রিজার্ভে চাপ
- ব্যয় বাড়ছে বিদেশগামী-পর্যটকদের
- রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে
- ডলারের দামের পার্থক্য ৮ টাকা
কমছে টাকার মান
- ডলারের বিপরীতে কমছে টাকার মান
- আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪৬ শতাংশ
- প্রবাসী আয় কমেছে ১৬ শতাংশ
- রপ্তানি আয় বেড়েছে ৩৫ শতাংশ
ডলারের চাহিদা ও যোগানের মধ্যে যে ভারসাম্যহীনতা তা অতিশিগগিরই কাটছে না
-ড. জাহিদ হোসেন, সাবেক অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে মাস দুয়েক ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এর ওপর আবার বেড়েছে জাহাজভাড়া। এতে আমদানি ব্যয় প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে। অন্যদিকে, ঈদ উৎসব ঘিরে খানিকটা বাড়লেও আগে বা পরে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধীরগতি দেখা গেছে। বহুমুখী এসব কারণে দেশে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের চাহিদা ও দাম বেড়ে গেছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় বেশ কিছু ব্যাংক বেশি দামে রেমিট্যান্স (ডলার) সংগ্রহ করে বেশি দামে ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক ও ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছে। যার প্রভাব দেশে আমদানি করা ভোগ্যপণ্যের বাজারে পড়ে বাড়িয়ে দিচ্ছে মূল্যস্ফীতি।
প্রতিবার ঈদে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়লেও আগে বা পরে দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এবার উল্টো ঘটনা ঘটেছে। ঈদের পরেই ভোগ্যপণ্যের দাম আরেক দফা বেড়ে গেছে। বাজারে দাম বাড়ার ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে আমদানি করা সয়াবিন ঘিরে। ঈদের আগের দিনও এই ভোজ্যতেলের সংকট এতটাই বেড়েছিল যে, দোকান থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। রজমানে ভোগ্যপণ্যের দামের ধকল সামলে ঈদের পরে কিছুটা স্বস্তির আশা করেছিলেন ক্রেতারা। তবে হঠাৎ করেই ঈদের দুদিন পর ৫ মে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে এক লাফে ৩৮-৪৪ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। যার ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই অন্য খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে।
আমদানি করা আরেক পণ্য পেঁয়াজের দামের চাপেও পড়তে হচ্ছে ক্রেতাদের। ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের পাশাপাশি দেশি পেঁয়াজের দামও কেজিতে বেড়েছে ১০-১৫ টাকা করে। বর্তমানে যে পেঁয়াজ ৪০-৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে গেল সপ্তায় তার দাম ছিল ৩০-৩৫ টাকা। ঈদের তিনদিন পরই ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হওয়ার প্রভাব পড়ে খুচরা বাজারে। আমদানিকারকদের ভাষ্য, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির আগের ইমপোর্ট পারমিটের (আইপি) মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে আইপি না পাওয়ায় আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে।
আমদানি করা সয়াবিন আর পেঁয়াজের সঙ্গে অনেকটা পাল্লা দিয়েই বাজারে আটা, ময়দা, ডিম, মসুর ডাল, চিনি ও গুঁড়া দুধের দাম ঈদের পরে বাড়তে শুরু করেছে। ঈদে যে খোলা আটা কেজিতে ৩৮-৪০ টাকায় বিক্রি হতো সেই আটা এখন মানভেদে ৪০-৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আবার খোলা ময়দায় দামও কেজিতে বেড়েছে ৫ টাকা করে। আগে ৫৫ টাকা কেজির খোলা ময়দা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। মোটা দানার মসুর ডালের দাম রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ১১০ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। আর সরু দানা মসুর ডালের কেজি ঈদের আগে ১২০ টাকা থাকলেও বর্তমানে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশি খাদ্যপণ্যের সরবরাহে তেমন ঘাটতি নেই। কিন্তু আমদানি করা খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে পাইকারি ব্যবসায়ীরা তাল মিলিয়ে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীদের যুক্তি হচ্ছে, বেশি দামে কিনলে তো আর কম দামে বেচা যায় না। তবে তাদের আশঙ্কা, দাম বাড়ার তালিকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় আরো অনেক জিনিসের নাম যুক্ত হতে পারে। মূলত, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি করা প্রায় সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম আরো বাড়তে পারে বলেই মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ক্রেতাদের খরচের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এতে তারা ব্যয় সংকোচন করতে গিয়ে অনেক খাদ্যপণ্য কমিয়ে দিচ্ছেন। তারা বলছেন, কিছুদিন পরপরই তো বাজারে এলে দেখা যায় অনেক পণ্যের দাম শুধু বেড়েই চলেছে। কোনো পণ্যের দাম কমেছে এমনটা কখনও দেখা যায় না। এ ব্যাপারে সরকারের অনেক কিছু করার আছে। বিক্রেতারা বলছেন, জিনিসের দাম বাড়ার খবরে ক্রেতারা বেশি ক্ষুব্ধ হন। তারা দাম বাড়ার জন্য বিক্রেতাদের দোষারোপ করেন। অনেক সময় তর্কবিতর্ক শুরু হয়। অথচ এ ব্যাপারে তাদের কোনো হাত নেই। বিক্রেতারা জানান, বাজারে সপ্তাহ সপ্তাহ কোনো না কোনো জিনিসের দাম বাড়ছেই। পাইকারদের কাছে দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন জিনিসের উৎপাদন আর আমদানি খরচ নাকি বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে বর্তমানে প্রতি ডলারের দাম ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা। তবে বেসরকারি খাতের আমদানিকারকদের প্রতি ডলারের জন্য গুনতে হচ্ছে ৯৫ টাকার বেশি। এতে চাপে পড়েছেন আমদানিকারকেরা। বিশেষত যারা আগে পণ্য এনে এখন আমদানি বিল পরিশোধ করছেন, তারা বড় সমস্যায় পড়েছেন। কারণ, পণ্য বিক্রি করে দিয়েছেন আগের দামে, আর দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে এখনকার দরে।
এদিকে ব্যাংক ও খোলাবাজারে ডলারের দামের পার্থক্য ৮ টাকা ছাড়িয়েছে। এতে অবৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা। কারণ, ডলারের দামের পার্থক্য আগে কখনো এতো বেশি হয়নি। ব্যাংকগুলোতে ডলারের সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে গত বৃহম্পতিবারও ৯ কোটি ডলার বিক্রি করেছে। ফলে চলতি অর্থবছরের বিক্রি বেড়ে হয়েছে ৫৯০ কোটি ডলার।
বাংলাদেশে এমনিতে প্রতি মাসে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে আমদানি দায় শোধ হয় না। এর মধ্যে আমদানি খরচ বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। আর রপ্তানি আয় বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। এদিকে প্রবাসী আয় কমেছে ১৬ শতাংশের বেশি। এতে সংকট আরও বেড়েছে। এর ফলে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে। গত বছরের ৩০ জুন রিজার্ভ ছিল ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। এখন যা কমে হয়েছে ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার।
এদিকে ডলার–সংকটের কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ঈদের আগে বেতন-ভাতার জন্য পোশাক কারখানাগুলো বেশি রপ্তানি আয় দেশে এনেছে। এ ছাড়া প্রবাসীরাও ভালো আয় পাঠিয়েছেন। ঈদের পর যা কমে গেছে। এতে সংকট তৈরি হয়ে ডলারের দাম বাড়ছে। কারণ, বিদেশি ব্যাংকের কাছে সময়মতো আমদানি বিল পরিশোধের বিকল্প নেই।
তবে ডলারের এই সংকট মোকাবিলায় নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিলাসপণ্য আমদানি ঠেকাতে গাড়ি ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের ঋণপত্রে নগদ জমার হার বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। এদিকে ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও খোলাবাজারে ডলারের দাম বাড়ছে। বৃহস্পতিবার যা বেড়ে হয়েছে ৯৪ টাকা ৫০ পয়সা। এর ফলে বিদেশগামী যাত্রী, রোগী ও পর্যটকদের খরচ বেড়ে গেছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মূখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বর্তমান পরিস্থিতিকে একটা উভয় সংকট অবস্থা বলে অভিহিত করেন। তার মতে, একদিকে ডলারের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে আমাদের বর্হিবাণিজ্যের ঘাটতিও বাড়ছে। মূলত আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স ঘাটতির কারণে এটা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে যে ডলার বিক্রির বিকল্প রয়েছে তা অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ ডলারের চাহিদা ও যোগানের মধ্যে যে ভারসাম্যহীনতা তা অতিশিগগিরই কাটছে না। তবে রিজার্ভ কমছে, ফলে এটা কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প না। সেজন্য ডলারের মূল্যকে আরো ফ্লেক্সিবল করে দেয়া ছাড়া তেমন কোনো উপায় নেই বলে মনে করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাণিজ্যঘাটতি বা চলতি খাতের ঘাটতি সহসা কাটছে না বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। ফলে দেশে যে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে তা আরো বাড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এটা মোকাবেলায় বাজেটের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ দেন তিনি। তাই আগামী বাজেটে সম্প্রসারণমূলক নীতি থেকে বিরত থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত মূল্যস্ফীতির কারণে বড় সমস্যায় পড়া দরিদ্রদের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচি শক্তিশালী করতে হবে। তবে শহরে তেমন কোনও কর্মসূচি না থাকায় এখানে নগদ সহায়তা প্রকল্পের দিকে যেতে হবে। রিজার্ভ কমে গিয়ে বাজারে গোলমাল শুরু হলে শুধু হুকুম দিয়ে, সার্কুলার ইস্যু করে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না বলেও সতর্ক করেন এ অর্থনীতিবিদি।
এমন বাস্তবতার মধ্যেও সরকারের পক্ষ থেকে মাথাপিছু আয় ৪৬২ মার্কিন ডলার বেড়ে ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার ও মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। সিপিডির বিশেষ ফেলো অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। কাটাসুতার সঙ্গে যেমন ঘুড়ির সম্পর্ক থাকে না, তেমনি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে অর্থনীতির বাস্তব অবস্থার সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
আনন্দবাজার/শহক









