- তিস্তা শুকিয়ে মরা খাল
- হতাশায় হাজারো কৃষক
তিস্তা নদী শুকিয়ে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। গত একমাস আগেও নদীতে প্রচুর পানি থাকলেও এখন নদী অনেকটাই মরে গেছে। বড় বড় বালুর স্তূপ পড়ায় নদীর মূল গতিপথ হারাতে বসেছে। পানি না থাকায় তিস্তা পাড়ের কৃষক ও জেলেরা পড়েছেন বিপাকে। তারপরও ধুধু বালি চরে বিভিন্ন ফসল চাষ করার চেষ্টা করছেন কৃষকরা।
সরেজমিন দেখা যায়, তিস্তা ব্যারাজের ৫২টি গেটের মধ্যে ৪৫টি বন্ধ করে উজানের পানি আটকানোর চেষ্টা করছেন কর্তৃপক্ষ। এতে করে যেটুকু পানি উজানে জমছে তাতেই ব্যারাজটির বাকি ৭টি গেটের মাধ্যমে সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। কিন্তু চলতি সপ্তাহে পানি প্রবাহ মাত্র ১ থেকে দেড় হাজার কিউসেকে ওঠানামা করায় সেচের লক্ষ্যমাত্র ব্যহত হওয়ার শঙ্কা করছে কতৃকপক্ষ।
দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের ব্যারাজটি দাঁড়িয়ে আছে বালু চরে। চলতি বছরের জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর মাসে টানাবর্ষণ আর উজানের ঢলে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে তিস্তা নদী। ওই সময় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সেচপ্রকল্প ‘তিস্তা ব্যারাজ’ রক্ষায় খুলে দেয়া হয় ৫২টি গেট। এতে শুধু ব্যারাজের উজানের বাসিন্দারাই নন ভাটিতে থাকাও লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। নদী ভাঙনে বসত-ভিটাসহ সবকিছু হারিয়ে নিঃশ^ হয়ে পড়েন প্রায় ২০ হাজার পরিবার।
একসময়ের প্রমত্তা তিস্তার নাব্যতা এতটাই হ্রাস পেয়েছে যে, আসন্ন রবি মৌসুমে তিস্তা ব্যারাজের সেচ কার্যক্রম চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে। প্রতিদিনই পানি কমছে। কোথাও সামান্য পানি আবার কোথাও দিগন্তজোড়া বালুচর। ব্যারাজ থেকে শুরু করে তিস্তার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে পানি না থাকায় শঙ্কায় পড়েছেন কৃষক।
তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় একদিকে যেমন বর্ষা মৌসুমে ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে তেমনি শুস্ক মৌসুমেও তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে ভারত তাদের গোজল ডোবা নামে বাঁধের সাহায্যে একতরফাভাবে পানি আটকিয়ে বাংলাদেশের উত্তর জনপদের লাখ লাখ কৃষকের বোরা চাষাবাদ ব্যাহত করছে। এতে দিনে দিনে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি।
এ অবস্থায় পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করে তিস্তা নদী বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজাপুরসহ সেচ নির্ভর মানুষজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রতিবছর শুস্ক মৌসুমে যে হারে পানি প্রবাহ কমে আসছে তাতে করে শিগগিরিই কাক্সিক্ষত পানি চুক্তি সম্পন্ন না হলে, মরা খালে পরিণত হতে পারে বহুল আলোচিত তিস্তা নদী। আর সেইসঙ্গে তিস্তা নদীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা উত্তর জনপদের জীব বৈচিত্র মারত্মক হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে খাঁ খাঁ করে বালুচর। আর বর্ষাকালে পানি উপচে ভাঙনের মুখে পড়ে বসতবাড়ি, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, সড়ক-পুল-কালভার্ট। এর ফলে চাষাবাদ কমে বদলে যাচ্ছে এলাকার মানুষের জীবিকা। স্থানীয়রা জানান, এসব এলাকা একসময় ছিল জনপদ, আগে প্রচুর ভুট্টা ও সেচের আবাদ হলেও এখন আর তা হচ্ছে না। বর্তমানে বন্যরক্ষতি পুষিয়ে নিতে ধু-ধু বালুচরে বাদাম, মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা, মুশুরডাল, পেঁয়াজ, রসুন ও তরমুজের চাষ শুরু করেছেন কৃষকেরা।
লালমনিরহাট জেলার দোয়ানীতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তিস্তা সেচ প্রকল্প চালু হয় ১৯৯৮ সালে। নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার ১২টি উপজেলার ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দিতে পারার কথা এ প্রকল্পে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদৌলা বলেন, উজান থেকে পানি কম আসায় সেচযোগ্য জমির আওতা এবারও কমানো হচ্ছে। তিস্তা নদীতে পানি কম থাকায় জেলেরা বেকার হয়ে পড়েছে।
প্রায় ২০ বছর ধরে তিস্তা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন লালমনিরহাট জেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের দোয়ানী গ্রামের আকবর আলী (৪০)। তিনি বললেন, এখন নদীতে পানিও নাই, মাছও নাই। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
একই গ্রামের ছোবাহান মিয়া (৪০) বললেন, সাত-আট বছর আগেও মাছ পাওয়া যেত। এখন তিস্তায় পানি না থাকায় প্রতিবছর মাছ কমে যাচ্ছে। এখন অনেক জেলে পূর্বপুরুষের এ পেশা ছেড়ে দিনমজুরের কাজে নেমেছে।
তিস্তা কলেজের সহকারী শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে চৌচির হয়ে পড়ে তিস্তা নদী। জেগে ওঠে অসংখ্য চর। বর্ষায় হঠাৎ করে পানির ঢল নামায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে বাড়িঘর গ্রাম-গঞ্জ-হাটবাজার, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পুল-কালভার্ট সব ভেঙে তছনছ হয়ে যায়।
তিস্তা সেচ প্রকল্পের সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাফিউল বারী বলেন, তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের আওতায় আগামী ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে সেচ কার্যক্রম শুরু করা হবে। বর্তমানে পানি স্বল্পতার কারণে সেচ সুবিধার লক্ষ্যমাত্র হিসেবে এবছর ৫৩ হাজার হেক্টর জমি ধরা হয়েছে। বর্তমানে নদীতে পানি নাই বললেই চলে। আশা করি পানি পেলে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারব।
স্থানীয়দের দাবি, ভারতের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি হলে তাঁদের ভোগান্তি আর থাকবে না। সেটি কী ধরনের চুক্তি হবে তা জানা না থাকলেও তাঁরা মনে করছেন, চুক্তি হলে তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ একটা নিয়মের মধ্যে থাকবে।









