করোনার কারণে গত দুই বছর ঈদে ব্যবসা স্থবির ছিল। তাই কার্যত ব্যবসায়ীরা অর্থনীতিকভাবে দারুণ মন্দায় ছিলেন। তবে বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকায় স্থবিরতা কাটিয়ে মুসলিমদের প্রাণের উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মৌলভীবাজারের মানুষ। এদিকে সময় যত যাচ্ছে পোশাক সামগ্রীর পাইকারি ও খুচরা দোকানগুলোতে বেচাকেনার ধুম বাড়ছে। ব্যস্ততা বেড়েছে দর্জিপাড়ায়ও। ক্রেতা সামাল দিতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। তবে দীর্ঘ সময় পরে ব্যবসা ভালো হওয়ায় তাদের মুখে হাসি ফুটেছে।
প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজার জেলার কয়েক লাখ লোক লন্ডন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, ইতালি, মালয়েশিয়া ও সৌদী আরব, কুয়েত, কাতার, ওমান বাহরাইন এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। করোনার কারনে প্রবাসীরা দীর্ঘদিন দেশে আসতে না পারায় এবার ঈদ উপলক্ষে দেশে তাদের উপস্থিতি একটু বেশী লক্ষ করা গেছে।

সরেজমিনে ঈদের মার্কেটগুলো ঘুরে দেখা যায়, কেনাকাটার আবহ বইছে অভিজাত শপিংমল, বিপণিবিতান ও দেশী-বিদেশী পোশাকের পাইকারি মার্কেট গুলোতে। দোকানগুলোতে শোভা পাচ্ছে থরে থরে সাজানো নামীদামি ব্র্যান্ড ও বিদেশী পোশাকের পসরা। ফ্যাশনের বৈচিত্যের পাশাপাশি গ্রাহকতুষ্টির দিকে খেয়াল রেখে দোকানের সাজসজ্জাতেও এসেছে নান্দনিক পরিবর্তন। আবার ক্রেতা টানতে র্যাফেল ড্র কিংবা বিশেষ ছাড়ের আয়োজন রেখেছেন কেউ কেউ। দূর থেকে দৃষ্টি আকর্ষণে সাইনবোর্ডও নতুন করে লাগিয়েছেন কেউ কেউ। এক কথায় ভেতরে-বাইরে সবখানেই প্রস্তুতির ছোঁয়া।
অভিজাত মার্কেটগুলোর মধ্যে অন্যতম এমবি ক্লথ স্টোর, বিলাশ ডিপাটমের্ন্টাল স্টোর, আল মদিনা ক্লথ স্টোর, আশরাফ সেন্টার, জুলিয়া শপিং সিটি, সেরাটাউন ফ্লাজা, সেভেন স্টার, শাপলা ম্যানশন, আর,কে কমপ্লেক্স সহ অন্যান্য শপিং সেন্টারগুলো ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। নামী-দামী বিপনী বিতান গুলির পাশাপাশি ফুটপাতের দোকানগুলিতে হরেক রকম ডিজানের কাপড় সাজিয়ে বসেছেন হকাররা। ঈদবাজারে মেয়েদের জন্য শাড়ি, থ্রি পিস, সেলোয়ার-কামিজ, ফতোয়া, স্কার্ট-টপস, ছেলেদের লং ও শর্ট পাঞ্জাবি, ফতোয়া, শার্ট, জিন্স ও টি-শার্টসহ বাচ্ছাদের নানা রঙ ও ডিজাইনের পোশাকের সমাহার ঘটেছে বিভিন্ন বিপনী বিতানে।
শহরের জুলিয়া শপিং কমপ্লেক্সের ক্রেতা বুসরা ইসলাম জানান, ঈদ আসতে আরও কয়েকদিন বাকি। তাছাড়া শেষ দিকে আসলে সাইজ ও রং পাওয়া নিয়ে একটা ঝামেলা সৃষ্টি হয়। তাই একটু সময় হাতে রেখেই কেনাকাটা করতে আসলাম। এখানের পোষাকগুলোও মোটামুটি ভালো ও রুচিসম্মত।
এমবি ক্লথ ষ্টোরের ক্রেতা তাহসিনা রহমান জানান, গত দুই বছর করোনাভাইরাস থাকায় ঈদে আসলে তেমন কিছু কেনাকাটা করা হয়নি। যেহেতু এই বছর করোনা নেই তাই কিছুটা কেনাকাটা করা যা”েছ। কয়েকদিনে আগে এসে ঘুরের দেখে গেছি এখন ক্রয় করতে আসলাম ।
বিলাস ক্লথ ষ্টোরের বিক্রেতা ফাহিম আহমদে জানান, দুই বছর করোনার কারনে বিক্রির অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। এতে তাদের অবস্থা বেশ নাজুক ছিল। তবে এবার করোনা কিছুটা থামার ফলে রমজানের প্রথম দিন থেকেই তাদের বিক্রির পরিমান বাড়ছে। যা এখনও অব্যাহত আছে। তাছাড়া এবার সব বয়সীদের পছন্দের পোশাক আনা হয়েছে।
অভিজাত মার্কেট থেকে শুরু করে ফুটপাত সর্বত্রই কেনাকাটার ধুম পড়েছে। ঈদের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই জমে উঠেছে মৌলভীবাজারের শপিং মলগুলো।

তবে ঈদকে সামনে রেখে কষ্ট বাড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষদের। রংপুর থেকে আগত রিক্সা চালক জব্বার আলী বহুদিন যাবৎ এ শহরে রিক্সা চালিয়ে সংসার পরিচালনা করছেন। ঈদের পরিকল্পনা কী? বাচ্চা-কাচ্চার জন্য ঈদের জামাকাপড় ক্রয় করেছেন কী না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, মামা কী আর কমু দুঃখের কথা। পরিবারে লোকজন আমি নিয়া ৫ জন। গত দুই বছর করোনায় সময় বাচ্চচা-কাচ্চচা নিয়া বেশ কষ্টেই দিন কেটেছে। এখন অবশ্য করোনা নাই তবে রুজিও আগের মত নাই। রামজান আসার পর থিকা আবারো বহুত কষ্টে দিন যায়। কেননা দিনের বেলা লোকজন কম বাহির হয়। আর সারাদিন যা কামাই তাই দিয়া কোনো রকম চাল-ডাল ক্রয় করে নিয়া যাই। পরিবারের লোকজন বেশি তাই এখন কেনাকাটা লইয়া চিন্তা করার সাহস পাই না। কিছু কিনলে ত সবের লাইগাই কিনন লাগব। দেখি চানরাইত পর্যন্ত কী হয়।
শহরের সেন্ট্রাল রোডের ব্যাংক বুথের সিকিউরিটিতে কর্মরত আহমদ আলী ঈদকে সামনে রেখে জানান তার পরিকল্পনার কথা। তিনি জানান, বউ-বাচ্চাসহ ৪ জনের সংসার। তাছাড়া বেতনও খুব কম টাকা পান। মাসের প্রথম দিকে তাদের বেতন হয়না। হয় মাসের মাঝামাঝিতে। আর যা পান তা দিয়ে পুরোটা মাস চালিয়ে নিতে এমনিতেই বেশ হিমসিম খেতে হয় তাকে। সুতরাং আপাতত ঈদের কেনাকাটা নিয়ে তারও ভাবনায় নেই কিছুই।
শহরের জুলিয়া শপিং সিটির নাহার ক্লথ স্টোরের স্বত্তাধিকারী মিনহাজ আহমদ জানান, করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসায় সব কছু স্বাভাবিক হয়ে আসায় ফের ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি। যদিও গত দুই বছর ঈদের মৌসুমে বাণিজ্য হয়নি। এ সময় সাধারণ ব্যবসাটাই হয়নি। বাড়তি বেচাকেনাতো পরের কথা। তাছাড়া ব্যাংক লোনও ছিল। সুতরাং বড় লোকসানের কবলে পড়তে হয়েছে আমাকে। এ বছর করোনা পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকায় এবার আগে থেকেই ব্যবসা চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা পেছনের লোকসান থাকার পরেও ঈদকে সামনে রেখে সবার শেষটুকু দিয়ে, ব্যাংক লোন করে আবার বিনিয়োগ করেছেন। মৌসুমে ভালো আয় করতে জোর চেষ্টা করছেন তারা। এ সময় রমজানের প্রথম দিন থেকেই তার বিক্রির পরিমান আশানুরুপ আছে বলেও উল্লেখ্য করেন তিনি।
মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জাকারিয়া জানান, ঈদ বাজারে নিরাপত্তায় পুলিশের বাড়তি সদস্য রাখা হয়েছে। সময়টা আরেকটু ঘনালে পুলিশের পাশাপশি র্যাব শহর ও শহরের বাইরে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও পয়েন্টে সার্বক্ষনিক টহলে থাকবে বলেও উল্লেখ্য করেন এ কর্মকর্তা।
আনন্দবাজার/শহক








