
বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে দেশে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) আয়োজন করা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গেছে। দুদিন ব্যাপী ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২১ বাংলাদেশ: ডিসকভার লিমিটলেস অপরচুনিটিস’ থেকেই ২৭০ কোটি ডলার বা প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। যার বেশিরভাগই এসেছে সৌদি আরব থেকে। বিনিয়োগ সম্মেলনে অংশ নেয়ার আগে দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম ঘুরে দেখেছেন সৌদি আরবের পরিবহন মন্ত্রী সালেহ নাসের আল জাসের। তিনি তার সফরে নতুন বাংলাদেশকে দেখে চোখ খুলে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘুরে দেখার পরই তিনি বাংলাদেশে বিনিয়োগের উজ্জল সম্ভাবনা বিষয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠেন। ওষুধ ও হাসপাতাল নির্মাণ খাতে সৌদির ইঞ্জিনিয়ারিং ডাইমেনশন কোম্পানি থেকে প্রায় ১৭৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। পাশাপাশি সোলার বিদ্যুৎ ও আইটি খাতেও বিনিয়োগ করার কথা জানায় সৌদি আরব। এছাড়া সৌদি আরবের একোয়া পাওয়ার বাংলাদেশে দেড় বিলিয়ন বা ১৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগে সম্মতি জানায়।
সম্মেলনে তুরস্ক ও চীন থেকেও বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি এসেছে। চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন ঢাকা নর্থ সিটি করপোরেশনে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৫০ কোটি ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইটি হাব হাই-টেক পার্কে এক কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছে। কর্ণফুলী ড্রাই ডক ইকোনমিক জোন লিমিটেড ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) মধ্যে ১১৮ মিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ চুক্তি সই হয়।
‘ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট সামিটে ১১টি খাতের ওপর ১৬টি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের ৫৪টি দেশ থেকে ছয় হাজারের বেশি অতিথি অংশ নেন। সরাসরি ৫ হাজার এবং অনলাইনে অংশ নেন এক হাজার ৪০০ জন। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে রোড শো আয়োজনের পর দেশের মাটিতে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বিনিয়োগের পরিমাণের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রত্যাশা না করে নতুন বাংলাদেশকে বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরাই ছিল এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য। আগামী কয়েক বছরে দেশে ৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের সুযোগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয় সম্মেলন থেকে। নির্মাণাধীন ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ১২টি হাই-টেক পার্ক এবং নতুন পাওয়া সামুদ্রিক অঞ্চল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য বড় সুযোগ বলে তুলে ধরা হয়।
সম্মেলনে দিনব্যাপী বেশ কয়েকটি কারিগরি সেশনের আয়োজন করা হয়। এসব সেশনে বক্তাদের বিভিন্ন আলোচনায় দেশে কয়েক বছর ধরে যে দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে সে বিষয় উঠে আসে। বলা হয়, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকার সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তা চাহিদা ও বাজারেরও সম্প্রসারণ ঘটবে দেশে। অর্থনীতির এ সম্প্রসারণ বর্তমানে ১১টি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি করেছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটন, অবকাঠামো, ব্লু ইকোনমি, কৃষি ও খাদ্য খাতে দ্রুতই বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সব খাতেই আইনি সুযোগ-সুবিধা সহজীকরণের পাশাপাশি তা বাড়ানোরও প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে পরিচালন দক্ষতার দিকেও নজর দিতে হবে।
‘লেদার অ্যান্ড লেদারগুডস’ শীর্ষক সেশনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। এ সেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যা আমির হোসেন আমু। তিনি বলেন, দেশের সম্ভাবনাময় একটি খাত চামড়া শিল্প। এ খাতে দেশি-বিদেশি যারাই বিনিয়োগ করবে দ্রুত লাভবান হবে। সরকার এরই মধ্যে এ শিল্পে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে। পরিবেশের বিষয় মাথায় রেখে চামড়া শিল্পের কেন্দ্র রাজধানীর বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর।
সম্মেলনে বলা হয়, করোনা পরবর্তী সময়ে ২০২১-২২ অর্থ বছরের প্রথম ছয় মাসে চমাড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৫৪ শতাংশ। বাংরাদেশ জুতা উপাদনে বিশ্বে অস্বটম অবস্থানে থাকলেও চীন বিশ্ব বাজারের প্রায় ৬৩ শতাংশ দখল করে আছে। তবে এক সন্তান নীতির কারণে চীনে শ্রমিক সংকট থাকায় ১৩ শতাংশ উৎপাদন কমেছে দেশটিতে। ফলে এ বাজার দখলে বাংলাদেশের সামনে অনেত সুযোগ রয়েছে। ভিয়েতনাম বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজার দখল করে রাখলেও দেশটিতে এতো সংখ্যক কর্মক্ষম শ্রমিক নেই যা বাংলাদেশে রয়েছে। ২০২৪ সালে এখান থেকে ৫০০ কোটি ডলায় আয়ের লক্ষ্যে সরকার ১৭ ধরণের প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। ফলে এখানে বিদেশি বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাত নিয়ে আয়োজিত সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান। প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। প্যানেল আলোচক ছিলেন নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী খোকনসহ অন্যান্য অতিথিরা।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ২০২১-২২ অর্থ বছরে এ খাত থেকে প্রায় তিন হাজার ১৫০ কোটি ডলার আয় হয়েছে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এ খাতে। যাদের মধ্যে প্রায় ২৫ ভাগ নারী। বিশ্বে সেরা ১০০ কারখানার ৪০টিই বাংলাদেশের। তাছাড়া ১৫০টি সবুজ কারখান রয়েছে এ দেশে। তবে ৭৪ ভাগ তুলা থেকে সুতা উৎপাদন হয় এখানে। তবে বিশ্বে সিনথেটিক সুতার চাহিদা বাড়তে থাকায় এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, বিশ্ববাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য দেশের পোশাক শিল্পকারখানাগুলো এখন সিনথেটিক ফাইবার থেকে পণ্য উৎপাদনের দিকে নজর বাড়াচ্ছে। এ বিষয়টিই বাংলাদেশকে উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য ও ননকটন টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র করে তুলেছে। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিষয়ে ক্রমেই সচেতনতা বাড়ছে। ভোক্তারাও এখন টেকসই পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। ননকটন পোশাক, বিশেষ করে কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাকের প্রতি ভোক্তাদের মনোযোগ বাড়ছে।
তাছাড়া রফতানিতে মূলত লো-এন্ডের (কম মূল্য সংযোজিত) পণ্যের আধিক্য বেশি থাকায় দামের ক্ষেত্রের বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। শ্রম ব্যয় বাড়ায় রফতানিকারকরা এখন ধীরে ধীরে হাই-এন্ডের পোশাক প্রস্তুতের বিষয়ে মনোযোগী হতে শুরু করেছেন বলে দাবি উদ্যোক্তাদের। দেশের পোশাক খাতে এখনো বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। এক্ষেত্রে হাই-এন্ড পণ্যকে দেখা হচ্ছে বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র হিসেবে। পণ্যে বৈচিত্র আনার বিষয়ে বক্তারা তাদের মতামত তুলে ধরেন। দেশে এক হাজার কোটি ডলারের লন্ড্রি ব্যবসার সুযোগ রয়েছে বলেও জানানো হয়।
‘ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস: এনশিওরিং সাসটেইনড গ্রোথ’ শীর্ষক আরেক সেশনে দেশের আর্থিক খাতে বিনিয়োগের নানা দিক তুলে ধরা হয়। এ সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বাংলাদেশে এখন জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি, পর্যটন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে ভোক্তা চাহিদা বৃদ্ধি ও বৈদেশিক চাহিদা থাকায় বড় বাজার তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা, প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে বিনিয়োগের নতুন স্থান হিসেবে বিবেচনায় নিতে পারেন।
‘ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড লজিস্টিক—দ্য রাইট মুভ’ শীর্ষক সেশনে বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে উন্নত দেশের কাতারে যেতে হলে পরিবহন অবকাঠামো খাতে ২০৪০ সাল নাগাদ অন্তত সাড়ে ২৮ হাজার ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও রফতানি বহুমুখী করতে গতিশীল লজিস্টিকের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে উন্নত সড়ক অবকাঠামো তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করা সহজ হবে।
এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটির পক্ষ থেকে নগরীর ২৯টি খালে ভ্যানিসের আদলে পর্যটন নিয়ে বিনিয়োগ করতে আহ্বান জানান মেয়র আতিকুল ইসলাম। ইলেকট্রিক বাস ও নতুন টাওনশিপ নির্মাণেও বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তাছাড়া ঢাকা থেকে গাজীপুর যেতে যে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয় তা নিরসনে রাস্তায় চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।
রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে আয়োজিত ইনভেস্টমেন্ট সামিটের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সমাপনী অনুষ্ঠান ও মিডিয়া ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে শেষ হয়েছে দুদিনব্যাপী এ আয়োজন। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম, ফরেন ইনভেস্টমেন্ট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট রুপালী হক চৌধুরী।
সূত্রমতে, মধ্যম আয়ের দেশে হতে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ দরকার হবে বাংলাদেশের। আর উন্নত দেশ হতে শুধু অবকাঠামোর জন্য ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ৬০৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এই অর্থায়নের ৭৫ শতাংশ আসতে হবে বেসরকারি খাত থেকে। বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতি থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের ২৫তম অর্থনীতির দেশে হওয়ার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। আর এসব করতে এবারের এ আয়োজন একটি সুন্দর সূচনা ছিল বলে মনে করছে সংশ্লষ্টরা।
আনন্দবাজার/শহক








