গাজর-শিম-টমেটোর দাপট, কেজি ১৬০ টাকায়!
- কাঁচা মরিচের দামে ভাটা
- ডিম-মাছ-মুরগিতে স্বস্তি
বেশকিছু সবজির দাম বাড়ছেই। তবে দাম বেড়ে যে আকাশে উড়বে আর নামবে না এমনটা ভাবনা ছিল না কারো। যেমনটা দেখা যাচ্ছে চোখ ধাঁধানো রঙিন সবজি গাজরের ক্ষেত্রে। গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে দাম বাড়ার শীর্ষে দেখা গেছে। সেই পথেই হাঁটছে বনেদি সবজি টমেটো আর শিম। সপ্তাহের শুরুতেই চড়া দামের তালিকার শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে তারা। দাম কমে যে মধ্যবিত্তের নাগালে আসবে এমন আলামত মিলছে না। যদিও স্বস্তির খবরও দিচ্ছে অধিকাংশ সবজি। আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। চড়াও হয়ে সাধারণ ক্রেতার অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি।
সপ্তাহের শুরু থেকেই সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে গাজর। সেই গাজর সপ্তাহের শেষে হাঁকিয়েছে প্রতি কেজি ১৬০ টাকা। একই হাঁকডাক টমেটো ও শিমেরও। সপ্তাহের শেষে এসেও সবজিগুলোর দাম বাড়ার পাঁয়তারা প্রতিনিয়ত। অপরদিকে কাঁচা মরিচের দাম নেমেছে অর্ধেকের নিচে। বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মরিচের ঝাঁজ কমলেও ডিম, মুরগির ও মাংসের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। পাশাপাশি মাছের দামে তেমন পরিবর্তন আসেনি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।
এদিকে, মূলত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই চড়া সবজির বাজার। প্রায় সব সবজির দামই কমবেশি বেড়েছে। গত ৫ আগস্ট রাতে দেশে জ্বালানি (ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, কেরোসিন) তেলের দাম লিটারে ৪২ থেকে ৫২ ভাগ পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার। তার দুই-এক দিন পর থেকেই তার প্রভাব পড়ে রাজধানীর কাঁচাবাজারে। সম্প্রতি জ্বালানির দাম লিটারে পাঁচ টাকা করে কমিয়েছে। গত সোমবার মধ্যরাত থেকে এই দাম কার্যকর হয়। জ্বালানির দাম কমলে তার প্রভাব পড়েনি সবজির বাজারে।
পাইকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, ৫ আগস্টে জ্বালানি নতুন দাম কার্যকরের পর ট্রাকভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সবজির কেজিতে ২ টাকা বেশি গুনতে হয়েছিল। তবে খুচরা বাজারে যেভাবে বেড়েছিল, সেটা রীতিমতো অন্যায়। সম্প্রতি সরকার জ্বালানির দাম কমিয়েছে। পূর্বে জ্বালানির দাম বেড়েছিল সর্বোচ্চ ৫২ টাকা। কিন্তু কমিয়েছে ৫ টাকা। যেটা বাড়ানোর তুলনায় কমানো খুবই সামান্য। যা বাজারে কমার ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখবে না। এটাই স্বাভাবিক।
সামনে সবজির দাম আরো বাড়তে পারে এমন আভাস দিয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, কারণ সামনে শীতের সবজি মৌসুম আসছে। সেখানে শীতের সবজি বীজ বপন করা হয়েছে। কেবল চারাগুলো গজিয়েছে। এমন সময় দেশের উত্তর বঙ্গের বন্যা পরিস্থিত চরমে। এতে রাজশাহী, নীলফামারী, লালমনিরহাট, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রামের প্রায় অর্ধশত উপজেলায় পানিতে তলিয়ে গেছে। ওইসব উপজেলার কৃষি জমিগুলো বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নষ্ট হয়েছে তাদের জমির ফসল। তার প্রভাব আমাদের কাঁচা বাজারে পড়বে। ধারনা করছি, পূর্বের চেয়ে সবজি সরবরাহ কমবে। আর সরবারাহ কমলে অবশ্য সবজির দাম বাড়বে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, পাইকারি বাজারের তুলনায় খুচরা বাজারের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা। বেশকিছু সবজিতে পার্থক্য আরো দ্বিগুন। আরো তথ্য পাওয়া যায়, গাজরের সঙ্গে দাম বাড়ার জোট বেঁধেছিল টমেটো ও শিম। বাজারে নিম্নবিত্তের নাগালের বাইরে থাকার চেষ্টা করছে। মাঝখানে অবশ্য হঠাৎ দামের লাগাম ঢিলে হয়ে পড়ে। তবে সেটা ছিল সাময়িক। তবে যাই হোক দামের দাপট ধরে রেখেছে গাজর।
ব্যবসায়ীরা যুক্তি দিচ্ছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। উত্তর বঙ্গের বন্যা কারনে সবজি সামনে দাম আরো বেড়ে যাবে এমন আভাস দিচ্ছেন বিক্রেতারা। তবে রাজধানীর ব্যবসায়ীদের যুক্তির সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না মফস্বলের ব্যাখ্যা। কৃষি পর্যায়ে যে পণ্য ২০ টাকা কেজি রাজধানীতে এলেই তা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
সরকারের বিভিন্ন কঠোর তদারকিও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। এদিকে প্রায় সবজির বাজার আগের সপ্তাহ থেকে গেল সপ্তাহের চড়া দামের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে মিল নেই কমানোর সমন্বয়। ফলে প্রভাবে পড়েনি বাজারে। শিম ও টমোটো প্রতি কেজিতে বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকা ওপরে। চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে অন্য সব সবজি। বর্তমানে ৪০ টাকার নিচে মিলছে না কোনো ভালো সবজি।
রাজধানীর কাওরান বাজার, কাপ্তান বাজার, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব সবজিই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। স্থান ভেদে প্রতি কেজি দামে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। চড়া দাম প্রসঙ্গে কাপ্তান বাজারের সবজি ব্যবসায়ী ফকির চাঁন বলেন, শিমের মৌসুম না। কিন্তু বাজারে চাহিদা রয়েছে। চাহিদা থাকায় শিমের দাম চড়া। সামনে আরো বাড়বে। তবে মৌসুম বাজারে এই সবজির দাম কমে যাবে।
আরেক ব্যবসায়ী আবেদ আলী বলেন, চাহিদার তুলনায় কম টমোটো বাজারে রয়েছে। যেহেতু বাজারে সরবরাহ কম, সেহেতু দাম বেশি এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে বাজারে টমোটো প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা। সবজির দাম প্রসঙ্গে যাত্রাবাড়ী বাজার করতে আসা ক্রেতা রনেট সাহা বলেন, টমেটোর দাম অনেক বেশি। আর গাজরে তো আগুন। ছোয়াই যায় না। প্রতি কেজি গাজরে গুনতে হচ্ছে ১৬০ টাকার ওপরে।
এদিকে, গতকাল শুক্রবার প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১২০ টাকায়। এছাড়া বটবটি ও বেগুন বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকায়। সবজির দাম কমার প্রসঙ্গে কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী আমজাদ রহিম বলেন, কাঁচা বাজারে সবজির চাহিদার বেশি। কিন্তু সরবরাহ কম। তাই সবজির বাজার কিছুটা বাড়তি। তবে অধিকাংশ সবজি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দাম অপরিবর্তিত। তবে সরবরাহ বাড়লে দাম কমবে।
ক্রেতা জাকির হোসেন দুই বাজার ঘুরে মুরগি কিনেছেন। তাতে দামে পার্থক্য খুব একটা না। তিনি কাঁটাবন বাজারে সোনালি মুরগি কিনতে গেলে বিক্রেতা দাম হাঁকান ৩১০ টাকা কেজি। পাশ্ববর্তী আরেকটি বাজারে ৩০০ টাকা। শনিরআখরা বাজারের মাংস ব্যবসায়ী রহমান। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় গরুর মাংস কেজিতে কত বাড়লো? তিনি জানান, কিছুটা কমতি। কেননা কোরবানির ঈদের সময় ৭৫০ টাকা করে বিক্রি করেছি। এখনো বিক্রি করছি ৭০০ টাকা। সেগুন বাগিচা কাঁচা বাজারে রিয়াজ হোসেন বলেন, মুরগির ডিম ডজনে ১২০ টাকা। তাদেরও বিক্রি কম।
গত সপ্তাহে ডিমের দাম কমে ডজনে ১২০ টাকায় নেমে আসে। বর্তমানে এই দামেই বিক্রি হচ্ছে ডিম। ডিমের পাশাপাশি অপরিবর্তিত রয়েছে মুরগির দাম। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ব্রয়লার মুরগির কেজি বিক্রি করছেন ১৮০ টাকায়। আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর মুরগির কেজি ২০০ টাকা উঠেছিল। ব্রয়লার মুরগির পাশাপাশি অপরিবর্তিত রয়েছে পাকিস্তানি কক বা সোনালী মুরগির দাম। বর্তমানে মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন খোলাবাজার সূত্রে জানা যায়, খুচরা বাজারে সিমের প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। গাজর বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা। তবে দেশি গজর ১২০ টাকা। টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা। শসা ৭০ টাকা কেজি। কাঁচা মরিচের প্রতি কেজি ৫০ টাকা। ঢেঁড়শের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। শনিরআখড়া সবজি বিক্রেতা জব্বার বলেন, বাজারে সবজির দাম ওঠানামা করছে। তবে সরবরাহ কমের কারনে আগের তুলনায় কিছু সবজির দাম বেড়েছে।
সপ্তাহের ব্যবধানে দাম অপরিবর্তিত রয়েছে পেঁয়াজ ও আলুর। পেঁয়াজ গত সপ্তাহের মতো কেজি প্রতি ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলুর কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। এছাড়া শসা ৭০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা, পেঁপের ৩০ টাকা, ঢেঁড়শ ৪০ টাকা, ঝিঙা ৫০ টাকা, পটল ৪০ টাকা, বেগুন ৭০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ৫০ টাকা, টমেটোর ১২০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, কাঁকরোল ৬০ টাকা এবং কাঁচা পেঁপ ৩০ টাকায় কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। কচুর লতি, ঝিঙে, চিচিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৫০ টাকায়। এছাড়া প্রতিটি ফুলকফি ৫০ টাকা, পাতাকফি ৫০ টাকা এবং লাউ ৬০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।
রুই মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকা। তেলাপিয়া, পাঙাস মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ২০০ টাকায়। শিং মাছের কেজি ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। আর ২০০ তেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে কৈ মাছের কেজি। পাবদা মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০-৫০০ টাকা। মাছের মধ্যে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে চিংড়ি ও ইলিশ। চিংড়ির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। এক কেজি ওজনের ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১০০০ থেকে ১৩০০ টাকা। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ৭৫০ থেকে ১০০০ টাকা। আর ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা।









