- সুযোগের অপেক্ষায় ওরা
- অন্ধকার থেকে ফিরবে আলোতে
দেশের সকল শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও, আমাদের শিশুরা বরাবরের মত বঞ্চিতই রয়ে গেলো।জন্মসূত্রে পাওয়া এ পেশা এবং যাযাবর জীবন আমাদের প্রজন্মকে অভিশাপে পরিণত করেছে
পথের ধূলা গায়ে জড়ায়ে অন্যের ঠিকানায় ছাপড়া ঘরের মাটির বিছানায় অন্ধকার মাথায় নিয়ে জন্ম যাদের। বাসস্থান, জীবন-জীবিকা, সুশিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বেড়ে ওঠার সার্বিকদিক থেকে বঞ্চিত হয়েই তাদের পথ চলা। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চরবাটা ইউনিয়নের ভূঁঞার হাট সংলগ্ন সড়কের পাশে অস্থায়ী বসতিতে এমন অনিশ্চয়তা নিয়ে বেড়ে ওঠছে শিশুরা। সড়কের পাশে, পতিত জমিতে অসুস্থ্য পরিবেশে খোলা মাঠে তীব্র শীতে, মুষলধারে ঝড়বৃষ্টিতে অথবা উড়িয়ে নেওয়া ঝড়ের মুখে মাঠের ময়লাযুক্ত বিছানায় রাত কাটাতে হয় তাদের।
বেদে পল্লীর মেয়ে শিশুটি বড় হয়ে একদিন তার মায়ের মত শালীনতাহীন ভাবে কালোদৃষ্টির রোগ সারানোর মত অদ্ভূত পেশা গ্রহন করবে। সেখানে ভালো উপার্জন না করতে পেরে হয়ত শহরের বিড়ে কিশোরী মা হয়ে, কোলে নোংরা খাড়ি ওঠা চুলের একটি বাচ্চাকে নিয়ে অশোভনীয় ভিক্ষা পেশা না হয় নিষিদ্ধ পল্লীর অন্ধকার পথেই হবে তার ঠিকানা। ছেলেরা বড় হয়ে পান খাওয়া দাঁত আর অপরিচ্ছন্ন শরীর নিয়ে ছাপড়া পাহারা দিবে আর সময় সুযোগ মত সাপ ধরা, বানরের খেলা দেখানো, পুকুরে হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণ খোঁজা বা কোনো বাজারে পাতা লতার ঔষধ বিক্রির মত প্রতারণামূলক পেশায় নিজেকে ব্যস্ত রাখবে।
বেদে ফারুক এর স্ত্রী জরিনা খাতুন (৩৫) জানালেন, শিঙ্গা দেওয়া, কোমরের ব্যাথা চিকিৎসা ও দাঁতের পোকা সারিয়ে চলে আমাদের জীবনের চাকা। সংসার চালাতে যেখানে আমরা হিমশিম খাচ্ছি, সেখানে শিশুদের জীবনে শিক্ষার আলো জ্বালাবো কীভাবে? তাছাড়া বাড়ি ফেরার কথা যেখানে অজানা সেখানে বিদ্যালয়ের কথা তো ভাবাই যায়না। আমাদের যাযাবর জীবনে শিশুদের শিক্ষার কথা ভাবনা তো কালের মহাঅভিশাপ।
অপরিচ্ছন্ন পোশাকে ১২ বছরের কিশোরী সুমি ও ১৩ বছরের কিশোর মামুন জানান, আমাদেরও ইচ্ছে করে বই হাতে বিদ্যালয়ে যেতে, অন্যদের মত শিক্ষিত হতে। তবে, আমাদের জন্মই যে আজন্মের পাপ। অশিক্ষিত হয়ে বড় হওয়া আর ঠিকানাবিহীন পথে অন্যের তাড়া খেয়ে বেড়ানো আমাদের মত হাজার হাজার বেদে শিশু কিশোর হারিয়ে যাচ্ছে যাযাবর জীবনের অন্ধকার ছায়া পথে।
বেদে সরদার আব্দুল মান্নান ও শেফালী আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, এখন আর সাপ ধরা হয় না গ্রামের মানুষ প্রায় সচেতন। অসচেতন গরীবরা ছাড়া কেউ চিকিৎসা করায় না। আমাদের যাযাবর জীবনের জীবিকা নির্বাহের পৃথিবীটা অনেক ছোট হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর কথা তো আমরা ভাবতে পারছি না। এমন মানবতর জীবনের চাকায় পৃষ্ট হয়েও আমরা ভিক্ষা চাই না, চায় কাজের বিনিময়ে আমাদের সন্তানদের সামাজিক ভাবে মানুষ করতে।
বেদে মধু মিতা ও চারু বেগম জানায়, আমাদের বেদে দলে ১৫টি পরিবারে ২২জন শিশু রয়েছে। এভাবে সারা দেশে আমাদের বেদে পরিবারে হাজারও শিশু রয়েছে। তারা আক্ষেপ করে বলেন, দেশের সকল শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও, আমাদের শিশুরা বরাবরের মত বঞ্চিতই রয়ে গেলো। আমাদের শিশুদের আমরা দেশের বোঝা করতে চায় না। জন্মসূত্রে পাওয়া এ পেশা এবং যাযাবর জীবন আমাদের প্রজন্মকে অভিশাপে পরিণত করেছে।
প্রতিবেদকের সামনে জড়ো হওয়া বেদে পল্লীর বেদেনীরা জানায়, থেমে না থাকা সময় আমাদের সঙ্গে বড়ই নিষ্ঠুর আচরণ করছে। পেশা হয়েছে অভিশাপ, প্রজন্ম চলছে ঠিকানাবিহীন অজানা অন্ধকার পথে। আজ আর সাপ খেলা আমাদের শিশুদের বিনোদন দেয় না। আমাদের শিশুরা কম্পিউটারে গেমখেলে, ইন্টারনেটে বিশ্বভ্রমণ করে। তাই সাপের খেলার ব্যবসা আগের মত জনপ্রিয় নেই। এদিকে আইনি বাধায় সাপ ধরা দন্ডনীয় অপরাধ।
অপরদিকে আমাদের সন্তানের মত এরাও এদশের সন্তান। আমাদের শিশুরা যখন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় শিক্ষিত আগামীর কথা ভাবছে, তখন এ বেদে শিশুরা তাদের মা বাবার অভিশপ্ত যাযাবর জীবনের কারনে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা কি তাদের কথা ভাবছি? তারা শেওলার মত অন্তহীন পথে ভেসে চলছে দিক দিগন্তে।
নোয়াখালী সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্র জানা যায়, ধলিত জনগোষ্টি সেবার আওতায় সরকার বেদেদের জন্য সেবামূলক নানা প্রকল্প নিয়েছে। তবে কিছু সেবা আমরা দিচ্ছি। এ অঞ্চলে বেদেদের পরিসংখ্যান জরিপ কাজ হয়েছিল কয়েক বছর আগে। তবে, এরা ভাসমান হওয়ায় এদের সঠিক পরিসংখ্যান করা সম্ভব হয়নি। এদের সহযোগিতা করার জন্য আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশমালা প্রেরণ করেছি।









