টিসিবির পণ্য---
নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে এমনিতেই তাল রাখতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। তার ওপর রজমানকে সামনে রেখে তৈরি করা হচ্ছে কৃত্রিম সংকট। অনেক পণ্যের দাম হু হু করে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ঠিক এমন এক পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া ও শস্যদানা উৎপাদক ও রপ্তানিকারক ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর দিনেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের লাগাম ছাড়া হয়ে যায়। তাছাড়া খাদ্যশস্যের বিশ্ববাজারও অনেকটা টালমাটাল। যার প্রভাব পড়েছে দেশে দেশে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাইকারী বাজার খাতুনগঞ্জেও নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে।
বিশ্ববাজার আর স্থানীয় বাজারে পণ্যের দামে অস্থিরতার কারণে কম ও ন্যায্যমূলে পণ্য কেনার জন্য সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দিকে ঝুঁকছে সাধারণ মানুষ। নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও দাড়াচ্ছেন টিসিবির পণ্যের ট্রাকের পেছনে। এতে টিসিবির পণ্যের চাহিদা ইতোমধ্যে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। সরবরাহকরা পণ্য নির্দিষ্ট সময়েই আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। পেছনে দীর্ঘ লাইন রেখেই অনেক ট্রাক স্থান ত্যাগ করছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর খালি হাতে ফিরে যাওয়া মানুষের মধ্যে ক্ষোভও তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঙ্কুলান হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে মানুষ ছুটছেন টিসিবির ট্রাকের পেছনে। অথচ টিসিবির পণ্য বিক্রির আওতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে না। একটি ট্রাকের পেছনে যে সংখ্যক মানুষ দাঁড়াচ্ছেন তাতে সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে পণ্য। এতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো মানুষের তিন ভাগের এক ভাগও পণ্য কিনতে পারছেন না। বাজারে আমদানি ও ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামের ফারাক কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিসিবির গ্রাহকের লাইন ছোট করতে হলে বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মধ্যবিত্তের অনেকেরই ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। যে কারণে টিসিবি ট্রাকের পেছনে নিম্ন-মধ্যবিত্তরাও দাঁড়াচ্ছেন। যত সংখ্যক লোক টিসিবির পণ্য কেনার জন্য আগ্রহী, তার অল্প সংখ্যক মানুষই কিনতে পারছেন। তাই পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি আয়বর্ধক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
সারাদেশের সব মহানগর, জেলা, উপজেলায় ডিলার পয়েন্টে ভ্রাম্যমাণ সাড়ে চারশ ট্রাকে করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করছে টিসিবি। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে- পেঁয়াজ, মসুর ডাল, চিনি ও সয়াবিন তেল। রাজধানী ঢাকাতে পণ্য বিক্রি করছে ১০১টি ট্রাক। প্রতিটি ট্রাকে বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার পাঁচশ কেজি করে। যার মধ্যে ৬০০ লিটার সয়াবিন তেল, ৪০০ কেজি ডাল, ৫০০ কেজি চিনি এবং এক হাজার কেজি পেঁয়াজ থাকছে।
একজন ক্রেতা টিসিবির ট্রাক থেকে সয়াবিন তেল দুই লিটার, চিনি ও মসুর ডাল দুই কেজি এবং পেঁয়াজ সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি কিনতে পারেন। প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা, মসুর ডাল প্রতি কেজি ৬৫ টাকা, চিনি ৫৫ টাকা, পেঁয়াজ ৩০ টাকা করে। অন্যদিকে খোলা বাজারে তেলের মূল্য ১৬৮ টাকা, মসুর ডাল ১০০ টাকা, চিনি ৮০ টাকা এবং পেঁয়াজ ৩৮ টাকা। টিসিবির ক্রেতারা সয়াবিন তেলে ৫৮ টাকা, মসুর ডাল ও চিনিতে ৩৫ টাকা এবং পেঁয়াজে ৮ টাকা করে ছাড় পাচ্ছেন।
টিসিবির ট্রাকের আশপাশের কয়েকজন ব্যবসায়ীর আলাপকালে তারা জানান, সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন টিসিবর ট্রাক আসে। তবে প্রতিদিনই ভিড় থাকে মানুষের। সরবরাহ করা পণ্যের তুলনায় চাহিদা থাকে কয়েকগুণ। যারা অনেক ভোরে এসে লাইনে দাঁড়ান তারাই পণ্য নিয়ে বাসায় ফিরতে পারেন। যাদের আসতে দেরি হয়, তাদের অনেকেই পণ্য না পেয়ে ফেরত যান। কার আগে কে পণ্য কিনবেন তা নিয়ে কখনও কখনও হৈ হট্টগোল বাঁধে। তখন বেচাবিক্রি বন্ধ রেখে ট্রাক ফিরে যায়। এতে ভোগান্তি বাড়ে কয়েকগুণ।
রাজধানীর কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ৬১০ টাকার প্যাকেজ ধরে টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। এতে অনেকেই পণ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে যারা ট্রাকে পণ্য কিনতে আসছেন, তারা এক সঙ্গে এত টাকার পণ্য কিনতে পারছেন না। মলিন মুখে তাদের অনেককে ফিরতে হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ট্রাকের পণ্য অনেকাংশই চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেলের কবলে। এতে সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও পণ্য পাচ্ছেন না প্রকৃত দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্তরা।
টিসিবির পণ্য কেনায় সক্রিয় সিন্ডিকেটের ব্যাপারে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। টিসিবির পণ্য বাইরে কোথাও বিক্রি করার সুযোগ নেই।
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম উপবিভাগের উপপরিচালক আফরোজা রহমান দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, টিসিবির পণ্য নিয়ে কোনো ধরনের প্রতারণা করার সুযোগ নেই। গ্রাহকের অধিকার নষ্ট করে পণ্য কেনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। টিসিবির পণ্য বাইরে পাওয়ায় ইতোমধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ অভিযান চলমান থাকবে।
টিসিবির পণ্য না পেয়ে প্রতিদিনই প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ ফেরত যাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে সরবরাহ বাড়ানো হবে কিনা সে ব্যাপারে জানতে চাইলে ঊর্ধ্বতন কার্যনির্বাহী ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, আগে দুই হাজারথেকে দুই হাজার ২০০ কেজি সরবরাহ করা হতো। এখন এলাকা ভেদে দুই হাজার ৫০০ কেজি পর্যন্ত সরবরাহ করা হচ্ছে। আগে সরকারি ছুটির দিনে পণ্য সরবরাহ বন্ধ ছিলো। তবে এখন থেকে শনিবারেও তা চলবে। পর্যাপ্ত পণ্য মজুত রয়েছে। তবে পণ্য আনা ও বিক্রি চলমান থাকায় মজুতের পরিমাণ নির্ধারণ করা যাচ্ছে না বলে জানান হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, যারা পণ্য না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে, তাদের অধিকাংশই একাধিকবার করে পণ্য কেনেন। যে কারণে অনেকেই পণ্য পাচ্ছেন না বলেও জানতে পারছি।
সম্প্রতি রাজধানীর খামারবাড়ি, বিজয়স্মরণি এবং রামপুরা এলাকা ঘুরে টিসিবির কোনো ট্রাকের সন্ধান পায়নি আনন্দবাজার। গত বুধবার কাওরানবাজার এলাকাতে কোনো ট্রাক চোখে পড়েনি। এ বিষয়ে তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, বন্ধ থাকা ট্রাক পরদিন থেকে চালু হবে।
রমজানকে সামনে রেখে রমজান পণ্যের পরিমাণ বাড়ানো হবে জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, এক কোটি মানুষকে কম দামে টিসিবির পণ্য দেওয়া হবে। তাদের টিসিবির কার্ড দেওয়া হবে। কার্ডধারীরা পণ্য কিনতে পারবেন। ঢাকার বাইরে কার্ড দেওয়ার কার্যক্রম চালু করা হবে। তবে ঢাকায় চলমান পদ্ধতিতেই লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনতে পারবেন ক্রেতারা। সে ক্ষেত্রে বিক্রি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকবে।
সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় আপদকালিন মজুদ গড়ে তোলাসহ প্রয়োজন অনুযায়ী ভোক্তাদের মধ্যে সাশ্রয়ী দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করার কথা টিসিবির। তবে দ্বিগুণেরও বেশি চাহিদা থাকলেও সরবরাহ সে অনুযায়ী বাড়ায়নি সংস্থাটি।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমের বিষয়ে জানতে টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আরিফুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তবে চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব কামাল খান দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে কোনো ধরনের তথ্য দেয়ার অনুমতি আমার নেই। তবে চাহিদার আলোকে সরবরাহ বাড়ানোর জন্য চেয়ারম্যান মহোদয় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। খুব শিগগিরই সিদ্ধান্ত জানা যাবে।









