রাজধানী ঢাকা চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে দিন দিন। সব ধরনের নাগরিক সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। জনসাধারণের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য গ্রহণ করা হচ্ছে বড় বড় উদ্যোগ। মেগা প্রকল্পে গোটা রাজধানীই এখন উন্নত বিশ্বের আদলে গড়ে উঠছে। রাত নামলে চারদিকে আলোর বন্যা বইয়ে যায়। নির্মাণ হচ্ছে বিশাল বিশাল ভবন। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। এমনিতে নারীর ক্ষমতায়নের কারণে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা। পাশাপাশি যে হারে কর্মসংস্থানের পরিধি বাড়ছে তাতে নারীর অংশগ্রহণও বেড়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি বেসরকারি কার্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য ৩০ ভাগ কোটার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এতে কি সরকারি, কি বেসরকারি সব ধরনের অফিসেই নারী কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি নিত্যদিন নানা ধরনের কাজ ও প্রয়োজনে হাজার হাজার লাখ লাখ নারীকে ঘরের বাইরে বেরুতে হচ্ছে। এতে গোটা রাজধানীজুড়ে নারীদের ব্যস্ততা অনেক বেশি। তবে এত কিছুর পরেও নগরীতে নারীদের জন্য অতি জরুরি সেবা শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। বেশিরভাগ শৌচাগারেই অপরিচ্ছন্ন নোংরা পরিবেশ। সেসব টয়লেট ব্যবহারে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় নারীদের।
সিটি করপোরেশেনের সূত্রমতে, গোটা রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন মিলে পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা মাত্র ১২৯টি। এর মধ্যে ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত এলাকা ঘেরা উত্তর সিটিতে পাবলিক টয়লেট মাত্র ৬৩টি। আর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল নিয়ে গঠিত দক্ষিণ সিটিতে টয়লেট মাত্র ৬৬টি। অথচ দুই সিটি মিলে জনসংখ্যা বর্তমানে দুই কোটি ৪০ লাখের উপরে। দুই সিটির হিসাব কষে দেখা যায়, এক লাখ ৮৬ হাজার মানুষের জন্য নগরীতে মাত্র একটি টয়লেট বা শৌচাগার রয়েছে। আর বেশিরভাগ পাবলিক টয়লেটের পরিবেশই অপরিচ্ছন্ন। বিশেষ করে নারীদের জন্য সবচেয়ে বেশি বিব্রতকরা। বাইরে বের হয়ে কখনও যদি শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হয় তাহলে ভয়ঙ্কর বিপাকে পড়তে হয় নারীদের। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ার ভয়ে নারীরা যেন শৌচাগার ব্যবহার করতে না হয় সেজন্য পানি পান কমিয়ে দেন। বিশেষত ঘরের বাইরে বেরুনোর সময় প্রায় নব্বই ভাগ নারী পানি পান করা থেকে বিরত থাকেন।
ঢাকা মহানগরে শৌচাগার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ভূমিজ-এর এক জরিপে নারীদের শৌচাগার ব্যবহার বিষয়ক জটিলতার ভয়ঙ্কর চিত্র উঠে এসেছে। জরিপের ফলাফল বলছে, ঘরের বাইরে গেলে টয়লেট পেলেও ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকেন ৯১ শতাংশ নারী। তাছাড়া ৯০ শতাংশ নারী বাইরে বের হওয়ার সময় পানিই পান করা থেকে বিরত থাকেন। জরিপের ফলাফল বিষয়ে চিকিৎসকদের মন্তব্য হচ্ছে, পানি কম পান করা এবং শৌচাগারের অব্যবস্থাপনার জন্য নারীদের ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ভূমিজের জরিপে যারা অংশ নিয়েছেন তাদের মধ্যে ৫০ শতাংশই ছিলেন শিক্ষার্থী। আর কর্মজীবী ছিলেন ৩০ শতাংশ। যারা তিন থেকে ১২ ঘণ্টা বাড়ির বাইরে থাকেন। তাদের ৬০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৪০–এর মধ্যে। নারীদের মধ্যে ৮০ শতাংশ কোনো না কোনো কাজে প্রতিদিন বের হন। আর সন্তানকে স্কুলে দেওয়া, কেনাকাটা বা জরুরি কাজে বের হন ২০ শতাংশ। বাইরে গেলে টয়লেট পেলেও করেন না ৯১ শতাংশ নারী। ৯০ শতাংশ নারী বাইরে বের হওয়ার সময় পানি খান না বলেছেন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তাদের কোনো না কোনো সময় মূত্রনালির সংক্রমণ বা ইউটিআই হয়েছে।
ভূমিজের নির্বাহী পরিচালক ফারহানা রশীদ বলছেন, জরিপটি তিন বছর আগে হলেও এখনো পরিস্থিতির খুব বেশি যে উন্নতি হয়েছে, তা বলা যায় না। তবে তিন বছর আগের তুলনায় এখন নারীদের পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের হার কিছু বেড়েছে। ফারহানা রশীদ আরো জানান, তিন বছর আগে তাঁদের টয়লেটগুলোতে জরিপে দেখা গিয়েছিল মাত্র ৩ শতাংশ নারী পাবলিক টয়লেটে যেতেন। কিন্তু এখন সেখানে যান ১৭ শতাংশ।
তথ্যমতে, মহানগরী ঢাকায় ভূমিজ ১৪টি পাবলিক টয়লেট পরিচালনা করে। এর মধ্যে রাজধানীর গাউছিয়া ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনের দুটি শুধু নারীদের জন্য। জরিপে অংশ নেয়া একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করা নিগার সুলতানা। বাড়ি ঢাকার অদূরে সাভারে। চাকরির পরীক্ষাসহ নানা কাজে ঢাকায় আসতে হয় মাঝেমধ্যে। এ আসা-যাওয়ায় বিড়ম্বনায় পড়েন শৌচাগারে যাওয়া নিয়ে। সে জন্য বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে পানি কম পান করেন বা অনেক সময় একেবারেই করেন না। কোনো স্থানে কাজের জন্য গেলে ‘প্রকৃতির’ চাপ পেলে তা কষ্টকর হয়ে যায়। ছুটতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বা কোনো বান্ধবীর মেসে।
নিগারের অভিযোগ, রাজধানীর বেশির ভাগ স্থানে টয়লেট নেই। যেখানে আছে সেখানে যাওয়া এক দুঃস্বপ্নের মতো। চরম নোংরা সেই টয়লেটের কথা মনে এলে আর যেতে ইচ্ছা করে না। নিগারের মতোই প্রতিদিন হাজার হাজার লাখ লাখ নারী কাজের তাগিদে ঘরের বাইরে বের হন। তবে তাদের জন্য শৌচাগারের সুবিধা নেই বললেই চলে। সুবিধা না থাকায় অথচা চরম নোংরা শৌচাগারে যাওয়া এড়াতে ৯০ শতাংশ নারী ঘর থেকে বের হওয়ার আগে পানি পান থেকে বিরত থাকেন। আর এতে স্বাস্থ্যের চরম উচ্চঝুঁকিতে রয়ে যাচ্ছেন তারা। ব্যাপকহারে মূত্রনালির সংক্রমণ বা ইউটিআইয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা।
আনন্দবাজার/শহকনগরীর বিব্রতকর শৌচাগার, স্বাস্থ্যের উচ্চ ঝুঁকিতে নারীরা
প্রকাশ:

বিস্তারিত
রাজধানী ঢাকা চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে দিন দিন। সব ধরনের নাগরিক সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। জনসাধারণের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য গ্রহণ করা হচ্ছে বড় বড় উদ্যোগ। মেগা প্রকল্পে গোটা রাজধানীই এখন উন্নত বিশ্বের আদলে গড়ে উঠছে। রাত নামলে চারদিকে আলোর বন্যা বইয়ে যায়। নির্মাণ হচ্ছে বিশাল বিশাল ভবন। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। এমনিতে নারীর ক্ষমতায়নের কারণে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা। পাশাপাশি যে হারে কর্মসংস্থানের পরিধি বাড়ছে তাতে নারীর অংশগ্রহণও বেড়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি বেসরকারি কার্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য ৩০ ভাগ কোটার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এতে কি সরকারি, কি বেসরকারি সব ধরনের অফিসেই নারী কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি নিত্যদিন নানা ধরনের কাজ ও প্রয়োজনে হাজার হাজার লাখ লাখ নারীকে ঘরের বাইরে বেরুতে হচ্ছে। এতে গোটা রাজধানীজুড়ে নারীদের ব্যস্ততা অনেক বেশি। তবে এত কিছুর পরেও নগরীতে নারীদের জন্য অতি জরুরি সেবা শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। বেশিরভাগ শৌচাগারেই অপরিচ্ছন্ন নোংরা পরিবেশ। সেসব টয়লেট ব্যবহারে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় নারীদের।
সিটি করপোরেশেনের সূত্রমতে, গোটা রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন মিলে পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা মাত্র ১২৯টি। এর মধ্যে ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত এলাকা ঘেরা উত্তর সিটিতে পাবলিক টয়লেট মাত্র ৬৩টি। আর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল নিয়ে গঠিত দক্ষিণ সিটিতে টয়লেট মাত্র ৬৬টি। অথচ দুই সিটি মিলে জনসংখ্যা বর্তমানে দুই কোটি ৪০ লাখের উপরে। দুই সিটির হিসাব কষে দেখা যায়, এক লাখ ৮৬ হাজার মানুষের জন্য নগরীতে মাত্র একটি টয়লেট বা শৌচাগার রয়েছে। আর বেশিরভাগ পাবলিক টয়লেটের পরিবেশই অপরিচ্ছন্ন। বিশেষ করে নারীদের জন্য সবচেয়ে বেশি বিব্রতকরা। বাইরে বের হয়ে কখনও যদি শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হয় তাহলে ভয়ঙ্কর বিপাকে পড়তে হয় নারীদের। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ার ভয়ে নারীরা যেন শৌচাগার ব্যবহার করতে না হয় সেজন্য পানি পান কমিয়ে দেন। বিশেষত ঘরের বাইরে বেরুনোর সময় প্রায় নব্বই ভাগ নারী পানি পান করা থেকে বিরত থাকেন।
ঢাকা মহানগরে শৌচাগার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ভূমিজ-এর এক জরিপে নারীদের শৌচাগার ব্যবহার বিষয়ক জটিলতার ভয়ঙ্কর চিত্র উঠে এসেছে। জরিপের ফলাফল বলছে, ঘরের বাইরে গেলে টয়লেট পেলেও ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকেন ৯১ শতাংশ নারী। তাছাড়া ৯০ শতাংশ নারী বাইরে বের হওয়ার সময় পানিই পান করা থেকে বিরত থাকেন। জরিপের ফলাফল বিষয়ে চিকিৎসকদের মন্তব্য হচ্ছে, পানি কম পান করা এবং শৌচাগারের অব্যবস্থাপনার জন্য নারীদের ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ভূমিজের জরিপে যারা অংশ নিয়েছেন তাদের মধ্যে ৫০ শতাংশই ছিলেন শিক্ষার্থী। আর কর্মজীবী ছিলেন ৩০ শতাংশ। যারা তিন থেকে ১২ ঘণ্টা বাড়ির বাইরে থাকেন। তাদের ৬০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৪০–এর মধ্যে। নারীদের মধ্যে ৮০ শতাংশ কোনো না কোনো কাজে প্রতিদিন বের হন। আর সন্তানকে স্কুলে দেওয়া, কেনাকাটা বা জরুরি কাজে বের হন ২০ শতাংশ। বাইরে গেলে টয়লেট পেলেও করেন না ৯১ শতাংশ নারী। ৯০ শতাংশ নারী বাইরে বের হওয়ার সময় পানি খান না বলেছেন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তাদের কোনো না কোনো সময় মূত্রনালির সংক্রমণ বা ইউটিআই হয়েছে।
ভূমিজের নির্বাহী পরিচালক ফারহানা রশীদ বলছেন, জরিপটি তিন বছর আগে হলেও এখনো পরিস্থিতির খুব বেশি যে উন্নতি হয়েছে, তা বলা যায় না। তবে তিন বছর আগের তুলনায় এখন নারীদের পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের হার কিছু বেড়েছে। ফারহানা রশীদ আরো জানান, তিন বছর আগে তাঁদের টয়লেটগুলোতে জরিপে দেখা গিয়েছিল মাত্র ৩ শতাংশ নারী পাবলিক টয়লেটে যেতেন। কিন্তু এখন সেখানে যান ১৭ শতাংশ।
তথ্যমতে, মহানগরী ঢাকায় ভূমিজ ১৪টি পাবলিক টয়লেট পরিচালনা করে। এর মধ্যে রাজধানীর গাউছিয়া ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনের দুটি শুধু নারীদের জন্য। জরিপে অংশ নেয়া একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করা নিগার সুলতানা। বাড়ি ঢাকার অদূরে সাভারে। চাকরির পরীক্ষাসহ নানা কাজে ঢাকায় আসতে হয় মাঝেমধ্যে। এ আসা-যাওয়ায় বিড়ম্বনায় পড়েন শৌচাগারে যাওয়া নিয়ে। সে জন্য বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে পানি কম পান করেন বা অনেক সময় একেবারেই করেন না। কোনো স্থানে কাজের জন্য গেলে ‘প্রকৃতির’ চাপ পেলে তা কষ্টকর হয়ে যায়। ছুটতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বা কোনো বান্ধবীর মেসে।
নিগারের অভিযোগ, রাজধানীর বেশির ভাগ স্থানে টয়লেট নেই। যেখানে আছে সেখানে যাওয়া এক দুঃস্বপ্নের মতো। চরম নোংরা সেই টয়লেটের কথা মনে এলে আর যেতে ইচ্ছা করে না। নিগারের মতোই প্রতিদিন হাজার হাজার লাখ লাখ নারী কাজের তাগিদে ঘরের বাইরে বের হন। তবে তাদের জন্য শৌচাগারের সুবিধা নেই বললেই চলে। সুবিধা না থাকায় অথচা চরম নোংরা শৌচাগারে যাওয়া এড়াতে ৯০ শতাংশ নারী ঘর থেকে বের হওয়ার আগে পানি পান থেকে বিরত থাকেন। আর এতে স্বাস্থ্যের চরম উচ্চঝুঁকিতে রয়ে যাচ্ছেন তারা। ব্যাপকহারে মূত্রনালির সংক্রমণ বা ইউটিআইয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা।
আনন্দবাজার/শহক







