- ভারীবর্ষণ-বন্যার কবলে থেমে গেছে জীবন-জীবিকা
অবিরামবর্ষণে প্লাবিত হয়ে পড়েছে মৌলভীবাজার। ভারী বর্ষণে জনজীবনে স্থবির হয়ে পড়েছে। রাস্তাঘাট প্রায় জনমানবশূন্য। যানবাহন নেই। শহরের বেশিরভাগ দোকনপাট বন্ধ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে আসতে পারছেন না। এমন ভারীবর্ষণে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ। কাজ করতে না পারায় উপোষ থাকতে হচ্ছে।
আবহাওয়ার বৈরীতার মধ্যেই কথা হয় মৌলভীবাজার শহরের কুসুমবাগের রিকশাচালক জামাল মিয়ার (৫০) সঙ্গে। তার পাঁচজনের সংসার। সবাইকে নিয়ে কোনো রকম মাথাগুঁজে থাকেন। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে নাজেহাল অবস্থা। বলেন, ‘ইলা মেঘ আর কোনদিনও দেখছি না’, ‘কেমনে যে কীতা করতাম’, কেমনে যে বিয়ালে খাইতাম’...। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় এভাবেই আক্ষেপ ঝরে পড়ে তার কথায়।
জামাল মিয়ার কোনো সঞ্চয় নেই। প্রতিদিন যে আয় করেন তা দিয়েই কোনোরকমে চলে যায় পাঁচজনের সংসার। ভরাবর্ষণের মধ্যে ঝুঁকি নিয়েই বের হয়েছেন জীবিকার তাগিদে। সকাল থেকে মাত্র দুশ টাকার মতো কামাই করেছেন। অথচ তার সংসার চালাতে প্রতিদিন অন্তত ৪শ সাড়ে চারশ টাকা দরকার। কিন্তু করার কিছু নেই। যা হাতে এসেছে তা দিয়েই খেয়ে না খেয়ে পারি দিতে হবে দিন।
বৈরী আবহাওয়ায় জামাল মিয়ার মতোই অসংখ্য মানুষের হাহাকার দেখা গেছে। প্রবল বর্ষণে শহরের ও জেলার বেশকিছু নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতার। শহরের নিচু এলাকা শান্তিবাগ, গীর্জাপাড়া, সৈয়ারপুর, কাজিরগাঁও, দরগামহল্লা এলাকার রাস্থাঘাট তলিয়ে গেছে। অনেক বাসাবাড়িতেও কোমর পানি উঠেছে।
শহরের শান্তিবাগ এলাকার হোটেল শ্রমিক আব্দুর রহিম জানান, শহরের গীর্জাপাড়া ফাটাবিল এলাকায় তার বাসায় এখন কোমরের ওপর পর্যন্ত পানি আছে। তাই মালপত্র পাশের বাসার দোতলায় উঠিয়েছেন। যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে বিকেলে কী হবে সেটা নিয়েই ভাবছেন। শহরের সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা হোসাইন আহমদ জানান, সকালে পানি না থাকলেও দুপুরের বৃষ্টিতে ফের তার বাসায়ও পানি উঠেছে। তাই তিনিও মালপত্র পাশের বাসায় রেখেছেন বলে জানান।
শমসেরনগর রোডের বাসিন্ধা চৌধুরী নাজিয়া তাসপিয়া জানান, সকালে প্রথমে পাত্তাই দেইনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসার ভেতর পানি উঠে পড়ে। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ঘরের ভেতরে এক ফুটের উপরে পানি উঠে গিয়ে কাপড় চোপড় ভিজে গিয়ে একাকার হয়ে গেছে।
শহরের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম কোদালীছড়ার নিম্নাঞ্চলে হাওর অংশে পানি নিষ্কাশনে ধীর গতি হচ্ছে বলে জানা গেছে। কাঞ্জার হাওর পানিতে পরিপূর্ন থাকার কারণে শহর অংশের পানি দ্রুত নিষ্কাষণ হচ্ছে না। তাই এই পানি ফুলে ফেঁপে বাসা বাড়িতে উঠছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজার জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান জানান, বৃষ্টিতে মনু, ধলাই, ফানাই, কন্টিনালা, জুড়ী এসব নদীর পানি বেড়েছে। তবে আপাতত বন্যার সম্ভাবনা কম। কেননা এটি মৌসুমী বৃষ্টি। তবে বর্তমানে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে বৃষ্টি নেই। মনু ধলাই খোয়াইসহ এই এলাকার নদীগুলোর উৎপত্তি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। যে কারণে মৌলভীবাজার জেলায় বন্যার তেমন আশঙ্কা নেই বলেও উল্লেখ্য করেন এই কর্মকর্তা।
কৃষি বিভাগ বলছে, গত কদিনের ভারী বর্ষণে জেলার হাকালুকি, হাইলহাওর ও কাউয়াদিঘী হাওরসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমির নতুল আউশ ধান ও বিভিন্ন জাতের শাক-সবজি।









