যুদ্ধ আর শান্তি একাকার
- পুতিনকে হিটলার বানাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র
- ন্যাটোর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে ক্ষুব্ধ রাশিয়া
ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসনকে বৈধ বলে সমর্থন করেছিলেন ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। তার সূত্র ধরেই পশ্চিমারা ইউক্রেনকে সামনে রেখে রাশিয়াকে শায়েস্তা করার ঘোষণা দিয়ে পারমাণবিক যুদ্ধকেই উসকে দিতে পারে। আর রাশিয়ার পুতিনও পশ্চিমাদের প্রতি প্রবল আক্রমণাত্মক মনোভাব থেকে তা লুফে নিতে পারেন।
উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট (ন্যাটো) এখন চারদিক থেকে অক্টোপাশের মতো পরাশক্তি রাশিয়াকে জাপটে ধরার পাঁয়তারা করছে। যে দেশটিকে এখন যুদ্ধের ঘাঁটি বানিয়েছে রাশিয়া সেই ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোভুক্ত করতে নানা কৌশল নিচ্ছে পশ্চিমারা। অথচ আজ থেকে তিন দশক আগে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার সময় ঘটনাটা ছিল ভিন্ন। ন্যাটোসহ পশ্চিমা বিশ্ব প্রতিশ্রিুতি দিয়েছিল ‘ন্যাটো রাশিয়ার নিরাপত্তা জন্য হুমকি হবে না’। এতদিন ধরে সেটাই বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়ে এসেছে রাশিয়া। তবে কে আর শোনে কার কথা। ন্যাটো ঠিকই পশ্চিমা মুরুব্বিদের আশির্বাদে রাশিয়াকে বাগে আনার জন্য ঘিরে ফেলার চেষ্টা করতে থাকে। ফলশ্রুতিতে যা হবার তাই হয়েছে।
গণভোটের মাধ্যমে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের স্বাধীনতাকামী লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কিউবা, ভেনেজুয়েলা, নিকারাগুয়া, সিরিয়া এবং জর্জিয়া প্রদেশের ওসেটিয়া ও আবখাজিয়া এগিয়ে আসে। নিজের প্রভাব বজায় রাখতে শান্তি রক্ষায় সেখানে সৈন্য পাঠান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। শুধু সেখানেই থেকে থাকেননি পুতিনি, আরেকটু এগিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল দোনবাসকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ারও আহ্বান জানান।
পুতিনের এমন সাহসিকতায় ভর করে লুহানস্ক ও দোনেৎস্কের অনুরোধ শেষ অবধি গত মাসের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোর থেকে রাশিয়ার সেনাবাহিনী বিভিন্ন দিক থেকে ইউক্রেনের সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা চালাতে শুরু করে। হামলা শুরুর পর সপ্তাহ খানেক গত হয়েছে। এর মধ্যেই আবার তারা শান্তির জন্য আলোচনাতেও বসেছে দুই দফায়। অর্থাৎ হামলা চলতেই থাকবে, রক্ত ঝরতেই থাকবে, আবার আলোচনাও চলতে থাকবে।
তবে হামলার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো এখন একে একে উদ্ভাসিত হতে শুরু করেছে। হামলাকে পুঁজি করে করেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশ্বকে উথাল-পাতাল করতে মরিয়া হয়ে উঠছে। হয়তো আলোচনার টেবিলে নিজেদের প্রভাব জারি রাখার স্বার্থেই এমন কাণ্ড। যুক্তরাষ্ট্রের অতীত ইতিহাসে এটাই বলে। নব্বই দশকে এক বালিকাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে মিথ্যা বলিয়ে কুয়েতকে সামনে রেখে ইরাককে টার্গেট করেছিল তারা। ২০০৩ সালে ইরাকে ব্যাপক গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে বলে ডাহা মিথ্যা প্রচার করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিং পাওয়েল প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের অ্যাসাইনমেন্ট বাস্তবায়ন করতে জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে যুদ্ধের সূচনা করেছিল। সেই স্মৃতি এখন স্মরণ করার সময় এসেছে অনেকের কাছে।
অবশ্য জর্জ বুশের বাবা সিনিয়র বু্শও বিশ্বে কম জল ঘোলা করেননি। সাদ্দামের বিরুদ্ধে সেই উপসাগরীয় যুদ্ধ করে দেশটিকে তামায় পরিণত করেছেন। পরবর্তী যুদ্ধেও কয়েক লাখ বেসামরিক ইরাকির মৃত্যু হয়। ইরাকের প্রেসিডেন্টকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে হত্যা করা হয়। অবশ্য জীবনের শেষ বেলায় সেই ভয়ঙ্কর মিথ্যার জন্য বিশ্ববাসীর কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন কলিন পাওয়েল। তাতে মানবজাতির জন্য কতটা উপকার হয়েছে তা আর আলোচনার যোগ্য না হলেও ইউক্রেন প্রসঙ্গে অতীত রোমন্থন করছেন অনেকে।
এখন এসে ইউক্রেনের জন্য মায়া কান্না করছেন সেই পশ্চিমারা। অনেকেই বলছেন, যে কোনো যুদ্ধে বাণিজ্যের সন্ধান করা পশ্চিমাদের মায়া কান্নাকে কুমিরের কান্নার সঙ্গে তুলনা করা যায়। অনেকেই অভিযোগ করছেন, ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসনকে বৈধ বলে সমর্থন করেছিলেন ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কি। সেটা ছিল ২০২১ সালের ১২ মের ঘটনা। এতে বোঝা যায়, পশ্চিমারা কেন ইউক্রেনকে সামনে রেখে রাশিয়াকে শায়েস্তা করার ঘোষণা দিয়ে পারমাণবিক যুদ্ধকেই উসকে দিতে পারে। আর রাশিয়ার পুতিনও চারিত্রিক গুণাবলী আর পশ্চিমাদের প্রতি প্রবল আক্রমণাত্মক মনোভাব থেকেই তা লুফে নিতে পারেন।
পূর্ব ইউক্রেনের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত দোনেৎস্কো আর লুহানস্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়ার স্বীকৃতি দেয়ার পর থেকেই ওই অঞ্চলে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। এমন উত্তেজনার মধ্যেই পশ্চিমা সেই ১৯৯১ সালের শান্তির প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন ইউক্রেনসহ রুশ প্রতিবেশী বাল্টিক দেশগুলোয় সৈন্য ও সমরাস্ত্র পাঠাচ্ছিল, তখন রাশিয়া একটা কথাই বলছিল, রাশিয়ার নিরাপত্তার লিখিত গ্যারান্টি চাই। চীন যদি মেক্সিকোকে পক্ষে টেনে মেক্সিকোর মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে মিসাইল তাক করে কয়েক মিনিটের মধ্যে ওয়াশিংটন-নিউইয়র্কে বোমা ফেলার বন্দোবস্ত করতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কি বসে থাকবে?
এমন ভয়াবহ এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে রাশিয়াও বসে থাকেনি। নৌশক্তিধারী পাশ্চাত্য আর ভূশক্তিধারী প্রাচ্য (রাশিয়া ও চীন) মিলে এখন পশ্চিমাদের ঠেকাতে যদি পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শন করে তাহলে খুব বেশি কল্পনা হবে না।
মূলত, ইউক্রেনের বর্তমান শাসকদের ক্ষমতা ও বিত্তের সোপান বানিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পশ্চিম ইউক্রেনের রুশবিরোধী মনোভাব উসকে তারা দেশটার গণতান্ত্রিক ময়দানকে যুদ্ধের ময়দান তারাই বানিয়ে ফেলেছে। ফিনল্যান্ড বা সুইজারল্যান্ডের মতো নিরপেক্ষতা ছাড়া বড় রাষ্ট্রের ছোট প্রতিবেশীর শান্তির পথ নেই। অথচ রুশমুখী মার্কিন মিসাইল, বোমা-বারুদ আর মার্কিন সেনা বিশেষজ্ঞ আসতে দেওয়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল জেনেও তারা এটা করে?
যুক্তরাষ্ট্র যে নিজেই চেয়েছে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা করুক তা নিয়ে আগেই গণমাধ্যমে অনেক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত জানুয়ারি মাস থেকেই বারবার জোর গলায় বলে যাচ্ছিলেন ‘রাশিয়া শিগগির ইউক্রেনে আক্রমণ করবে’। তার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমও একই কথা বলে গেল। গণমাধ্যমে অনেকেই আবার ইউক্রেনকে সতর্ক দিয়ে বলেছিলেন, স্বাধীনতাকে বিপদে ফেলে আন্তর্জাতিক মুরুব্বিদের খুশি করা যে আত্মঘাতী, তা ইউক্রেনকে বুঝতে হবে।
ভুক্তভুগীকে অভিযুক্ত করে আক্রমণকারীর পক্ষে নেয়ার কোনো যুক্তি কারো থাকার কথা নয়। তবে পরাশক্তি রাশিয়া যে দোনেৎস্ক-লুশানস্ককে স্বাধীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেই থামবে না, বরং ইউক্রেনকে টুকরো করবে সেটাই বড় বিষয়। আর তাতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী হবে সেটা আলোচনার বিষয়। অনেকের মতামত, ভালো হতো যদি রাশিয়া ন্যাটোর কাছ থেকে যে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইছিল, তা যদি মানা হতো। তাতে ইউক্রেনের স্বাধীনতা রক্ষা পেত আর পারমাণবিক হুমকির মুখোমুখিও হতো না। কেননা, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমাশক্তি প্রতিপক্ষ যখন রাশিয়া তখন ঘর পুড়িয়ে আলুপোড়া খেতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অনুশোচনা থাকবে না। সেটা যদি সভ্যতা বিধ্বংসী কোনো আয়োজনও।
অনেকেই বিশ্লেষণ করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইউক্রেন ঠিক ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটোকে দিয়ে শত্রুদেশটিকে ঘিরে ফেলা। যুক্তরাষ্ট্র আর তার অনুসারি ভাই বন্ধুরা চায়, পুতিনকে হিটলারের মতো সমমানের আগ্রাসী চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। তবে সমস্যাটা হলো, জমজ দুটি শিশুরাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়ে পুতিন সত্যিই এখন শান্তিরক্ষীর সাজ নিয়েছেন। এখন পুতিনের বিরুদ্ধে যাওয়া মানেই ন্যাটোর বিরুদ্ধে আগ্রাসনের অভিযোগ ওঠা।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি গত ১ মার্চ বর্তমান ইউক্রেন সংকটের জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন। বলেন, ইউক্রেন ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যবাদী নীতির নির্মম শিকারে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তাছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হোয়াইট হাউসে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে হয়তো তিনি (পুতিন) জয়ী হবেন, যে উদ্দেশ্যে এই অভিযানের নির্দেশ তিনি দিয়েছেন, তা হয়তো সফল হবে। কিন্তু এজন্য দীর্ঘমেয়াদে চড়া মূল্য দিতে হবে তাকে।
ডেকে হয়রান জেলেনস্কি
প্রেসিডেন্ট ভোলেদিমির জেলেনস্কি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নেতাদের ইউক্রেনের সঙ্গে সংহতির ‘প্রমাণ’ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে তিনি বলেন, ‘ইইউ ইউক্রেনকে সঙ্গে নিলে আমরা আরও শক্তিশালী হবো, এটা নিশ্চিত। তবে আপনাদের ছাড়া আমরা একা হয়ে পড়ব। প্রমাণ করুন, সংকটের এই মুহূর্তে আপনারা ইউক্রেনের পাশে রয়েছেন। প্রমাণ করুণ, ইউক্রেনকে আপনারা ছেড়ে যাবেন না। এর আগে তিনি ২৭টি দেশের সরকার প্রধানকে ফোন করেন সহযোগিতা চেয়ে কেউ সাড়া দেয়নি।
বেলারুশে রুশ ও ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদলের মধ্যে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে বৈঠকটি কোনো ঘোষণা ছাড়া শেষ হয়ে বুধবার আবার বসে। উভয়েই বেশকিছু শর্ত নিয়ে আলোচনা করেন তবে কোনো সমাধান হয়নি।









