- দরকার আলাদা বাজেট, সামাজিক সম্মান-মূল্যায়ন
- উচ্চ আদালতেও যৌন হেনস্তার শিকার নারীরা
- পোশাকশিল্পে ৮০ থেকে ৬০ ভাগে নেমেছে নারী শ্রমিক
নারীকে ক্ষমতাবানের পর্যায়ে আনতে হলে অর্থনৈতিক দিকটি শক্তিশালী করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি সবক্ষেত্রেই সমান তালে হাঁটতে হবে। কারণ অধিকার কেউ কাউকে দেয় না। এটি কেড়ে নিতে হয়। আর সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করতে হয়।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত “ব্র্যাক দ্যা বিয়াস ফর এ জেন্ডার ইক্যুয়াল ওয়ার্ল্ড” শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
গতকাল বুধবার রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। সিপিডির ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহানের সভাপতিত্বে ও নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরে শুধু পুরুষ নয় নারীদের সমান সহযোহিতায় আমরা এ পর্যায়ে এসেছি। জরুরি ও কঠিন সময়ে নারীদের সব কাজে সংগ্রাম ছিল। অংশগ্রহণ ছিল। শুধু পার্সপেক্টিভ নিয়েই আলোচনা করলে হবে না। সার্বিক বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে হবে। কেননা প্রতিটি নাগরিককে তার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে নারীদের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।
তিনি বলেন, সামাজিকভাবে সম্মান বা মূল্যায়ন করা অবশ্যই প্রয়োজন। তা না হলে কাজ হবে না। এটি হলে সমাজ পিছিয়ে যাবে। প্রতিবন্ধকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ড. জিল্লুর রহমান বলেন, মধ্যশ্রেণির নারীদের সঙ্গেও উচ্চ পর্যায়ের নারীর একটি সংঘর্ষ দেখা যায়। রাজনৈতিক ও চিকিৎসাক্ষেত্রে নারীরা অনেক সমস্যায় পড়ে। জেন্ডার সমতা সম্ভব নয় যদি রাজনৈতিকভাবে সমাধান না করা হয়। কারণ আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত রাজনীতির যে স্রোত তা ভয়ংকর থেকে ভয়ংকর হচ্ছে। কেননা রাজনৈতিক ক্ষমতাটি বিরাট ভূমিকা রাখে। এটি শুধু নির্বাচন না বরং সবক্ষেত্রে তথা আদালত, চাকরি ইত্যাদি। তিনি বলেন, হেনস্তার হাজার ধরণ আছে। আমাদের কাজের ক্ষেত্র জেন্ডার সমতা নয়। এটিকে চিন্তা করার সময় হয়েছে। নিরাপত্তাবিষয় সম্পর্কে ড. জিল্লুর বলেন, নিরাপত্তাটি মানুষের জন্য বড় বিষয়। এখানে নারীরা কতটুকু নিরাপদ? তারা যেখানে যেতে চাচ্ছে সেখানে কি যেতে দেওয়া হচ্ছে?
সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত আলেকসান্ডা বার্গভন লিনডে, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত উইনি ইসট্রাপ প্যাটার্সন, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইনডাস্ট্রির পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, আইসিডিডিআরবির ডা. ফেরদৌসি কাদরি, ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম, ট্রাস্ট ব্যাংকর সিইও হুমায়রা আজম, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তার লিমা, হাইড্রোকিউ প্লাস বাংলাদেশ লিমিটেড সিইও ও কো-ফাউন্ডার রিজভানা হৃদিতা প্রমুখ।
সুইডেনের রাষ্ট্রদূত আলেকসান্ডা বার্গভন লিনডে বলেন, প্রতিদিনই নারী দিবস। শুধু একটি দিবসকেন্দ্রিক এটিকে বেঁধে দেয়া হলে চলবে না। সুইডেন বিশ্বে প্রথম নারীদের কল্যাণে নীতিমালা গ্রহণ করে। তারপর পৃথিবীর অনেক দেশ এ পথে পা বাড়ায়। তিনি বলেন, জলবায়ুতে নারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেন্ডার নিরসন পলিসি গ্রহণ করা প্রয়োজন। নারীদের বয়স নিয়ে কিছু সমস্যায় পড়তে হয়। কোভিড-১৯ মহামারিতে কর্মক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েছে তারা।
আলেজান্ডার আরো বলেন, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে। পারিবারিক থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই। খাদ্য নিরাপত্তায় নারীদের বিশাল অবদান রয়েছে। সুশীল সমাজ সব সময় হয়তো বিষয়টি নিয়ে কথা বলে যাচ্ছে। এটি সবক্ষেত্র থেকেই হওয়া দরকার। ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত উইনি ইসট্রাপ প্যাটার্সন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে নারীরা ভুক্তভোগীর শিকার হচ্ছে। আমরা প্রতিদিনই নারীকে সম্মান করবো এটিই প্রধান্য দেয়া হোক।
রওনক জাহান বলেন, বাংলাদেশে গণমাধ্যমগুলো আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন শুরু করেছে। তারা প্রথম পৃষ্ঠায় বড় বড় প্রতিবেদন করেছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেমন করছে আমাদের দেশেও অনেকটা এগিয়েছে। তিনি বলেন, নারীদের প্রযুক্তিতে এগিয়ে আসতে হবে। এখন এ পথে না এলে পিছিয়ে পড়বে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, নারীর জন্য আলাদা বাজেট প্রয়োজন। সবক্ষেত্রে অর্থাৎ প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে সমতা প্রয়োজন। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা সবক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে।
ব্রিটিশ হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের প্রথম চিন্তাই হয় আমি মেয়ে। আমি কি পারবো? এই চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। জার্মানিকে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভাবা যেতে পারে। সেখানে ৪ শতাংশ সিইও নারী। আমাদের দেশে দায়িত্ব দেয়ার সময় বলে থাকে সে তো মেয়ে। তিনি বলেন, কাজের মূল্যায়ন বা বেতন কাঠামোতে নারীরা পেছনে। কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ পার্থক্য না করে দক্ষতা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। নারীরা শারীরিক থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে যৌন হয়রানীর শিকার হয়ে থাকে। জার্মান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যবসায়ে নারী এগিয়ে যাচ্ছে। ডা. ফেরদৌসি কাদরি বলেন, চিকিৎসা ক্ষেত্রে নারীরা সক্ষতমার পরিচয় দিচ্ছে।
ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, সুপ্রিমকোর্টে নারীদের কাজের পরিবেশ নেই। যেমন শিশুদের জন্য আলাদা দুগ্ধপানের স্থান নেই, শৌচাগারও নেই। অনেক সময় যৌন হয়রানির শিকারও হতে হয় অর্থাৎ শারীরিক না হলেও দৃষ্টিভঙ্গি ও কথাবার্তার মাধ্যমে। মেয়েদের বেশি কাজ করিয়ে কম টাকা দেয়া হয়। সেখানে নিজেদের ফি নিয়েও সমস্যা হয়। কাজের ক্ষেত্রে হেয় করা হয়ে থাকে।
তাসলিমা আক্তার লিমা বলেন, দেশে পোশাকশিল্পে নারী শ্রমিক ৪৪ লাখ থেকে ৪০ লাখে নেমেছে অর্থাৎ এখন ৮০ শতাংশ থেকে নেমেছে ৬০ শতাংশে এসে পড়ছে। নারী-পুরুষের আইনি ক্ষেত্রে সমতা নেই। এখন নারী-পুরুষ সমান প্রয়োজন। তিনি বলেন, চাকরি না থাকার ভয়ে নারীরা নেতৃত্বে আসতে চায় না। রিজভানা হৃদিতা বলেন, আগামী প্রজন্মের জন্য পানি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। যেভাবে পানির যত্রতত্র ব্যবহার হচ্ছে তা নিয়ে আমরা শঙ্কা প্রকাশ করছি। এই সংকট নারীকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের মিডিয়া কর্মকর্তা বলেন, অধিকার কেউ কাউকে দেয় না। এটি কেড়ে নিতে হয়। নিজেকেই নিজের মূল্যায়ন করতে হবে। স্বামীর নামে স্ত্রীদের ডাকা হয়। প্রশাসনে এটি খুবই আপত্তিজনক পর্যায়ে চলে যায়, যেমন পশুভাবি, ডিসি ভাসি, রাজস্ব ভাবি ইত্যাদি। এটি থেকে বের হতে হবে। নবনিতা চৌধুরী বলেন, আমার মা একজন স্কুল শিক্ষক। তিনি আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন নিজের কাজ নিজেকেই করতে হবে। নারীকে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত লড়াই করে যেতে হয়।
মহিলা পরিষদের সংগঠক এডভোকেট মাসুদা বেগম বলেন, জীবনের প্রথম দিনই আমাকে স্বামীর নাম না বলায় কর্মক্ষেত্রে নিগ্রহের শিকার হয়েছিলাম। নারী হিসেবে একজন মানুষ হিসেবে যে কাজ করার অধিকার ও যোগ্যতা আছে এটি সমাজ মূল্যায়ন করতে চায় না। তা ছাড়া বক্তারা বলেন, মেয়েরা মেয়েদের কাজে আসছে না। একজন অপরের সঙ্গে হিংসা করছে। এ জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে না।









