমতলভূমিতেই। উত্তরজনপদে সর্বপ্রথম চায়ের জেলা হিসেবে খ্যাতি পায় পঞ্চগড়। এরপর ধীরে ধীরে তা বিস্তার হতে থাকে অন্যান্য জেলাতেও। পঞ্চগড়ের পর ২০০৭ সাল থেকেই ঠাকুরগাঁওয়ে অসংখ্য চায়ের বাগান গড়ে উঠেছে।
জেলার প্রতিটি বাড়ির পেছনে, আশেপাশে রাস্তার ধারে আনাচে-কানাচে উঁচু-নিচু জমি এমনকি সীমান্ত ঘেঁষা নদীর এপার ওপারও এখন চা গাছের সবুজ রংয়ের সমারোহে ভরপুর। এতে চা চাষ ও চা ঘিরে শিল্প-কারখানার স্বপ্ন দেখছেন জেলার চাষিরা। একসময় যেসব জমিতে আগাছা ছাড়া কোনো ফসল হতো না সেসব জমি এখন চায়ের সবুজে ভরে উঠেছে। নদীর ধারে যে জমিতে শুধু গোচারণ করা হতো সেই দিগন্তবিস্তৃত জমিও চা গাছের সবুজের লীলাভূমিতে ভরপুর। বসতবাড়ির আশপাশসহ পতিত জমিতেও এখন ছোট ছোট চা-বাগান গড়ে তুলেছেন চাষিরা।
জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় দিগন্তবিস্তৃত চা-বাগান ছাড়াও যেখানে সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই চায়ের গাছ লাগিয়েছেন চাষিরা। অন্যান্য ফসলের তুলনায় চাষিরা চাচাষে লাভবান হওয়ায় দিন দিন ঠাকুরগাঁওয়ে চায়ের চাষ ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চা অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে জেলায়। আর এসব বাগানে কাজ করে স্থানীয় অনেক বেকার মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে।
১৯৯৯ সালে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে জরিপ চালায় বাংলাদেশ চা বোর্ড এবং চা গবেষণা ইনস্টিটিউট। ২০০০ সালের দিকে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়। পরে ২০০৭ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় প্রথম চা চাষ শুরু হলেও এখন জেলার প্রতিটি উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামে চাষ হচ্ছে চা।
জেলা কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় মোট ২৪১ দশমিক ৭১ হেক্টর জমিতে চায়ের বাগান করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৫৭ দশমিক ৭২ হেক্টর জমিতে ছোট বড় মিলে ৯৩টি চা বাগান রয়েছে। পীরগঞ্জ উপজেলায় দশমিক ৩৯ হেক্টর জমিতে একটি, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় ১৭৯ হেক্টর জমিতে ছোট বড় মোট ১০০টি, রাণীশংকৈল উপজেলায় এক হেক্টর জমিতে চারটি ও হরিপুর উপজেলায় ৩ দশমিক ৬ হেক্টর জমিতে তিনটি চা বাগান রয়েছে।
দেখা যায়, সব থেকে বেশি চা চাষ করা হয়েছে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায়। এ উপজেলায় ১৭৯ হেক্টর জমিতে চা চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে রনবাগ ও বেউরঝাড়ী সীমান্ত ফাঁড়ির কাছে অবস্থিত দুমুখা এবং কলশির মুখে ইসলাম টি এস্টেট নামে মোট তিনটি বাগানে ১৩৩ একর জমিতে চা চাষ করেছেন ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলাম। তার এসব বাগানে প্রায় শতাধিক মানুষ কাজ করে জীবিকানির্বাহ করছেন। ইসলাম টি এস্টেট নামে সাংসদ দবিরুল ইসলামের তিনটি বাগান তিন বছরের জন্য লিজ নিয়েছেন পঞ্চগড়ের সাজেদা রফিক টি ফ্যাক্টরির মালিক জাহিদুল হক চেয়ারম্যান।
সাজেদা রফিক টি ফ্যাক্টরির লিজ নেওয়া ইসলাম টি এস্টেট চা বাগানের ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন এ কে এম শামসুজ্জামান (বাবলু)। তিনি বলেন, দবিরুল এমপি সাহেবের লিজ নেওয়া ৩টি বাগান থেকে গত বছর ১৫ লাখ কেজি চা পাতা সংগ্রহ করা হয়েছে। এবার এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ কেজি পাতা সংগ্রহ করেছি । আশা করছি পুরো বছরে এবারও ১৫ লাখ কেজি পাতা সংগ্রহ হবে। আর এ বাগানের চা পাতা গুলো সংগ্রহ করে গাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় পঞ্চগড়ের সাজেদা রফিক টি ফ্যাক্টরিতে।
বাগানের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে নাগর নদী। নদীর এপারে বেউরঝাড়ী সীমান্ত ফাঁড়ি অর্থাৎ বিজিবি ক্যাম্প ওইপারে ভরতের তারকাঁটার বেড়া ও ভারতের বিএসএফের ক্যাম্প। আর নদীর এপারে চা বাগান। এ বাগানে ১১ বছর ধরে কাজ করছেন সুবল চন্দ্রপাল। সকাল বেলা বেউরঝাড়ির দুমুখা বাগানের আগছা পরিষ্কার করার জন্য চা বাগানে স্প্রে করছিলেন তিনি। এসময় তার কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘আগে কাজ পাইতাম না। সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। গত ১১ বছর ধরে এখানে কাজ করছি। এখনে কাজ করে যা পাই তা দিয়ে মোটামুটি সংসার ভালোই চলে। বাগানে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কাজ করে ২৪০ টাকা পাই। পরে আবার ওভার টাইম করলে বা চা পাতা কাটলে কোনো দিন ৫০০ টাকাও দিন হাজিরা পাই।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বেউরঝাড়ী গ্রামের কৃষক কলিম উদ্দিন দেড় বছর আগে বাড়ির পেছনে ৬ বিঘা জমিতে করেছেন চা বাগান। এবার চাপাতার কেজি ১৪-১৫ টাকা দামে বিক্রি করলেও ৬ বিঘা জমির এক রাইন্ড চা পাতা বিক্রয় করেছেন ২৩ হজার টাকা। তবে তার অভিযোগ সিন্ডিকেটের কারণে চা চাষিরা চা পাতার ন্যায্য মূল পাচ্ছে না ও প্রতি ১০০ কেজি চা পাতায় ২০ কেজি পাতা বেশি দেওয়া লাগে।
বালিয়াডাঙ্গী সীমান্তের নিটোলডোবা গ্রামে গ্রিন ফিল্ড টি এস্টেট ২০০৭ সালে ৬০ একর জমিতে চা চাষ শুরু করে। পরে ২০১৭ সালে উপজেলার শাহবাজপুরে ‘গ্রিন ফিল্ড টি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ নামে একটি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তোলেন ফয়জুল ইসলাম (হিরু)।
নিটোলডোবায় দেখা যায়, নাগর নদীর এপারে ও ওপারে দুই পাশেই চায়ের গাছ। এ যেন প্রকৃতিতে কেউ সবুজের গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে। সবুজের এ গালিচা আর অন্য কিছু নয়, দিগন্তবিস্তৃত চায়ের বাগান। দিগন্তবিস্তৃত চায়ের বাগান সবুজ রংয়ে পরিবেশকে করছে নয়নাভিরাম।
বাগান ঘেঁষেই ভারতের সীমানা ৩৯২ নাম্বার পিলার। পিলারের পরেও রয়েছে ভারতের চা বাগান। চা গাছের সবুজ রংয়ে ছেড়ে গেয়ে বিস্তীর্ণ মাঠ। বর্ষা মৌসুমে এখানে নদী পার হতে হয় নৌকা দিয়ে। নদীর ওপারে বিশাল চা বাগানের পাতা আনা হয় নৌকায়। আর এবাগানে নারী-পুরুষ মিলে কাজ করেন অন্তত ৯৫ জন।
গ্রিন ফিল্ড টি এস্টেট বাগানের গাছ থেকে চাপাতা তুলছিলেন, বেদেনা, হাসেনাসহ আরও ৩-৪ জন নারী। তারা বলেন, ‘এখানে সকাল ৮ থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কাজ করে ১০০ টাকা হাজিরা পাওয়া যায়। ১টার পর থেকে আজ করলে ওভারটাইম হিসেবে আরো বেশি টাকা পাই। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় এদিকে তেমন কাজ পাওয়া যায় না। তাই বাড়িতে বসে না থেকে বাগানে কাজ করি।
গত ৯ বছর ধরে গ্রিন ফিল্ড টি এস্টেট চা বাগানের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন তাজমুল হক। তিনি বলেন, ‘গতবছর এ বাগান থেকে ৫ লাখ কেজির উর্ধ্বে চা পাতা সংগ্রহ করেছি। গতবছরের তুলনায় এবার আরও বেশি পরিমাণ চা পাতা সংগ্রহ করতে পারবো বলে আশা করছি। এছাড়াও এলাকায় দিন দিন নতুন নতুন চা চাষির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি হচ্ছে ঠাকুরগাঁও।
তাজমুল হক আরও বলেন, ‘প্রতিবছর নদী ভাঙনের ফলে চা বাগান নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। নদী ভাঙন রোধে সরকার যদি কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতো তাহলে আমাদের কোম্পানি ও এখানে যারা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে তাদের জন্য ভালো হতো। কারণ এখানে চা বাগান আছে বলেও অনেকে কাজ করতে পারছেন। আর যদি এইভাবে দিন দিন নদীভাঙনে ফলে বাগান বিলীন হয়ে যায় তাহলে এখানে যারা কাজ করেছেন তারাও বেকার হয়ে যাবে।
উপজেলার ধনতলা ইউনিয়নের যুবক মোস্তাফিজুর রহমান। ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ে অর্নাস পাস করে বসে না থেকে বাড়িতে শুরু করেছেন কৃষি কাজ। অন্যান্য ফসল চাষাবাদের পাশাপাশি পতিত ৩৩ শতক জমিতে করেছেন চা বাগান। তিনি বলেন, এলাকার অনেক মানুষ চা বাগান করে দিন দিন অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই আমিও পরীক্ষামূলকভাবে ৩৩ শতক জমিতে চাষ শুরু করেছি। ফলন ও দাম পেলে আরও বেশি জমিতে চাষ করবো। সরকার যদি এ জেলায় চা বোর্ড ও চা প্রক্রিয়াকরণের জন্য কারখানা করেন তাহলে চায়ের জন্য বিখ্যাত ও সমৃদ্ধ হবে ঠাকুরগাঁও।
ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাড. জাহিদ ইকবাল। তেঁতুলিয়ায় তার একসহকর্মীকে চা চাষ করতে দেখে তিনিও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ি শাহবাজপুরে ২০১৮ সালে ৩ একর জমিতে টিভি-২৬ জাতের চা চাষ শুরু করছেন। সেই বাগন থেকে এপর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার কেজি চা পাতা উত্তোলন করেছেন তিনি। দামও পেয়েছেন ভালো। তিনি বলেন, ‘জেলায় চা চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি সরকারিভাবে চাষীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও জেলায় চা বোর্ডের অফিস করা হয় এবং চা পাতার দাম নিয়ন্ত্রণে কমিটি গঠন করা হলে এ জেলায় বিশ্ব ও উন্নতমানের চা উৎপাদন করা সম্ভব।
অ্যাড. জাহিদ ইকবাল আরও বলেন, গত বছরের অক্টোবর মাস থেকে এপর্যন্ত চা পাতার দাম কমে যাওয়ায় চা চাষিদের অবস্থা বেশি ভালো না। বাজারে চা কিনতে গেলে দাম বেশি আর চা পাতা বিক্রয় করতে গেলে দাম কম। এখানে একটি সিনডিকেট কাজ করছে। সিনডিকেট রোধে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
সদর উপজেলার ক্ষুদ্র চা-চাষি মেহেদি আহসান উল্লাহ জানান, ‘সরকারি উদ্যোগে কারখানা স্থাপন এবং চা চাষে ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা নিলে এ এলাকায় চায়ের চাষ আরও প্রসারিত হবে।
অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার আশায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ছোট ছোট বাগান গড়ে তোলেছেন অসংখ্য চাষি। যেমন পীরগঞ্জ উপজেলার বৈরচুনা গ্রামে ৬৬ শতক জমিতে চা বাগান করেছেন শাহিনুর রহমান, রাণীশংকৈল উপজেলার ইশ্বর চন্দ্র, সফিকুল ইসলাম, খালেক, আলমগীর। হরিপুর উপজেলার তোফাজ্জল হোসেন, শওকত আলী, আবু তাহের এই ৩ জন চাষী ৩ দশমিক ৬ হেক্টর জমিতে করেছেন চায়ের বাগান। এছাড়াও সদর উপজেলার ৮৫ জন ৫৭ দশমিক ৭২ হেক্টর জমিতে ৯৩টি বাগান করেছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবু হোসেন বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের ভৌগলিক ও ভূমির অবস্থান ভালো। এখানকার মাটি যেমন অন্যান্য ফসলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী তেমনি চায়ের জন্যেও খুব উপযোগী। তবে যে জমিগুলো বেশি উর্বর ও অন্যান্য ফসল ভালো ফলে সেই জমিগুলো বাদ দিয়ে যদি নদী অববাহিকা ও যেগুলো জমিতে অন্যান্য ফসল ভালো হয় না সেগুলো জমিতে চা চাষ করা হয় তাহলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হবেন। তাছাড়াও চা বোর্ড যদি চা চাষীদের সার্বিক সুযোগ সুবিধা, বাজার জাতকরণসহ অন্যান্য বিষয়গুলো নিশ্চিত করে তাহলে এ জেলায় চা হবে অত্যন্ত অর্থকারী ফসল।
চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা মালিকদের সঙ্গে চাষিদের সমন্বয় করে চা চাষ করার পরামর্শের কথা জানিয়ে কৃষিবিদ আবু হোসেন বলেন, ‘কৃষকরা যাতে চা পাতা যথাযথ মূল্যে বিক্রয় করতে পারেন সেটি চা বোর্ডকে নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে কৃষকরা লাভবান হবেন। কৃষি বিভাগ থেকে চা গাছের পরিচর্যা, সার ও বালাইনাশক ব্যবহারে সার্বিক পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।
ঠাকুরগাঁওয়ে চা শিল্পের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল বলে জানান জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, জেলায় চা বোর্ডের অফিস স্থাপনের জন্য জেলা প্রশাসক হিসেবে আমি একটি আবেদন করেছিলাম। এখনি এই জেলায় চা বোর্ড স্থাপন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। তবে কেউ যদি ব্যক্তি মালিকানায় চা ফ্যাক্টরি করতে চায় তাহলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সহযোগিতা করা হবে।
আনন্দবাজার/শহক









