- দুশ্চিন্তায় রাঙ্গাবালীর চাষিরা
- অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার
- প্রাকৃতিক পরাগায়নে বাধা
গাছের কচি পাতা কুকরে যাওয়ায় (জাব পোকা, থ্রিপস জাতীয় শোষক পোকা মাকড়), বালাইনাশ হিসেবে টিডো/এডমায়ার/ইমিটাফ/কনফিডর এর যেকোন একটির সাথে টক্সিমাইট/ভার্টিমেক/লিকার/সানমেকটিন এর যেকোন একটি মাকড়নাশক বোতলে বা প্যাকেটে নির্দেশিত মাত্রায় প্রথম দিন স্প্রে করার পর দ্বিতীয় দিন সাকসেস অনুমোদিত মাত্রায় স্প্রে করতে হবে। লাল মাকড় দমনে টক্সিমাইট/ভাটিমেক/লিকার/সানমেকটিন বোতলে বা প্যাকেটে নির্দেশিত মাত্রায় পরপর সাতদিন স্প্রে করা। পাতা সুরঙ্গ পোকা দমনে ডেসিস ২.৫ ইসি অথবা বিটাফস ৬০ইসি বোতলের নির্দেশিত মাত্রায় সাতদিন পরপর দুইবার স্প্রে করা এবং গাছের কাণ্ড ও ফল ফেটে যাওয়া এবং গাছের মাথা দাড়িয়ে যাওয়ায় বোরন প্রতি লিটারে দুই গ্রাম হারে ও সানভিট অথবা ব্লিটক্স প্রতি লিটারে ৫ গ্রাম হারে স্প্রে করতে হবে। কুলুমাস/সালফক্সবা থিয়োভিট প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে
‘সাড়ে দশ একর জমিতে তরমুজ দিছি। প্রথম যেই সময় আটি (বীজ) লাগাইছি। আটি লাগানের পর যহন চাইর (চার) পাতা- পাঁচ পাতা ছাড়ছে হেই (সেই) সময় এ রোগ ঢোহে (ঢোকা) নাই। যখন রিং দিছি, বেড বানছি। গাছে কড়া (ফল) আইছে। কড়া আওয়ার পরই গাছ দেহি কোকড়া ভাজ হইয়া উপর দিকে উইঠটা (উঠছে) গ্যাছে। গাছগুলা মইরা যাইতে আছে। য্যাতো (যত) ঔষধ বড়ি দেই কোন কাজ হয় না। ফল পরে ফল টেকে না, ফাইট্টা যায়। তয় ফল আর পামু কই গাছ বাচাইতেই দায়।’ কথাগুলো বলছেন পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরইমারশন এলাকার তরমুজ চাষি বেল্লাল প্যাদা।
চৈত্রের খাঁ খাঁ রৌদ্দুর আর প্রচণ্ড তাপদাহ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তরমুজের চারা গাছে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন তিনি। আধমরা চারাগুলো যদি একবার সতেজ হয়ে ওঠে এমন আশা নিয়েই শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। চলতি মৌসুমে সাড়ে ১০ একর জমিতে তরমুজ আবাদ করেছেন। তবে অজানা কোনো এক রোগে আক্রান্ত তরমুজ চারাগুলোর কচি পাতা কুকরে গাছগুলো মরে যাচ্ছে। তাই মলিন মুখেই মাথায় দুশ্চিন্তা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন বেল্লাল প্যাদা।
শুধু বেল্লাল প্যাদাই নয়, উপজেলার চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড গোলবুনিয়া এলাকার তরমুজ চাষি শাহিন মুন্সি বলেন, আমি ১২ একর জমিতে সাড়ে ৯ লাখ টাকা খরচ করে তরমুজ চাষাবাদ করেছি। মৌসুমের শুরুতে অকাল বৃষ্টিতে ক্ষেতে পানি জমে চারাগাছ মারা গেছে। পরের আবার নতুন করে গাছ লাগাইছি এখন যখন গাছগুলো বড় হয়েছে কিছু গাছে ফল আসছে তখনি দেখা দিল ভাইরাস। গাছগুলা মনে হয় পুড়ে যাচ্ছে। লোকজনের বেতন, সার-কিটনাশক ব্যবহারের টাকাসহ অন্যান্য খরচ দিয়া লাভের আশা ছেড়েই দিয়েছি।
একই কথা জানান, উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের সাজির হাওলা গ্রামের আরেক চাষি জাহাঙ্গীর হাওলাদার। তিনি বলেন, বছরের শুরুতে অকাল বৃষ্টিতে গাছের চারা মরে গিয়ে আমাদের অনেক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তারপরেও ফের ধারদেনা করে প্রজেক্ট নতুন করে শুরু করি। এবার ভাইরাসে গাছের চারাগুলো মরে যাচ্ছে। চরের লোকজনের মোটামুটি আছে দ্যাশ (দেশ) গ্রামের কেউর নাই, সব শ্যাষ। লাভতো দূরের কথা উল্টো ঋণি হয়ে যাচ্ছি।
গত বৃহস্পতিবার উপজেলা চরইমারশন, কাউখালীর চর, সাজিরহাওলা গ্রাম, মৌডুবী ইউনিয়নের জাহাজমারা, রাঙ্গাবালী ইউনিয়নের কাজিরহাওলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে চাষিদের ক্ষেত পরিদর্শন করেও এমন চিত্র দেখা গেছে।
চলছে রসালো ফল তরমুজের ভরা মৌসুম। তবে মাঠে আশানুরূপ ফল নেই। চলতি বছরে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে রাঙ্গাবালীতে যারা তরমুজ আবাদ করেছেন, তাদের মুখে নেই হাঁসির ছিটে ফোঁটাও। তাদের স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতে দক্ষিণাঞ্চলের তরমুজ উৎপাদনে অন্যতম এলাকা হিসেবে পরিচিত পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় তরমুজের আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় চাষিদের মুখে হাসি নেই।
চাষিরা বলছেন, অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে গাছ মারা যাচ্ছে। মাঠে কোনো ফলন নেই। তাই দুশ্চিন্তা ও হতাশায় দিন পার করছেন তারা। প্রতি বছর এ সময় বিস্তীর্ণ মাঠে সবুজের সমারোহ আর লতায় মোড়ানোয় গাছে ফাঁকে উকি দিয়েছিল রসালো ফল তরমুজ। তবে এ বছর তার উল্টো রুপ ধারন করেছে ফসলের ক্ষেত। গাছগুলোকে মনে হয় পুড়ে গিয়ে বাদামি বর্ণের রূপ ধারণ করেছে। আস্তে আস্তে গাছগুলো মারা যাচ্ছে। চাষিরা জানান, এভাবে চলতে থাকলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে তারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় জানায়, উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে গত বছর ৫ হাজার ৪০০ জন চাষি, ৭ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমি আবাদ করেছেন। তবে তা বেড়ে চলতি বছরে প্রায় ৬ হাজার ৮০০ জন চাষি, ১০ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ করেছেন। যা গত বছরের তুলনায় ২ হাজার ৮৪০ হেক্টর বেশি জমি আবাদ হয়েছে। পাশাপাশি গত মৌসুমে প্রতি হেক্টর জমিতে ৩০ থেকে ৪০ মেট্রিক টন ফল উৎপাদন হয়েছে। তবে আবহাওয়ার বিরূপ আচরণের ফলে চলতি মৌসুমে সে অনুপাতে ফলন খুবই কম।
এদিকে, রাঙ্গাবালী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উদ্যোগে তরমুজের রোগ ও পোকা দমনে কৃষি গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রান্তিক চাষিদের করণীয় হিসেবে লিফলেট বিতরণের মধ্য দিয়ে চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে কাজ করছেন কৃষি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় বিভিন্ন রোগ ও ক্ষতিকারক পোকা মাকড় গাছগুলোকে আক্রমন করেছে। তাই- গাছের কচি পাতা কুকরে যাওয়ায় (জাব পোকা, থ্রিপস জাতীয় শোষক পোকা মাকড়), বালাইনাশ হিসেবে টিডো/এডমায়ার/ ইমিটাফ/ কনফিডর এর যেকোন একটির সাথে টক্সিমাইট/ ভার্টিমেক/ লিকার/ সানমেকটিন এর যেকোন একটি মাকড়নাশক বোতলে বা প্যাকেটে নির্দেশিত মাত্রায় প্রথম দিন স্প্রে করার পর দ্বিতীয় দিন সাকসেস অনুমোদিত মাত্রায় স্প্রে করতে হবে। লাল মাকড় দমনে টক্সিমাইট/ভাটিমেক/লিকার/সানমেকটিন বোতলে বা প্যাকেটে নির্দেশিত মাত্রায় পরপর সাতদিন স্প্রে করা। পাতা সুরঙ্গ পোকা দমনে ডেসিস ২.৫ ইসি অথবা বিটাফস ৬০ইসি বোতলের নির্দেশিত মাত্রায় সাতদিন পরপর দুইবার স্প্রে করা এবং গাছের কাণ্ড ও ফল ফেটে যাওয়া এবং গাছের মাথা দাড়িয়ে যাওয়ায় বোরন প্রতি লিটারে দুই গ্রাম হারে ও সানভিট অথবা ব্লিটক্স প্রতি লিটারে ৫ গ্রাম হারে স্প্রে করতে হবে। কুলুমাস/সালফক্সবা থিয়োভিট প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। এছাড়া অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করায় তরমুজের ফুলে মৌমাছি বা উপকারী পোকা মাকড় না আসায় প্রাকৃতিক পরাগায়ন হচ্ছে না। তাই কৃত্রিম পরাগায়নের মাধ্যমে ফলন আসতেও পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
এব্যাপারে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, রাঙ্গাবালীর চাষিদের প্রধান অর্থকরী ফসলের মধ্যে অন্যতম একটি তরমুজ। তবে চলতি মৌসুমে তরমুজ গাছের কচিপাতা কুকরে যাওয়া, গাছের কাণ্ড ও ফল ফেটে যাওয়া, গাছের মাথা দাড়িয়ে যাওয়াসহ কয়েক ধরনের সমস্যায় পড়েছেন কৃষকরা। আবহাওয়ার বিরূপ আচরণের কারণে সমস্যাটা হচ্ছে। আমরা সার্বক্ষণিক চাষিদের পরামর্শ ও করণীয় সম্পর্কে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। এ পরামর্শ সঠিকভাবে মেনে চললে খুব দ্রুত সময়ে চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠা সম্ভব।









