হাট বাজার ও চরাঞ্চলে অনেকেই এখন মস্ত বড় ডাক্তার। এমবিবিএস পাস না করে তারা সকল রোগের চিকিৎসক। এমনকি করছেন অস্ত্রোপচারও। তাদের ভুল চিকিৎসা, মাত্রাতিরিক্ত ওষুধের প্রেসক্রিপশনের কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের। অধিকাংশ বাজারে চটকদার সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে নিজেদের নামের আগে ‘ডাক্তার’ উপাধি আর ‘ডিপ্লোমা, প্যারামেডিক, এলএমএএফ, ডিএইসএস, যৌন মা ও শিশু বিশেষজ্ঞ, কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার এর মতো নামে শব্দ লাগিয়ে দেদারছে অপচিকিৎসা বাণিজ্য চালাচ্ছেন
নীলফামারীর ডিমলায় পল্লী চিকিৎসকরা নিজেদের ডাক্তার পরিচয়ে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। পূর্বে অনেকে বাইসাইকেল মেকার, কম্পাউন্ডার, কর্মচারি, ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করলেও বর্তমানে ডাক্তার সেজে চিকিৎসা দেওয়ার মতোও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আরএমপি (রুরাল মেডিক্যাল প্র্যাকটিশনার) কোর্স করেই উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজার ও চরাঞ্চলে অনেকেই এখন মস্ত বড় ডাক্তার। এমবিবিএস পাস না করে তারা সকল রোগের চিকিৎসক। এমনকি করছেন অস্ত্রোপচারও। তাদের ভুল চিকিৎসা, মাত্রাতিরিক্ত ওষুধের প্রেসক্রিপশনের কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের। স্থানীয় বেশির ভাগ বাজারে চটকদার সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে নিজেদের নামের আগে ‘ডাক্তার’ উপাধি আর ‘ডিপ্লোমা, প্যারামেডিক, এলএমএএফ, ডিএইসএস, যৌন মা ও শিশু বিশেষজ্ঞ, কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার এর মতো নামে শব্দ লাগিয়ে দেদারছে অপচিকিৎসা বাণিজ্য চালাচ্ছেন এরা।
গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসক সংকট থাকায় এসব ভুয়া চিকিৎসকের ওষুধ খেয়ে রোগমুক্তি তো দূরের কথা, নানান জটিলতায় ভুগছেন হাজারো রোগী। তাদের ভুল চিকিৎসার কারণে রোগী মারা যাওয়া মতো ঘটনাও ঘটছে। আবার অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের যাচ্ছেতাই ব্যবহারের কারণে সাধারণ রোগকে আরো জটিল থেকে জটিলতর পর্যায়ে নিয়ে নিরাময়-অসম্ভব করে ফেলছেন। নিজের চেম্বার খোলার পাশাপাশি এসব পল্লী চিকিৎসক ওষুধও বিক্রি করছেন।
একাধিক ঔষধ কোম্পানীর প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পল্লী চিকিৎসকদের জন্য টাকাসহ বিভিন্ন ধরনের গিফট দেয়া হয়। এজন্যই তারা এন্টিবায়োটিক ঔষধও লিখে দেন রোগীদের।
পাশাপাশি উপজেলার যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অনুমতিবিহীন শতাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার। যেখানে ল্যাব পরিক্ষার নামে দিনদুপুরে গলাকাটা বাণিজ্য চলছে। ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে কর্মীরাই রিপোর্ট তৈরি করে দিচ্ছে অহরহ। ডিএমএফ ডিগ্রির সাইনবোর্ড লাগিয়ে অদক্ষরাই করছেন আলট্রাসোনগ্রাম, এক্সরের মতো পরীক্ষা। ভুল এনালাইসে জীবন হারাচ্ছে গর্ভবতী মা ও শিশু। প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নজরদারি না থাকায় এসব ব্যবসা ঢের গজিয়ে ওঠারও অভিযোগ করেন অনেক স্থানীয় জনগণ।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা সদর ও গ্রাম-গঞ্জে শত শত লাইসেন্সবিহীন ডাক্তার নামধারী চেম্বার খুলে বসেছেন। চাপনীবাজারে হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসার পাশাপাশি সকল প্রকার টিউমার অপারেশন করেন পল্লী চিকিৎসক মোকছেদুল ইসলাম। যার ব্যাবস্থাপত্রে লেখা ডিএমএফ (ঢাকা) মেডিসিন, সার্জারি, মা ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞসহ নানা বিশেষন। তার চেম্বারে দেখা যায়, একটি কক্ষে জরাজীর্ণ অবস্থায় বেশ কিছু অপারেশনের সরঞ্জামসহ রক্ত পরীক্ষার সেম্পল পড়ে রয়েছে।
চর এলাকার দোহলপাড়া বাজারে দেখা যায় লাজু ফার্মেসি। সেখানে রোগী দেখেন মোছা. লাবনী আকতার ও মো. শরিফুল ইসলাম (রিয়াদ)। সাইনবোর্ড এ লেখা মেডিসিন, অর্থোপেডিক, সার্জারি, নাক-কান-গলা, যৌন, শ্বাসকষ্ট মা ও শিশু রোগে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্তসহ এখানে সকল প্রকার রোগের চিকিৎসা করা হয়। এমবিবিএস ডিগ্রি না থাকলেও নামের আগে ডাক্তার লিখেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লাবনী আকতার জানান, ডাক্তার লেখার নিয়ম নেই তবে অন্যদের দেখে তিনিও ডাক্তার লিখেন। চিকিৎসার পাশাপাশি মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ব্যবস্থাও করে দিতে পারেন অবৈধ গর্ভপাতের। তিনি জানান, চার বছরের কোর্স করার পর সব নিয়ম মেনেই তিনি রোগী দেখেন। তবে এখন এ পেশা ছেড়ে দিবেন বলে জানান তিনি।
উপজেলার রাপাহারা গ্রামের ভ্ক্তুভোগী শ্যামলী আক্তার জানান, তার মেয়ে মনি আক্তারের(১৪) লেখাপড়ায় স্মরণ শক্তি কম।প ্রতিবেশি দেবরের পরামর্শে তিনি চাপানি বাজারের পল্লী চিকিৎসক মুলকুতের কাছে যান। এ সময় তার মেয়েকে ভালো করার জন্য ইনজেকশন দেওয়া হয়। কিন্তু ভালো হওয়ার বদলে দিন দিন মেয়ের হাত পা বাঁকা হয়ে হাঁটাচলা, কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। চিকিৎসক বলেছেন ভুল চিকিৎসার কারণে তার মেয়ের এ অবস্থা হয়েছে। পরে তাকে পুরোপুরি সুস্থ করতে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি ওই পল্লী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ডিমলা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগ অস্বীকার করে ডা.০ মুলকুত জানান, আমার জনপ্রিয়তা দেখে এক শ্রেণির লোক ষড়যন্ত্র করছে। তিনি নিজেকে বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শি ডাক্তার দাবি করে সকল প্রকার চিকিৎসা প্রদান করছেন। নিজ বাড়িতে ক্লিনিক বানিয়ে চিকিৎসার পাশাপাশি ফার্মাসিস্ট ডিগ্রিধারি ছেলে হাবিবসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ওষুধ নিয়েও গবেষণা করেন বলে জানান তিনি। চেম্বারে যোগ করেছেন কম্পিউটারের মাধ্যমে রোগ নির্ণয়ের এনালাইসিস মেশিন। অথচ তার এ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান না থাকলেও চিকিৎসার নামে প্রতিদিন মোটা অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সদর ইউনিয়নের বাবুরহাট বাজারের নিজের প্রতিষ্ঠান লাইফ কেয়ার হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বসেন পল্লী চিকিৎসক আলাকুল ইসলাম। দীর্ঘদিন যাবত তিনি নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। কেন ডাক্তার পরিচয় দেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডাক্তার পরিচয় তুলে ধরার নিয়ম নেই। কিন্তু আমরা নিজেদের ডিমান্ড বাড়ানোর জন্য করে থাকি। শুধু আমি না অনেকেই এমন রয়েছেন। আর ক্লিনিকের কোনো অনুমোদন বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, অনুমোদন এতোদিন ছিলোনা এখন পেয়েছি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. রাশেদুজ্জামান জানান, আরএমপি কোর্স করেই পল্লী চিকিৎসকরা বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করছেন। এটি বন্ধ করা অথবা প্রেসক্রিপশনে তারা কি কি ঔষধ লিখতে পারবেন এ ব্যাপারে যদি আইনগত কোনো নির্দেশনা থাকতো তবে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারতাম। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। এর ফলেস্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে কেনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, প্রশাসনের পক্ষ হতে মোবাইল কোর্ট করার বিধান থাকলেও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে তা নেই।









