ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মধ্যে অন্যতম মৎস্য উৎপাদন খ্যাত হিসাবে আখাউড়া বেশ পরিচিত লাভ করেছে। এ উপজেলার বেশীভাগ মানুষই মাছ চাষ করে অর্থনীতি উন্নয়নে যতেষ্ট ভূমিকা রাখছে। মাছ চাষে বেশী আয় হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে এ চাষের পরিধি। মাছ চাষ করে এ অন্তত ৫ শতাধিক পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছে।
পৌর শহরসহ এ উপজেলায় বৎসরে উৎপাদিত হচ্ছে ৫০৯১ মে.টন মাছ। এরমধ্যে মাছের চাহিদা রয়েছে ৩৫৭৫মে.টন। উদ্ধৃত থাকছে ১৫১৬ মে.টন। যা স্থানীয় চাহিদা পুরণ করে ঢাকা, চট্রগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বাহিরে সরবরাহ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হচ্ছে। তাছাড়া আখাউড়া স্থল বন্দর দিয়ে ভারতে মাছ রপ্তানি করে বছরে আয় হচ্ছে ১৬০.২৩ কোটি টাকা।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলার ১০২.১১ বর্গ কিলোমিটার আয়তনে মোট গ্রাম রয়েছে ১৩০টি। এরমধ্যে ছোট বড় পুকুরসহ প্রজেক্ট রয়েছে ২ হাজার ৮৭ টি,বিল রয়েছে ১৩টি ,নদী ৩টি, খাল ৩টি, ও প্লাবণ ভূমি রয়েছে ৮টি। সেইসাথে নিবন্ধিত জেলে ১৪৩০ ও মৎস্য চাষী রয়েছে ২১০৭ জন। তাছাড়া মৎস্য চাষী, মৎস্যজীবী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ২২০ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ৪০ জনকে।
চাষকৃত মাছের মধ্যে রয়েছে রুই, কাতল, পাঙ্গাস,মৃগেল পুটি,স্বরপুঁটি, কার্ফ, টেংরা, শোল, টাকি, কালিবাউস, তেলাপিয়া, বোয়াল, গ্রাসকাপ, নাইলোটিকা,শিং, মাগুর , কৈ, টাকি, আইড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। এরমধ্যে বেশী মৎস্য চাষি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ চাষে তারা চমক সৃষ্টি করছেন।
স্থানীয় মৎস্য চাষিরা জানায়, এ উপজেলায় উৎপাদিত মাছের সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় তাদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে মাছ চাষে তাদের দ্বিগুন আয় হওয়ার সম্ভব। এ জন্য তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছেন।
একাধিক মৎস্যচাষি জানায়,এ বছরের শুরুতেই তীব্র তাবদাহ আর অনাবৃষ্টি থাকায় পুকুর, খাল, বিল ও জলাশয়ে পানি সংকট দেখা দেয়। তাছাড়া শুকিয়ে যায় অনেক পুকুর ,হাল, বিল, জলাশয়ও । ফলে মাছের রেনু পোনা উৎপাদন ও মাছ চাষে শতশত মৎস্য চাষি এক প্রকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তারপরেও নানা প্রতিকুলতা অপেক্ষা করে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচের মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা করে মাছ চাষ করেন। মাছ চাষ অধিক লাভ হওয়ায় বৃষ্টির আশা না থেকে সময় নষ্ট করতে চায়না বলে জানায় চাষিরা।
তাছাড়া তিতাস নদী,হাওড়া নদী আর বিল,জলাশয়গুলোতে প্রাকৃতিক ভাবে ও মাছ হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমসহ সব সময় ওইসব জায়গাতে প্রাকৃতিক ভাবে নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যাচ্ছে। তাই জেলেসহ স্থানীয় লোকজনরা ওইসব জায়গা থেকে প্রতি নিয়মিত মাছ শিকার করছেন।
মৎস্য চাষি মো: আফজাল হোসেন বলেন, দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর ধরে তিনি দেশীয় পদ্ধতিতে নানা প্রজাতির মাছ চাষ করছেন। এ বছর ৩টি পুকুর এক বৎসরের জন্য চুক্তি নিয়ে রুই, কাতল, গ্রাসকাপ, মৃগেল, স্বরপুঁটিসহ নানা প্রজাতির মাছের পোনা ছেড়েছেন। তিনি আরও বলেন এক সময় মাছ চাষে বৃষ্টির উপর নির্ভর ছিল। এখন তা নেই। বৃষ্টির অপেক্ষা না করে মেশিনের মাধ্যমে পুকুরে পানি দিয়ে মাছ চাষের জন্য উপযুক্ত করা হয়। এ জন্য বাড়তি অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়। এ মৌসুমে মাছ চাষ করতে প্রথমে পানি সংকট থাকলে এখন তা নেই। বর্তমানে মাছের অবস্থা ও বেশ ভাল রয়েছে। গত মৌসুমে তিনি ওইসব পুকুর ও প্রজেক্ট থেকে যাবতীয় খরচ বাদে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা তার আয় হয়। এবারও আশা করছেন অন্তত ৩ লাখ টাকার উপর আয় হবে।
মৎস্য চাষি মো: মিলন মিয়া বলেন, নানা প্রতিকুলতায় অপেক্ষা করে এ বছর তিনি বার্ষিক চুক্তিতে পুকুর ইজারা নিয়ে রুই, কাতল, মৃগেলসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ ছাড়া হয়েছে। ঔষধ, খাবার মাছের পোনার দাম কয়েকগুন বৃদ্ধি পাওয়ায় খরচের পরিমাণ ও তার কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে পুকুরে মাছের অবস্থা বেশ ভালো আছে। বাজারে মাছের নায্যদাম পাওয়া গেলে এ চাষে লাভবান হওয়া যাবে।
মো: শাহজাহান মিয়া বলেন, ২টি পুকুর ইজারা নিয়ে এ পযর্ন্ত ১০ লাখ টাকার উপর খরচ হয়। বর্তমানে পুকুরে মাছের অবস্থা বেশ ভালো আছে। গত বছর এ ২ টি পুকুর থেকে মাছের পোনা কেনা, ইজারা ঔষধ, খাবারসহ অন্যান্য খরচ বাদে তার ৩ লাখ টাকা আয় হয়।
এদিকে স্থানীয় বাজার ও দেশের বাহিরে মাছ রপ্তানিকে কেন্দ্র করে পৌর শহরের সড়ক বাজার, বড় বাজার, ধরখারসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় অর্ধশতাধিক মৎস্য আড়ত গড়ে উঠেছে।
বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন মাছ সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য এখানে নিয়ে আসেন। এখানে স্থানীদের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত থাকা মাছগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ভৈরব, চট্রগ্রাম,ঢাকা শায়েস্তগঞ্জ, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে নেওয়ার পাশিাপাশি আখাউড়া স্থল বন্দর দিয়ে ভারতে রপ্তানি করা হচ্ছে।
উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো: রেজাউল করিম বলেন, মাছ চাষের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সব সময় মৎস্য চাষিদেরকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ উপজেলায় অনেক জমি পরিত্যাক্ত অবস্থায় বছরের পর বছর পড়ে আছে। এগুলো মাছ চাষের আওতায় আনা গেলে এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রওনক জাহান বলেন এ উপজেলার বেশীভাগ মানুষই অর্থনীতি উন্নয়নে মাছ চাষে যতেষ্ট ভূমিকা রাখছেন। মাছ চাষে বেশী লাভ হওয়ায় দিনের পর দিন এ চাষের পরিধি ও বাড়ছে। এখানকার দেশীয় প্রজাতির মাছ জলাশয়ে উৎপাদন হচ্ছে। জলাশয়ে কোন প্রকার পরিচর্য করতে হয় না। প্রাকৃতিক ভাবে মাছ হচ্ছে। তবে বানিজ্যিক ভাবে গড়ে উঠা মৎস্য খামারে পরিচর্যার পাশাপাশি খাবার দিতে হয়। তিনি আরো বলেন, মাছ চাষের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সব সময় পরামর্শ দিয়ে আসছেন বলে জানায়।
আনন্দবাজার/শহক









