- ভবনে মানা হচ্ছে না অগ্নিনিরাপত্তা বিধিমালা
- আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে পুকুরের সংখ্যা
- দমকল বিভাগের সক্ষমতা কম
- বিল্ডিং কোড না মেনেই আকাশ ছোঁয়া দালান
রাজশাহী মহানগরীতে ২০০৯ সাল থেকে বহুতল ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এর আগে নগরীতে ১০ তলা ভবন বলতে ছিল কেবল সিঅ্যান্ডবি মোড়ে জীবন বীমার ভবনটি। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ১০তলা ভবনের সংখ্যা শতক ছাড়িয়ে গেছে। এসব ভবন নির্মাণে থাকার কথা পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। শর্ত অনুযায়ী পূরণ করার কথা থাকলেও ভবন নির্মাণের সময় সেসব শর্ত অনেক সময় মানা হয় না। মানুষের নিরাপত্তা বিবেচনায় বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স প্রতিটি ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার বিভিন্ন বিধিমালা নির্ধারণ করে দিলেও তার পুরোপুরি প্রয়োগ নেই ভবনগুলোতে। এতে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি দিনে দিনে বাড়ছে। শুধু রাজশাহী নয়, দেশের প্রায় প্রতিটি বিভাগীয় শহরগুলোর একই চিত্র।
নগরায়নের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহী মহানগরীতেও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। বাড়ছে বহুতল ভবন। তবে এসব বহুতল ভবনগুলোতে মানা হচ্ছে না কোন নিয়ম। নামমাত্র রাখা হচ্ছে নামমাত্র অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা। আবার কোনগুলোতে আগুন নেভানো কোন ব্যবস্থাই নেই। নেই পর্যান্ত সিঁড়ির ব্যবস্থা।
মাত্র কয়েক বছর আগেও রাজশাহীতে সুউচ্চ ভবন বলতে সিঅ্যান্ডবি মোড়ের ১০ তলা ভবনটি ছিল। নগরজুড়ে একতলা থেকে তিনতলা বাড়ি বেশি দেখা যেত। কিন্তু এখন চিত্র আলাদা।
সাহেববাজার, উপশহর, বর্ণালীর মোড়, আলুপট্টির মোড়, হোসেনীগঞ্জ, শেখপাড়া, লক্ষ্মীপুর মোড়, সাগরপাড়া, আমবাগান, তেরোখাদিয়া, সিপাইপাড়া, কাজীহাটা ও পদ্মা আবাসিক এলাকায় রয়েছে শতাধিক বহুতল ভবন। এসব বহুতল ভবন ১০ তলা থেকে শুরু করে ২১তলা পর্যন্ত।
রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে নগরীতে ৬০০ ভবনের অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে পাঁচতলা পর্যন্ত ৫৬৫টি এবং ছয়ের অধিক তলা ভবনের অনুমোদন ছিল ৩৫টির। ২০১৪ সালে অনুমোদন দেয়া হয় ৫০২টির। এর মধ্যে ৪৮৬টি পাঁচতলা পর্যন্ত এবং ছয়ের অধিক তলার ভবন ৩৫টি।
২০১৫ সাল থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৩৫৪টি ভবনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩৬টি পাঁচতলা পর্যন্ত এবং ছয়ের অধিক তলার ভবন অনুমোদন ছিল ৩৩টি। এর পরের ৫ বছরে আরো প্রায় ২ হাজার ভবনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
এসব ভবন নির্মাণে থাকার কথা পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। শর্ত অনুযায়ী পূরণ করার কথা থাকলেও ভবন নির্মাণের সময় সেসব শর্ত অনেক সময় মানা হয় না। অগ্নিনির্বাপণের নিজস্ব ব্যবস্থা, ইমার্জেন্সি এক্সিট সিঁড়ি, ৩০ ফুট রাস্তা, পানির আন্ডারগ্রাউন্ড, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ সুবিধাসহ বেশিরভাগ বহুতল ভবনে যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। ফলে ভূমিকম্প কিংবা বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডে এসব ভবনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হবে অনেক বেশি।
এদিকে রাজশাহীতে বহুতল ভবনে আগুন নিভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিসের নেই সক্ষমতা। যে লেডার (মই) আছে তা দিয়ে ৪ থেকে ৫ তলার আগুন নির্বাপণ করা সম্ভব। এর বেশি তলাতে আগুন লাগলে তা নির্বাপণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের প্রতি। এছাড়াও দিনে দিনে নগরীতে কমে এসেছে পুকুরের সংখ্যা। ফলে ধীরে ধীরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নগরী হয়ে উঠছে রাজশাহী।
রাজশাহী দমকল বিভাগের উপ সহকারি পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, ভবন নির্মানের জন্য অনুমোদন যখন নেয়া হয় তখন নকশায় সবই থাকে। কিন্তু কাজের সময় কেউ মানে আবার কেউ মানে না। জননিরাপত্তার বিষয়টা আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। যারা ভবনের মালিক তাদেরও জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিত।
উপ সহকারি পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, ভবনগুলোতে অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা আছে কি না তা দেখার জন্য রাজশাহী মহানগরীতে আমাদের পরিদর্শন টিম আছে। ওই টিমগুলো তাদের পরিদর্শন রিপোর্ট কিছুদিন পরপর জমা দেয়। আমরা সেই অনুযায়ি ভবন মালিকদের পরামর্শ দিয়ে থাকি।
দমকল বিভাগের সক্ষমতা: রাজশাহী মহানগরীতে আগুন নেভাতে রাজশাহী দমকল বিভাগের যে সরঞ্জাম আছে তা দিয়ে ৫ তলা পর্যন্ত আগুন নেভানো যাবে। এর বেশি সম্ভব নয়। রাজশাহী দমকল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উঁচু দালানে আটকে পড়া লোকজন উদ্ধারকাজের জন্য টার্নটেবল লেডার, সেøারকেল লেডারের মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম নেই রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের। অতিতে রাজশাহী মহানগরীতে যে রাস্তা ছিল তাতে বড় বড় গাড়ী ও যন্ত্রপাতিগুলো ব্যবহার করা যেতো না। সেজন্য যন্ত্রপাতিগুলো নিয়ে আসা হয়নি। বর্তমানে রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে।
রাজশাহী দমকল বিভাগের উপ সহকারি পরিচালক জাকির হোসেন জানান, আগামীতে বহুতল ভবনগুলোতে অগ্নি নির্বাপনের জন্য যেসব সরঞ্জাম প্রয়োজন সেগুলো নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বহুতল ভবনে আগুন নেভানোর জন্য অত্যাধুনিক একটি গাড়ি রাজশাহীর জন্য বরাদ্দ আছে।
জলাশয় ভরাট: একসময় ৪ হাজারের বেশি পুকুর ছিল রাজশাহীতে। এখন আছে তা হাতেগোনা। ভরাট হয়েছে পুকুরগুলোও। বিগত বছরগুলোতে রাজশাহীতে আশঙ্কাজনক হারে জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। গত ৫৯ বছরে রাজশাহীর জলাশয়ের প্রায় ৯৭ দশমিক ১৬ শতাংশ দখল ও ভরাট হয়েছে। ৯৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাজশাহী শহরে এখন জলাশয় আছে মাত্র ১২০টি। যার মধ্যে কেবল ২২টি পুকুর সরকারিভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে অগ্নি নির্বাপনের সময় পানির উৎস নিয়েও বর্তমান সময়ে দেখা দিয়েছে সংকট।
হেরিটেজ রাজশাহীর এর হিসেব অনুযায়ি, রাজশাহী শহরে সবচেয়ে বেশি জলাশয় ছিল ১৯৬০ সালে। তখন সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৪ হাজার ২৩৮। ১৯৮১ সালের এক জরিপে জলাশয়ের সংখ্যা পাওয়া যায় ২ হাজার ৭১। ২০১৯ সালের জরিপে দেখা যায়, রাজশাহীতে ১২ কাঠা বা তার বেশি আয়তনের জলাশয় আছে ১২০টি।
রাজশাহী উপ সহকারি পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, জননিরাপত্তার বিষয়টি সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে। সেজন্য আইনের পাশাপাশি সবাইকে তাদের কাজের প্রতি স্বচ্ছ হতে হবে। নগরীর রাস্তাগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রসারিত। রাজশাহীতে দমকল বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো হবে।









