রমজান মাসকে সামনে রেখে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। দেশের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই এসব পণ্যের দাম বাড়ছে হু হু করে। যদিও গত মাসে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে, বাড়বে না। তবে কথা রাখেনি বাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো বাড়িয়ে চলছেন দাম।
ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইলে নোটিস ছাড়াই বেড়েছে রমজানের অতি জরুরি উপকরণ চিনি ও লেবুর দাম। গরুর গোস্তের দাম বেড়ে ৬৫০ টাকা ও খাসির গোস্ত ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব গোস্তের কেজিতে বেড়েছে ৩০ টাকা করে। মুরগির দাম বেড়েছে ৫০ টাকা পর্যন্ত। মাছের বাজারেও লেগেছে আগুন। পাঙ্গাস মাছ প্রতি কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা। অন্যান্য দেশি মাছে গড়ে দ্বিগুণ দাম বেড়েছে। তবে আদা, রসুন ও পেঁয়াজের দাম স্থিতিশীল রয়েছে।
মানিকগঞ্জের মাসুদ রানা নামক এক ক্রেতা জানান, বিপাকে পড়েছেন আমাদের মতো চাকরি করা মধ্যম আয়ের মানুষেরা। বেতন বাড়ানো হয়নি অথচ জিনিসপত্রের চড়া দামে মাসের শেষ পর্যন্ত চাকরিজীবীদের সংসার টানা কষ্ট। আরেক ক্রেতা সাইদুর রহমান বলেন, সবকিছুরই তো দাম বেশি। এভাবে কয়দিন টিকতে পারবো? তবে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য শুধু ভর্তুকি মূল্যে টিসিবি নয় মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য এমন ব্যবস্থা করা উচিত। বিক্রেতা বিকাশ সাহা জানান, তাদের পণ্য চড়া দামে কিনতে হয়। তাই জনগণকেও একটু বেশি দামে কিনতে হয়।
ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুরে রজমানের আগেই চাল, ডাল, সয়াবিন, ছোলা, মুড়ি, চিনি, খেজুরের দাম বেড়েছে। চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ হতে ১০ টাকা। মসুর ডালে বেড়েছে ২০ টাকা। সয়াবিন তেলে বেড়েছে ৭৮ টাকা। গত এক মাসে কেজিতে দাম ছিল ৯০ টাকা বর্তমানে বেড়ে তা ১৬৮ টাকা দাঁড়িয়েছে। মুড়ি এক মাস আগে ছিল ৫০ টাকা। বর্তমানে তা ৭০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা। খেজুরের দাম বেড়েছে কেজিতে ৮০ টাকা। আগে ছিল ১২০ টাকা। বর্তমানে তা ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
জামালপুর শহরের বানিয়া বাজার এলাকার মোদি দোকানদার নজরুল মিয়া বাজার দর সম্পর্কে বলেন, প্রতি বছরের রমজান মাস এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। কারণ রমজান মাস এলে সকলেই একটু বেশি করে পণ্য কেনে। সেজন্য জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। তবে পেঁয়াজের দাম কমেছে। সুরুজ মিয়া নামের এক ক্রেতার বলেন, আগে যে দামে পণ্য কিনতাম তার দাম এখন অনেক বেশি। এর কোনো প্রতিকার নেই। সুলতান মিয়া নামে এক বিক্রেতা বলেন, অনেক সময় বাজারে পণ্যও কিনতেও পাওয়া যায় না। তাই প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পণ্য কিনে রাখতেছি। যেন পরবর্তীতে দাম বাড়লেও হাতের কাছে পাই।
সিলেট বিভাগেও বেড়েছে দাম। সাধারণ মানুষ লাইন ধরছেন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্যের জন্য। অপেক্ষমাণ কামাল মিয়া বলেন, আগে কখনও টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কেনেননি। বাজারের দোকানে এসব নিত্যপণ্যের দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় এখানে আসতে বাধ্য হলেন। কথা হয় লাভলী বেগম নামে এক গৃহিণীর সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রখর রোদে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। ঘণ্টা দেড়েক থাকার পরI টিসিবি’র পণ্য হাতে পাননি। তাই বাধ্য হয়ে বাজারের দোকান থেকে বেশি দামে পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত নেন।
মৌলরভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে বসা টিসিবির ট্রাকের দায়িত্বরত মারুফ আহমদ জানান, বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে প্রতিনিয়ত। এখানে দাঁড়ানো ছাড়া মানুষের আর উপায় কি। একজন ২ কেজি’র বেশি নিতে পারেন না। যে পরিমাণ পণ্য আমাদের দেয়া হয়, তা দিয়ে লাইনে দাঁড়ানো সবাইকে দেয়া যায় না।
সিলেটে নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকার বিষয়ে সিলেটের ব্যবসায়ীরা বলছেন, রোজার এক-দুইদিন বাকি। তাই সবাই এখন রোজার কেনাকাটা করছে। রোজার কারণেই নিত্যপণ্যের দাম একটু বেশি। রোজা শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে দাম কমতে পারে।
চট্টগ্রাম বিভাগের নোয়াখালী জেলার ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েকদিন আগেও জিনিসপত্রের দাম নিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হতো। গত কয়েকদিনের তুলনায় বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা খুশি। তাদের দাবি, পুরো রমজান জুড়ে বাজারে দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়-ক্ষমতার মধ্যে রাখতে প্রশাসনিকভাবে বাজার মনিটরিংসহ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট নিজেরাই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করে ফেলবে।
রংপুর বিভাগের ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নারগুন এলাকার দিনমজুর সাদেক মিয়া জানান, যেভাবে রমজানের আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে আমরা হতাশ। রমজান মাসে কীভাবে পরিবার পরিচালনা করবো বুঝতে পারছি না। কিন্তু আমাদের দিন মজুরির দাম বাড়েনি। তাই কর্তৃপক্ষ যদি বাজার মনিটরিং ঠিক মতো করে তাহলে কিছু উপকৃত হতে পারি।
অটোচালক বারেক মিয়া জানান, সারাদিন অটোরিকশা চালিয়ে দিনে বেশি হলে ৫০০ টাকা আয় করি। তবে সেই টাকা দিয়ে সংসার চলে না। আবার রমজানের আগে যেভাবে পণ্যেরর দাম বৃদ্ধি পেয়েছে সেটা খুবই চিন্তিত। সরকার টিসিবি পণ্য বড়লোকদের দিচ্ছে আমরা বরাবরেই বঞ্চিত হচ্ছি। কর্তৃপক্ষ যদি যাচাই-বাছাই করে টিসিবির পণ্য সরবরাহ করে তাহলে কিছুটা উপকৃত হবো।
হাজীপাড়া এলাকার এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবাবুল হক জানান, মাসে যে বেতন পাই বাড়ি ভাড়া দিয়ে কোনোমতে সংসারটা চালিয়ে নিচ্ছি। রমজান মাসে কীভাবে সংসারের খরচপাতি করবো তাই নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। ঠাকুরগাঁও জেলার বাজার মনিটরিং কর্মকর্তা শেখ সাদি জানান, রমজানের আগে যে অসাধু ব্যবসায়ী পণ্য মজুদ করে দাম বৃদ্ধি করবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মাহাবুবুর রহমান বলেন, রমজানের আগেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে যাতে দ্রব্যমূল্য হাতের নাগালে থাকে। মানুষ যেন সহজে নিত্যপণ্যগুলো কিনে পরিবার পরিচালনা করতে পারে। যদি কোনো অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তৈরি হরে তাহলে তাদের আইনের আওতায় এনে সাজা ও জরিমানা করা হবে।
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি আবু সালেহ, জামালপুর প্রতিনিধি বিশ্বজিৎ দেব, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি আফ্রিদি আহাম্মেদ, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি তানভীর আঞ্জুম আরিফ, নোয়াখালী প্রতিনিধি দ্বীপ আজাদ, সিলেট প্রতিনিধি রেজাউল হক ডালিম ও টাঙ্গাইল প্রতিনিধি রেজাউল করিম)
আনন্দবাজার/শহক









