- বাংলাদেশকে টপকে গেছে ভিয়েতনাম
- কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের অপার সম্ভাবনা
কৃত্রিম তন্তুর তৈরি পোশাকে বিশ্বের ১০ শতাংশ বাজার ভিয়েতনামের দখলে। বাংলাদেশ সেখানে ৫ শতাংশেরও কম। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম সুতার ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশে আলোচনা কম।
ফ্রান্সের প্রকৌশলী ও শিল্পপতি হিলাইরে দ্য চার্ডোনের উদ্ভাবিত কৃত্রিম সিল্কের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছিল ১৮৯২ সালে। তবে দুই বছর না যেতেই ১৮৯৪ সালে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যায়। সেই ১২৭ বছর আগের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে একুশ শতকে এসে। প্রাকৃতিক তুলা বা কটনের তৈরি পোশাকের রাজত্বে হানা দিচ্ছে কৃত্রিম সুতা বা সিনথেটিক ফাইবার। তবে বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম সুতার এই অভিযাত্রায় পিছিয়ে রয়েছে তৈরি পোশাক রফতানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ বাংলাদেশ।
বিশ্বে তৈরি পোশাক রফতানিতে চীনের পরেই অবস্থান বাংলাদেশের। কম দামের সুতি কাপড়ের পোশাক রফতানি করেই বিশ্ববাজারে জোরালো অবস্থান তৈরি হয়েছে গেল কয়েক দশক ধরে। যদিও তৈরি পোশাকশিল্পের যাত্রা শুরু হয় বিগত শতকের শেষ প্রান্তিক ১৯৭৬ সালে। এর বছর চারেক পরে বলতে গেলে ১৯৮০ সাল সরাসরি তৈরি পোশাক রফতানি শুরু করে বাংলাদেশ। এরপর ধীরে ধীরে রফতানির আকার বাড়তে থাকে। গেল চার দশকে চীনকে টপকাতে না পারলেও বিশ্ববাজার দখলে নিয়েছে দেশীয় পোশাক খাত।
তবে পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক বাজার যেমন বড় হচ্ছে, তেমনি পোশাক পণ্যেও দিন দিন আসছে ব্যাপক পরিবর্তন ও বৈচিত্র। বদলে যাচ্ছে পোশাকশিল্পের প্রধান কাঁচামাল সুতার চাহিদার ধরণ। সেই সঙ্গে মানুষের রুচিবোধ আর পছন্দের ধরনও। বিশ্ববাজার এখন ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে কৃত্রিম সুতা বা সিনথেটিক ফাইবার। আধুনিক প্রযুক্তির হাত ধরে কৃত্রিম সুতার বাজার বড় হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছেন আমাদের দেশীয় উদ্যোক্তারা। আমাদের পোশাক খাতে রফতানির সিংহভাগ জুড়ে এখনও সুতি কাপড়ের টিশার্ট, শার্ট, ট্রাউজার, জার্সি বা পুলওভার থাকছে। টেকসই ও ফ্যাশনেবল হিসেবে সিনথেটিক ও পলিয়েস্টারের মতো কৃত্রিম সুতার পোশাকের বিশ্ববাজারে দেশীয় শিল্পের কোনো উপস্থিতি নেই।
চীন তো দূরের কথা কৃত্রিম সুতা বা তন্তুর পোশাক রফতানিতে ভিয়েতনামের চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে কৃত্রিম তন্তুর তৈরি পোশাকে বিশ্বের ১০ শতাংশ বাজার দখল করে আছে ভিয়েতনাম। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাঁচ শতাংশেরও কম রফতানি করছে মাত্র। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম সুতার ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশে এ নিয়ে উচ্চ মহলে তেমন কোনো আলোচনা নেই।
কৃত্রিম তন্তুর বিশ্ববাজার
ফাইবার টু ফ্যাশন ম্যাগাজিনের তথ্য বলছে, গত ১০ বছরে ননকটন বা সিনথেটিক সুতার চাহিদা ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ। যার বিপরীতে কমেছে তুলা থেকে তৈরি সুতার চাহিদা। কৃত্রিম সুতার পোশাকের বিশ্ববাজারের আকার প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলারের। যেখানে বাংলাদেশের দখল মাত্র ২ শতাংশের মতো।
২০১৯ সালে গোটাবিশ্বে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ১৯ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি ডলারের কৃত্রিম তন্তুর পোশাক রফতানি হয়। ২০২৫ সালে সেটি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে ৪০ হাজার কোটি ডলারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ এ ধরনের তথ্য দিয়েছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ম্যানুফ্যাকচারার ফেডারেশনের (আইটিএমএফ) তথ্য অনুযায়ী মোট পোশাকের ৭৮ শতাংশই কৃত্রিম তন্তুর। বাকি ২২ শতাংশ তুলার তন্তুর।
আমাদের অবস্থান
দেরিতে হলেও কৃত্রিম তন্তু উৎপাদনে দেশের বস্ত্রশিল্পের উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন। বেশ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান কৃত্রিম তন্তু উৎপাদনে শিল্পে বিনিয়োগ শুরু করেছে। ডিবিএল এরই মধ্যে ৫৬২ কোটি টাকা এ খাতে বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এনজেড টেক্স গ্রুপ কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে প্রথমে ভিসকস, টেনসিল ও মোডাল সুতা এবং তা দিয়ে কাপড় তৈরি করছে। প্রতি বছর এই গ্রুপের ব্যবসা ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় প্রতিষ্ঠানটি ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে প্লাস্টিকের বোতল থেকে পলিয়েস্টার তন্তু উৎপাদন করবে।
ধীরে ধীরে আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই তন্তু উৎপাদনে নতুন করে বিনিয়োগ করার কথা বাবছে। সেই অনুযায়ী আগামী বছরগুলোয় এ খাতে অনেক বেশি বিনিয়োগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশে কৃত্রিম তন্তু উৎপাদনে নতুন করে বিনিয়োগে বিটিএমএ ও বিজিএমইএ নানা প্রস্তুতি নেয়ার চেষ্টা করছে। বিজিএমই তৈরি পোশাকের কৃত্রিম তন্তুর বাজার ধরতে বিগত বাজেটে ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা চেয়েছিল। তবে শেষ সময়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
দেশে বর্তমানে প্রায় ৮০টি বস্ত্রকল পলিয়েস্টার, ভিসকস, টেনসিল, মোডালসহ বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম তন্তু, সুতা ও কাপড় উৎপাদন করছে। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০টি, বিগত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি বৃদ্ধি পেয়েছে।
আমাদের করণীয়
একটা সুতি টি শার্টের চেয়ে তিনগুণ দামে সিনথেটিক কাপড়ের টি শার্ট বিক্রি করা যায়। যা তৈরিতে একই সময় লাগে। তবে এ ধরনের কারখানা স্থাপনে সাধারণ পোশাক কারখানার কয়েকগুণ বেশি বিনিয়োগ দরকার হয়। পোশাক রপ্তানি বাড়াতে স্থানীয় কাঁচামাল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ-জাতীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান করতে গেলে কমপক্ষে এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকায় প্রয়োজন। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের স্বল্প সুদে ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়া যেতে পারে। তাছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এ খাতে বিশেষ বিনিয়োগে এগিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা জানান, সিনথেটিক পোশাকের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করা যেতে পারে। চীন, জাপানসহ কয়েকটি দেশের বিনিয়োগকারীদের জন্য যেসব ইকোনমিক জোন বা অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হচ্ছে সেখানে তাদের এ ধরনের শিল্পে উৎসাহিত করা যায়। যখন দেশের উদ্যোক্তারা দেখবে বিদেশিরা এখানে ভালো করছে, তখন তারাও আরো উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে আসবে। সরকারের নীতি ও সহযোগিতা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। ভ্যাট ও কর এ খাত থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া যেতে পারে। তখন এ খাতে নতুন নতুন বিনিয়োগ করতে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হতে পারে।
এই খাতের উন্নতির জন্য ডিজাইন, ফ্যাশন ও প্রযুক্তিগত উন্নতির জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জাতীয়ভাবে একটি ইনস্টিটিউট স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে ভারত, চীন ও ভিয়েতনাম এগিয়ে আছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার সুযোগটা নিতে না পারলে প্রতিযোগী দেশগুলো আরো এগিয়ে যেতে পারে।
আনন্দবাজার/শহক









