
উত্তরের দারিদ্রপীড়িত জেলা নীলফামারী। কৃষি আর শ্রম বিক্রিই ছিল এই জেলার মানুষের জীবিকা অর্জনের একমাত্র পথ। নিম্নআয়ের মানুষ কয়েক বছর আগেও কাজের সন্ধানে কুমিল্লা, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছুটে যেতেন। অনেকে কাজের অভাবে অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাতেন। সংসারে ছিল নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। তবে উত্তরা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) চালু হওয়ার পর তাদের বেশিরভাগের সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা। ইপিজেডের বিভিন্ন কারখানায় চাকরি করে হয়েছেন স্বাবলম্বী। পাশাপাশি ইপিজেড এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন যেমন হয়েছে, তেমনি পরিকল্পনাও করা হচ্ছে মেগা উন্নয়নের।
এক সময়ের মঙ্গা অধ্যুষিত হিসেবে চিহ্নিত উত্তরাঞ্চলের অভাব আর মঙ্গা দূর করতে উদ্যোগ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০১ সালে নীলফামারী সদর উপজেলার সংগলশি ইউনিয়নে উত্তরা ইপিজেডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রায় ২১৩ দশমিক ৬৬ একর এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে এই রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা। এখানে ১৯০টির মধ্যে ১৫৪টি প্লটে ২৪টি দেশি–বিদেশি কোম্পানির কারখানা আছে। যার মধ্যে ১১টি কোম্পানিই বিদেশি। এগুলোতে কর্মসংস্থান হয়েছে ৪৩ হাজার মানুষের।
সংগলশি ইউনিয়নের সবুজ প্রকৃতির মধ্যে গড়ে ওঠা উত্তরা ইপিজেডে নেই শ্রমিক অসন্তোষ। নেই কোনো চাঁদাবাজি বা সহিংসতা। এখানে রয়েছে দক্ষ জনশক্তি, রয়েছে সুন্দর কর্মপরিবেশ। এ কারণে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন বেশি। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে কলকারখানা, বাড়ছে শ্রমিকের চাহিদাও। উত্তরা ইপিজেডে যেসব কোম্পানি রফতানিমুখী নানা পণ্য উৎপাদন করছে তাদের মধ্যে রয়েছে- এভারগ্রিন প্রোডাক্টস ফ্যাক্টরি (বিডি) লিমিটেড (হংকং) যারা তৈরি করছে উইগ ও হেয়ার সামগ্রী, ওয়েসিস ট্রান্সফরমেশন লিমিটেড (ব্রিটেন) কফিন, বাঁশ-বেত সামগ্রী, ম্যাজেন (বিডি) ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (চীন) সানগ্লাস, অপটিক্যাল ফ্রেম, ভেনচুরা লেদার ম্যানুফ্যাকচারিং (বিডি) লিমিটেড (চীন) লেদার ব্যাগ, মানিব্যাগ, ওয়ালেট, সেকশন সেভেন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (বাংলাদেশ) প্যান্ট-শার্ট, কোয়েস্ট এ্যাক্সেসরিজ লিমিটেড (বাংলাদেশ) হ্যাংগার, পলিথিন, সুতার কোন, গার্মেন্টস এ্যাক্সেসরিজ।
এছাড়া কেপি ইন্টারন্যাশনাল (বাংলাদশ) ও এসএ ইন্টারন্যাশনাল (বাংলাদেশ) তৈরি করছে সু্য়েটার, ফারদিন এ্যাক্সেসরিজ (বাংলাদেশ) তৈরি করছে হ্যাংগার, পলিথিন, সুতার কোন, গার্মেন্টস এ্যাক্সেসরিজ, সনিক বাংলাদেশ লিমিটেড (চীন) তৈরি করছে খেলনা, ডং জিন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (হংকং) উইগ, উত্তরা সুয়েটার ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড (চীন-হংকং) সুয়েটার, কার্টিগান এবং টিএইচটি-স্পেস ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি (চীন-সাংহাই) তৈরি করছে থার্মাল প্রিন্টার, ডট প্রিন্টার, বাইন্ডিং মেশিন, এনেন্ডডেন্স চেক-ক্লকসহ অনেক পণ্য।

স্থানীয় সূত্রমতে, উত্তরা ইপিজেড চালু হওয়ার পর থেকে নীলফামারীতে রাস্তা নির্মাণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। লাখো মানুষের জীবন বদলে গেছে। বেড়েছে জমির দাম। আজ থেকে ১০–১৫ বছর আগেও যেখানে প্রতি বিঘা জমি তিন থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি হতো, সেখানে এখন প্রতি বিঘা জমি ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানার কর্মীরা দলে দলে কেউ বাইসাইকেলে, কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ ইজিবাইকে, আবার কেউ হেঁটে ঢুকছেন ইপিজেডে। পেছন ফিরে তাকানোর সময় কারও নেই। সকাল আটটার মধ্যে প্রায় সব কারখানার কর্মীরা ঢুকে যান নিজ নিজ কর্মস্থলে। কাজের শেষে বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত একইভাবে বের হতে থাকেন বিভিন্ন কারখানার কর্মীরা। তখন চলে তাদের ঘরে ফেরার প্রতিযোগিতা।
কারখানায় কর্মরত শ্রমিকেরা বলছেন, এখানে বেতন, উৎসব ভাতা, মাতৃত্বকালীন সুবিধাসহ শ্রমিকদের পাওনা সঠিক সময়ে পরিশোধ করা হয়। এ কারণে এখানে শ্রমিক অসন্তোষ নেই। বিকেল তিনটার দিকে ইপিজেড গেটের সামনে জড়ো হতে থাকে ইজিবাইক, ভ্যান ও রিকশা। এ সময় কথা হয় ভ্যানচালক আজিনুর ইসলামের (৩৫) সঙ্গে। তিনি জানান, তার বাড়ি জেলা সদরের চড়াইখোলা ইউনিয়নের বেঙমারী গ্রামে। স্ত্রী কমলা বেগম প্রায় পাঁচ বছর ধরে ইপিজেডের একটি কারখানায় কাজ করছেন। প্রতিমাসে স্ত্রীর আয় হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। ইপিজেড তাদের বাড়ি থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন তিনি সকালে স্ত্রীকে দিয়ে যান এবং বিকেলে নিতে আসেন। স্ত্রীকে কারখানায় আনা নেওয়ার সময় ওই এলাকার অন্য শ্রমিকেরাও আসেন তার ভ্যানে। এতে আজিনুরের প্রতিমাসে বাড়তি আয় হয় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা।
জেলার জলঢাকা উপজেলার কাঁঠালী ইউনিয়নের পূর্ব কাঁঠালী গ্রামের রোজিনা আক্তার (২০) বলেন, এখানে চাকরি করে সংসার ভালোভাবে চলছে। নারীদের কর্মসংস্থান হয়েছে, মর্যাদাও বেড়েছে। ইপিজেডের পাশে গড়ে ওঠা মোল্লা ট্রেনিং সেন্টারের মালিক নূর ইসলাম বলেন, ইপিজেড ঘিরে এলাকায় কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। এখানে বেশ কিছু প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি বাড়িতে মেস রয়েছে। এসব মেসে পুরুষ ও নারী শ্রমিকেরা থাকেন।
ইপিজেডের এক কর্মকর্তা বলেন, এখানে ২১৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। প্রতিবছর এখান থেকে ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি পণ্য রফতানি হচ্ছে। কারখানাগুলোতে তৈরি পোশাক, পরচুলা, কফিন, চশমা, খেলনা গাড়ি, চামড়ার ব্যাগ, জুতাসহ নানা ধরনের পণ্য দেশে বিদেশে রফতানি হচ্ছে।
উত্তরা ইপিজেডের কারখানাগুলোতে চাহিদা সৃষ্টি হওয়ায় ইপিজেডের বাইরে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে বেশ কিছু শিল্পকারখানা। সেখানেও কাজ করছেন হাজার হাজার নারী–পুরুষ শ্রমিক। এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি মো. মারুফ জামান বলেন, উত্তরা ইপিজেডের ইতিবাচক প্রভাবে এ অঞ্চলে ব্যাপক কর্মসংস্থান হয়েছে। ইপিজেডকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাতে করে পরোক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে।
ইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক মোছাম্মৎ নাহিদ মুন্সি বলেন, এ অঞ্চলের মানুষ অনেক শান্তিপ্রিয়, কর্মদক্ষ ও বিনয়ী। এ কারণে দেশি–বিদেশি উদ্যোক্তারা এই ইপিজেডের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন বেশি। স্থানীয় সাংসদ আসাদুজ্জামান নূর সার্বক্ষণিক ইপিজেডের খোঁজখবর রাখেন। নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন নাহার বলেন, বেকার সমস্যা দূরীকরণে উত্তরা ইপিজেড ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান নূর এমপি বলেন, ২০০১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে আমরা যখন বিরোধিদলে গেলাম, তখন আট বছর এই ইপিজেড বন্ধ ছিল। ২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর এই ইপিজেড নতুন করে জীবন ফিরে পায়। ইপিজেডের কারখানাগুলোর ৬০ শতাংশ শ্রমিকই নারী। এই নারীদের উন্নয়নে আমাদের অর্থনীতিতে একটা বড় উন্নয়ন হয়েছে।
আনন্দবাজার/শহক








