
বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারির ঢেউয়ের কয়েক দফার ধাক্কায় দেশের রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও নাজুক অবস্থা তৈরি হয়েছিল। কাঁচামালের ভয়াবহ সংকটে অনেক কারখানায় উৎপাদনের ধারা ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে রফতানির সুযোগ না থাকায় উৎপাদিত পণ্য কারখানায় পড়ে থাকে। করোনাকালীন সংকটের কারণে সেসব পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হতে হয়। আর লোকসানের কারণে কর্মী ছাটাঁইসহ নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে হয় অনেক কারখানা মালিককে। তবে গেল মাস ছয়েক ধরে মহামারির প্রকোপ খানিকটা কমে এলে রফতানির সুবাতাস ফিরে আসে পোশাক খাতে। বাড়তে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পোশাক রফতানি। এতে করোনার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে রফতানিমুখী পোশাক খাত।
তবে সম্প্রতি ওমিক্রন নামে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট অন্যান্য খাতের মতোই পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের ভাবিয়ে তুলছে। তারা আশঙ্কা করছেন ওমিক্রন রফতানি আয়ের ক্ষেত্রে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। সেজন্য আঘাতের আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ইতোমধ্যে অনেক দেশে যাতায়ত সীমিত করা হয়েছে। যেসব দেশে পোশাকখাতের অনেক কাঁচামালের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেজন্য অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পোশাকখাতে ওমিক্রনের নেতিবাচক প্রভাব ঠেকাতে আগে ভাগেই পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন আমাকে
তবে আগাম প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা বলছেন অনেক শিল্প উদ্যোক্তাদের অনেকে। তারা বলছেন, বিগত দুই বারের করোনার আঘাত পোশাকখাতকে বড় ধরনের লোকসানে ফেলে দিয়েছে। অনেকে ব্যবসাপাতি গুটিয়েও নিয়েছেন। তাই ওমিক্রনের ঢেউ মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতির জন্য যে পরিমাণ পুঁজি দরকার তা অনেক শিল্পের মালিকেরই নেই। তাই আগাম প্রস্তুতি নিতে সরকারি সহায়তা হিসেবে শিল্প উদ্যোক্তাদের ৩ বা ৪ শতাংশ সুদে ঋণ সরবরাহ কিংবা বিশেষ তহবিল গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সূত্রমতে, করোনা মহামারির প্রকোপ কমে আসতে থাকায় চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রফতানি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়ে যায়। এই সময় রফতানি আয় আসে এক হাজার ৯৭৯ কোটি ডলার। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, একক মাস হিসেবে সর্বশেষ গেল নভেম্বরে রফতানি আয় আগের বছরের একই মাসের তুলনায় বেড়েছে ৩১ দশমিক ২৫ শতাংশ।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক হাজার ৭৪৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে আয় বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৯৭৯ কোটি ডলারে। আর গত অর্থবছরের একই সময়ে আয় ছিল এক হাজার ৫৯২ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। অন্যদিকে নভেম্বর মাসে ৩৫৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪০৪ কোটি ১৩ লাখ ডলারে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় গত মাসে রফতানি আয় ১৩ দশমিক ০৪ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের নভেম্বরে রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৩০৭ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। দেশের প্রধান রফতানি পণ্য পোশাকখাতের রফতানি আয় ভালো হওয়ায় ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।
গত ২০২০ সালের শুরু থেকেই করোনাভাইরাস দেশে আঘাত হানে। এর নেতিবাচক প্রভাবে বিপর্যয় নেমে আসে শিল্পের প্রায় সব খাতে। বিশেষভাবে দেশের রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড়খাত তৈরি পোশাক শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়ে। বছরের মাঝামাঝি করোনার প্রকোপ খানিকটা কমলে উদ্যোক্তারা ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করেন। তবে বছরের শেষ ভাগে দ্বিতীয় ঢেউয়ে ফের বিপর্যয় নেমে আসে। গেল দুই দফায় করোনার ঢেউয়ে পোশাকখাতে কাঁচামালের সংকট আর সময়মতো উৎপাদিত পণ্য তৈরির কাজ শেষ করাই ছিল বড় সমস্যা।
তবে ইপিবির হালনাগাদ তথ্যমতে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে তৈরি পোশাকের রফতানি আয় ও প্রবৃদ্ধি দুটোই বেড়েছে। এক হাজার ৪১১ কোটি ৫৭ লাখ ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫৮৫ কোটি ৬২ ডলারে। এ খাতে প্রবৃদ্ধি এসেছে ২২ দশমিক ৯৭ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে এই খাতে রপ্তানি ছিল এক হাজার ২৮৯ কোটি ৪৬ লাখ ডলার।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে পোশাকখাতের নিট পণ্যের ( সোয়েটার, টি-শার্ট) রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৮৩ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ৮৯৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশে। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানির পরিমাণ ছিল ৭১৩ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। একই সময়ে ওভেন পণ্যের (শার্ট, প্যান্ট জাতীয়) রফতানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ১৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা ৬২৭ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের বিপরীতে ওভেন পণ্য রফতানি হয়েছে ৬৮৭ কোটি ডলারের। গেল বছরের একই সময়ে যা ছিল ৫৭৫ কোটি ৮৩ লাখ ডলার।
আনন্দবাজার/শহক








