২০১৩ সালে নারী পর্যটক ধর্ষণে ভারতে পর্যটক হ্রাস পায় ২৫ ভাগ
- ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ
- ভারতে ১০৭২ কোটি, মালদ্বীপ ৬০ কোটি, শ্রীলঙ্কা ৩৮ কোটি, পাকিস্তান সাড়ে ২৭ কোটি, নেপালে ২০ কোটি টাকা, বাংলাদেশে সাড়ে ৭ কোটি টাকা
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পর্যটনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য আর বহুবিচিত্র মানুষের সমাহারই দেশীয় পর্যটনের সবচেয়ে বড় পণ্য। দিন দিন পর্যটনখাতের এ সম্ভাবনা বেড়েই চলেছে। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে একশ কোটিরও বেশি পর্যটক পর্যটনখাতকে ধরে রেখেছে ২০২৫ সাল নাগাদ সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ১৬০ কোটিতে। আর বিপুলসংখ্যক এই পর্যটকের মধ্যে ৭৩ শতাংশই ভ্রমণের জন্য বেছে নেবেন এশিয়ার দেশগুলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব পর্যটনখাতের বৃহৎ এই বাজার ধরতে পারলে এর ওপর ভর করেই আমূল বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি। জিডিপিতে রাখতে পারে বড় অবদান।
তবে পর্যটনখাতের অপার এই সম্ভাবনায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্পটগুলোতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর সব ঘটনার মধ্য দিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্নটি আলোচনায় চলে এসেছে। বিশেষ করে, পর্যটনখাতের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র কক্সবাজারের বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের রয়েছে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি। অথচ অবহেলা, উদাসীনতা ও সঠিক পদক্ষেপের অভাবে দিন দিন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে বিশ্বের দীর্ঘতম সেই সৈকতটি। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে থেকে দেখা গেছে, কক্সবাজারে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আগের চেয়ে আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে। বিদেশি পর্যটকরা আগের মতো স্বতস্ফুর্তভাবে এখানে আর আসছেন না।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দুদিন আগে সপরিবারে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে গিয়ে এক নারী পর্যটকের দলবদ্ধ যৌনহয়রানির শিকার হয়েছেন। ঘটনাটি সারাদেশে সমালোচনার ঝড় তুলেছে। এমন অপ্রীতিকর ঘটনার মধ্য দিয়ে সাধারণ পর্যটকরা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছেন বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। অনেকেই নিরাপত্তার শঙ্কায় ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে সৈকত ত্যাগ করছেন। অথচ গেল সপ্তাহে এই সৈকতেই অন্তত চার থেকে ছয় লাখ পর্যটকের ভিড় জমেছিল। হোটেল, মোটেল, রিসোর্টে কক্ষ না পেয়ে অনেকে বাসে কিংবা রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করেও সময় পার করেছেন। আর একটি ঘটনাতেই নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কায় আনন্দ পরিণত হয়েছে বিষাদে।
এর আগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরেও এমন আরেকটি ঘটনার মধ্য দিয়েও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি উঠে এসেছিল। সে সময় কক্সবাজারে বেড়াতে এসে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছিলেন এক অস্ট্রেলিয়ান তরুণী। তিনি যে রিসোর্টে উঠেছিলেন সেখানকারই দুই ব্যক্তি জোর করে তার কক্ষে ঢুকে ধর্ষণের চেষ্টা চালিয়েছিল। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে ওই তরুণীর চিৎকারে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে গেলে পরে ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। বিষয়টি তখন অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন পর্যন্ত গড়িয়েছিল। সেই ঘটনায় পর্যটকদের মধ্যে বড় প্রভাব না পড়লেও এবারের ঘটনাকে সম্ভাবনাময় পর্যটনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেকে।
পাশের দেশ ভারতে ২০১৩ সালের মাঝামাঝিতে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। বেসরকারি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হয়ে ভারতে আসা আয়ারল্যান্ডের এক নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনার প্রভাবে ভারতে আশঙ্কাজনক হারে কমে যায় বিদেশি নারী পর্য়টকদের সংখ্যা। ভারতীয় বণিক গোষ্ঠী অ্যাসোচ্যামের এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে দেখানো হয়, বিদেশি নারী পর্যটক ধর্ষণের ঘটনার পরের বছরে দেশটিতে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা হ্রাস পায় প্রায় ২৫ শতাংশ। একই রকম ঘটনা ঘটেছিল মেক্সিকোতে। সেখানেও এমন ঘটনার পর নিরাপত্তহীনতায় পর্যটকের সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে।
স্থানীয় সূত্রমতে, দেশের পর্যটক আকর্ষণকারী স্থানগুলোতে নিরাপত্তার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। দিনদুপুরে চুরি, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। এতে বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকেরা সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতা বোধ করেন। পর্যটন শহরগুলোতে দেখা যায় হকারদের উৎপাতে পর্যটকরা একান্তে সময় কাটাতে পারে না। ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা হাতে কিছু ফটোগ্রাফার যেমন বিরক্ত করে তেমনি সাহায্য সহযোগিতার জন্যও হাত পাতে ভিখারিরা। ফলে পরিবারের সদস্য নিয়ে নিরিবিলি একান্ত সময় কাটানোর সুযোগ পাওয়া অনেক সময় দুরূহ হয়ে পড়ে।
পাঁচ লাখ মানুষের দেশ সার্কভূক্ত মালদ্বীপ পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে উঠেছে। ২০২০ সালে দেশটিকে ‘ওয়ার্ল্ড বেস্ট টুরিস্ট ডেসটিনেশন’ হিসেবে ঘোষণা করে ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অরগানাইজেশন। সে হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক পেছনে। পর্যটন শিল্পের জিডিপিতে প্রত্যক্ষ অবদানের ভিত্তিতে ১৭৬টি দেশের মধ্যে আমাদের পর্যটন শিল্পের অবস্থান ১৪২তম।
পর্যটন আয়ে পিছিয়ে দেশ
বাংলাদেশ বর্তমানে পর্যটনখাত থেকে বছরে আয় করে প্রায় ৭৬ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার। অথচ সার্কভুক্ত অন্য দেশগুলোর পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারতে পর্যটন খাত থেকে আয়ের পরিমাণ ১০ হাজার ৭২৯ মিলিয়ন ডলার, মালদ্বীপে ৬০২ মিলিয়ন ডলার, শ্রীলঙ্কায় ৩৮৫ মিলিয়ন ডলার, পাকিস্তানে ২৭৬ মিলিয়ন ডলার এবং নেপালে ১৯৮ মিলিয়ন ডলার। সার্কভুক্ত অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
সিঙ্গাপুরের জাতীয় আয়ের ৭৫ শতাংশ, তাইওয়ানের ৬৫ শতাংশ, হংকং এর ৫৫ শতাংশ, ফিলিপাইনের ৫০ শতাংশ, থাইল্যান্ডের ৩০ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। মালদ্বীপের অর্থনীতির বেশির ভাগই আসে পর্যটন খাত থেকে। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ৭ শতাংশই আসে পর্যটন খাত থেকে।
সরকারের পরিকল্পনা
ইতোমধ্যে সরকার কক্সবাজারকে নিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে। যার মধ্যে রয়েছে সাবরাং এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন, মোটেল উপলকে পাঁচতারকা মান দেওয়া, আন্তর্জাতিকমানের স্টেডিয়াম নির্মাণ, সরকারের বিভিন্ন খাসজমি পর্যটন খাতের উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করা, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর করার কাজ ইতোমধ্যে সরকার হাতে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চত করতে না পারলে পর্যটন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন দর্শনার্থীরা। তাই টুরিস্ট পুলিশে যথাযথ লোকবল নিয়োগের মাধ্যমে সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি মনিটরিং এখন সময়ের দাবি।
আনন্দবাজার/শহক









