- বাগান দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা
- টিকিটের বিনিময়ে আয় বাড়ছে
- ফুলপ্রেমীরাও ভিড় করছেন বাগানে বাগানে
- সূর্যমুখীর তেল স্বাস্থ্যের জন্য অসাধারণ
নরসিংদী জেলায় সূর্যমুখীরে আবাদ বাড়াতে কৃষক পর্যায়ে সরকারিভাবে প্রণোদনা আর পরামর্শ দেয়া হচ্ছে: কৃষি বিভাগ
বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে যেন সবুজের মাঝে হলুদের সমাহার। যতদূর চোখ যায়, সূর্যের দিকে মুখ করে হাসছে সূর্যমুখী। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ফুলের দিক পরিবর্তন হয়। সকালে পূর্বদিকে তাকিয়ে থাকলেও বিকেলে দিক পরিবর্তন করে ধাবিত হয় পশ্চিমে। বলছিলাম নরসিংদীর মেঘনা নদীর পাড়ের সূর্যমুখী ফুলের বাগানের কথা। আর এমন মনোরম দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
এদিকে, বাগান মালিকরা সৌন্দর্য পিপাসুদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থাও করেছেন। জনপ্রতি গুনতে হবে ২০ টাকা। এই টিকিট বিক্রি করে আয় করছেন ১০ হাজার টাকা। অন্যদিকে, বিঘাপ্রতি ২০ হাজার টাকা খরচে ৫০ হাজার টাকা আয় হবে বলে জানান চাষিরা। তবে জেলায় সূর্যমুখী আবাদ বাড়াতে কৃষক পর্যায়ে সরকারিভাবে প্রণোদনা এবং পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, পড়ন্ত বিকেলে সূর্যমুখী ফুল উপভোগ করতে আসছে অনেক তরুণ-তরুণী। দৃষ্টিকাড়া ফুলের মধ্যে মুঠোফোনে বন্দী করছে প্রিয় মুহূর্তগুলো। কেউ প্রিয়জনের হাত ধরে উপভোগ করছেন শেষ বিকেলের হলুদ আভা। কেউবা আবার নাচের তালে মিশিয়ে দিচ্ছে গোধূলী। সূর্যমুখী ফুলের বাগানের পাশেই মেঘনা নদী। নদীর ঢেউ আছড়ে পড়ছে বাগানের সীমানা ঘেঁষে। এই দৃশ্য নরসিংদীর নাগরিয়াকান্দি শেখ হাসিনা সেতুর পাশের সূর্যমুখী বাগানের। ব্রিজের দক্ষিণ পাশে তাকালেই হলুদ আর হলুদ। উপর থেকে তাকালে মনে হয়, হলুদ সুতোয় গিট দিয়ে কোনো কাঁথা সেলাই করা হয়েছে। তবে সেই কাঁথার অন্দর মহলে ঢুকে নিজেকে রাঙাতে গুণতে হবে জনপ্রতি ২০ টাকা। একটু প্রশান্তির খোঁজে এখানে হাজারো ফুলপ্রেমী প্রতিদিন জড়ো হন সূর্যমুখী বাগানের সৌন্দর্য দেখতে।
নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবছর জেলায় প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী ফুলের আবাদ হয়েছে। বীজ বপনের পর ফসল সংগ্রহ করতে প্রায় তিনমাস সময় লাগে। প্রতিটি গাছে একটি করে ফুল আসে। সরিষা চাষ থেকেও খরচ কম ও ফলন বেশি এবং লাভ জনক। ৪/৫ কেজি বীজ দিয়ে এক কেজি তেল পাওয়া যায়। যার বাজার মূল্য ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। তবে তারা সূর্যমুখী চাষ করে দ্বিগুণ লাভ করতে পারবেন। সূর্যমুখী চাষ যাতে বৃদ্ধি পায় এজন্য কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই ফুলের বীজ বিতরণ করা হয়েছে।
সানবীন মডেল স্কুলের শিক্ষার্থী রিতু আক্তার বলেন, আগে বইয়ের পাতায় শুধু দেখছি, এখন বাস্তবে নিজ চোখে সূর্যমুখী বাগানে এসেছি। ফুলের সৌন্দর্য দেখতে সাথে বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। সূর্যমুখী বাগানে ঘুরতে আসা আরেক দর্শনার্থী বলেন, চমৎকার লাগছে। আসলেই সুর্যমুখী বাগান আমাকে মুগ্ধ করেছে।
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সাথে কথা হয়। তারা বলেন, বাসাবাড়িতে বিভিন্ন ফুলের বাগান করা গেলেও সূর্যমুখী ফুলের বাগান করাটা খুব একটা হয়ে ওঠে না। এছাড়া একসঙ্গে অনেকগুলো সূর্যমুখী ফুল দেখে মনটা ভরে যায়। তাই ঢাকা থেকে এখানে এসে বাগানটিও দেখা হলো।
বন্ধুমহল সানফ্লাওয়ার গার্ডেনের সদস্যরা বলেন, বর্ষার সময় রাস্তার দু’পাশে পানি থাকায় এই এলাকায় পর্যটন ও দর্শনার্থীদের মুখরিত থাকে। ‘নদীর চরাঞ্চলের অধিকাংশ জমি পতিত অবস্থায় পড়ে থাকে। দর্শনার্থীদের কথা চিন্তা করে আমরা বন্ধুরা ১৩ বিঘা জমিতে এবার সূর্যমূখী ফুল চাষ করেছি। ফুলচাষ করার উদ্দেশ্যই হলো দর্শনার্থীদের বিনোদন দেওয়ার পাশাপাশি এলাকার কিছু বেকার ও কর্মহীনদের কর্মসংস্থা করে সহযোগিতা করা।
প্রকৃতি আর ফুলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে আমাদের সূর্যমুখী বাগান। দর্শনার্থী ও সৌন্দর্য প্রিয় ছাড়াও জুটিবদ্ধ হয়ে শতশত তরুণ-তরুণী প্রতিদিন ঘুরতে আসেন ফুলের বাগানে। তবে আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলনও হয়েছে ভালো। প্রতি বিঘা জমিতে ৪ হাজার টাকা খরচ করে বিঘা প্রতি ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাভের আশা করছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. ছাইদুর রহমান বলেন, এবছর জেলায় প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী ফুলের আবাদ হয়েছে। সূর্যমুখী ফুল দেখতে শুধু রূপময়ই নয়, গুনেও অনন্য। সূর্যমুখীর বীজের তেল স্বাস্থ্যের জন্য অসাধারণ। অন্যান্য তেলের মধ্যে যেসব ক্ষতিকারক উপাদান (কোলেস্টেরল) থাকে কিন্তু সূর্যমুখী তেলে তা নেই। পুষ্টিগুনেও অনন্য। সূর্যমুখীর বীজ খেতে খুব সুস্বাদু।
ড. মো. ছাইদুর রহমান আরো বলেন, নরসিংদীর সদরে পৌর এলাকার নাগরিয়াকান্দি মেঘনা নদীর পশ্চিমদিকে সানফ্লাওয়ার গার্ডেন ও নজরপুর ইউনিয়নের দড়িনবীপুরে মেঘনা নদীর পূর্ব পাশে বন্ধুমহল সানফ্লাওয়ার গার্ডেন নামে আরোও একটি পর্যটন মুখী সূর্যমুখী বাগান আছে। পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে আরো একটি পর্যটন মুখী সূর্যমুখী বাগান রয়েছে। এর মাধ্যমে চাষিরা তাদের ফুলের চাষের পাশাপাশি পর্যটনের জন্য একটু বাড়তি আয় করছেন।









