- ওষুধেও কাজ হচ্ছে না, শঙ্কায় চাষিরা
- লাভজনক কলা লোকসানি ফসল
- ঋণ নেওয়া কলাচাষিরা চরম বিপাকে
ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথমে কলা গাছের পাতা হলুদ হয় যায়। তারপর ধীরে ধীরে গাছ নিস্তেজ হয়ে মারা যায়। বর্তমানে ভাইরাসটির সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারন করছে। চাষিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়াঞ্চলের লাল-ধুসর মাটি কলা চাষের জন্য বেশ উপযোগী। মাটির উর্বরতার পাশাপাশি অনুকূল আবহাওয়া কলার উৎপাদনকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এতে এ অঞ্চলের অধিকাংশ কৃষক আনারসের পাশাপাশি কলা চাষের প্রতি অনেকটাই আগ্রহী। কেউ কেউ আনারস বাগানের পাশেই করেছেন বিভিন্ন জাতের কলার চাষ। কম খরচ ও স্বল্প শ্রমে লাভের মুখ দেখেন এ অঞ্চলের কলা চাষিরা।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে আনারসের পরেই কলাচাষের প্রতি আগ্রহ ছিল চাষিদের। অনেকের ভাগ্যের চাকাও ঘুরেছে। কলা গাছের পরিত্যাক্ত অংশও যাচ্ছে স্থানীয় কারখানায়। তৈরি হচ্ছে সুঁতা ও শো-পিচ। হঠাৎ অজ্ঞাত ভাইরাসের আক্রমণে সেই সম্ভাবনাময় কলাচাষে অনাগ্রহ বেড়েছে এ অঞ্চলের কৃষকদের।
কলা চাষিরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে ৩৫০ থেকে ৩৮০টি কলা গাছ রোপন করা হয়। ১টি কলা গাছে রোপন থেকে বাজারজাত পর্যন্ত খরচ হয় প্রায় ১২০ থেকে ১৯০ টাকা। প্রতিটি কলার ছড়ি বিক্রি হয় প্রায় ৩২০ থেকে ৪৩০ টাকা। এতে প্রতি বিঘাতে কৃষকের গড়ে লাভ হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
গেলো বছর উপজেলার প্রায় ১০ হাজার একর জমিতে কলা চাষ হয়েছিল। কৃষকদের অনাগ্রহে এবারে কলা চাষ হয়েছে ৭ হাজার হেক্টর জমিতে। সাগর, চম্পা, কবরি, সবরি, বিচিকলা, আনাজকলাসহ বিভিন্ন জাতের কলা পাওয়া যেতো মধুপুরে। কলা পুষ্টিকর ফল হওয়াতে এর চাহিদাও ছিল যথেষ্ট। জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য জেলাতেও এ অঞ্চলের কলা রপ্তানি হতো। তবে, বর্তমানে কলা চাষের প্রতি চাষিরা ক্রমশ অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। বিপর্যয় নেমেছে কলাচাষে।
স্থানীয় কলা চাষিরা জানান, অজ্ঞাত একধরণের ভাইরাসের (পানামা) আক্রমণে কলাগাছের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথমে কলা গাছের পাতা হলুদ হয়। অতঃপর ধীরে ধীরে কলা গাছ নিস্তেজ হয়ে মারা যায়। এ ভাইরাসটি বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারন করছে কলাচাষে। প্রথমে দুচারটি গাছ আক্রান্ত হলেও দ্রুত পুরো বাগানে ছড়িয়ে পড়ে অজ্ঞাত (পানামা) ভাইরাস। এতে এ অঞ্চলের কলা চাষিরা লোকসানের মুখে পড়েছেন।
মধুপুর কলাচাষি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সহ-সভাপতি সার্জেন্ট (অব.) মতিয়ার রহমান গোলাম কিবরিয়া বলেন, আমি গত বছর ৩০ বিঘা জমিতে কলা চাষ করেছিলাম। এতে আমার লোকসান হয়েছিল ১৮ লাখ টাকা। আমাদের সংগঠনের অনেক সদস্যদের লাখ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নেয়া কলা চাষিরা ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। লোকসানের মুখে পড়ে আমি এ বছর কলা চাষ করিনি। নতুন করে পুঁজি সংগ্রহ করার সামর্থ্যও আমার নেই। কলা চাষে লোকাসানের কারণে ওইসব জমিতে এবার অন্য ফসল আবাদ করছি। তিনি আরও বলেন, এ অঞ্চলের কৃষকদের প্রায় ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। বাগানের পর বাগান নষ্ট হয়েছে।
কলাচাষি হারুন বলেন, কলা চাষে লাভ আছে। তবে পাতামড়া ও গাছ হলুদ হয়ে মারা যাওয়ার জন্য আমাদের ক্ষতি হয়েছে। এ রোগে কলাচাষিরা লোকসানের মুখে পড়ে কলা চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। আমরা মধুপুরের বনাঞ্চলে বন বিভাগের জমিতে কলা চাষ করি বলে আমরা ব্যাংকলোন থেকেও বঞ্চিত। পানামা রোগ নিয়ে কৃষি বিভাগের চেষ্টা আমাদের কলা চাষিদের কাজে আসেনি। কলা আসার আগেই আমাদের অধিকাংশ কলা গাছ মারা গেছে।
কলা চাষি তাইজুল ইসলাম বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে কলা চাষ করি। এ বছর কলা গাছের পাতামড়া ও কলাগাছ পচে যাওয়ায় রোগটা ভয়াবহ আকার ধারন করছে। যার ফলে অনেকে কলা চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। অধিকাংশ কলা গাছ মারা যাচ্ছে। কোনো ঔষধ কাজ আসছে না। আমরা কৃষি বিভাগের সঠিক পরামর্শ চাই। তা না হলে কলা চাষে এমন বিপর্যয় চাষিদের অস্তিত্বে হানা দিবে। কলাচাষ না হলে সোনালি আঁশ(বেনেনা জুট) উৎপাদন কম হবে, কর্মসংস্থান কমে যাবে। পানামা ভাইরাসের প্রতিকার না হলে কৃষক কলা চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে।
মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আল-মামুন রাসেল জানান, আমরা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কৃষকদের সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাচ্ছি। মূলত একই জমিতে বার বার কলা চাষ করায় মাটির জৈব উপাদান কমে যাচ্ছে। এতে ফসল উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। অতিরিক্ত মাত্রায় কীটনাশকের ব্যবহার, ভালো বীজ সংগ্রহ না করা ও বীজ শোধন করে রোপন না করার ফলে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এজন্য আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সঠিক পরামর্শ, জৈবসার ব্যবহার ও কলা চাষে ফুডব্যাগিং পদ্ধতিতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কাজ করে যাচ্ছি।









