- প্রণোদনার পাশাপাশি প্রয়োজন ঋণ ও ট্যাক্স মওকুফ
- রাজশাহীর ৩০০ মিলের মধ্যে টিকে আছে ৩০
- চাহিদার ৭০ ভাগই সরবরাহ হতো পুঠিয়া থেকে
ঋণের দায়ে কারো জমি নিলামে, কেউবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, আবার কাউকে ঘুরতে হচ্ছে আদালতের বারান্দায়। বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান কমদামে ডাল আমদানি করায় টিকতে পারছে না দেশীয় ব্যবসায়ীরা।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বেরে এক এক করে গড়ে উঠেছিল ৩০০টি ডাল মিল। এ সব মিলে কর্মসংস্থান হয় স্থানীয় ৩০ হাজার মানুষের। শুধু তাই নয়, ওইসব ডালমিল থেকে দেশের চাহিদার ৭০ শতাংশ ডাল সরবরাহ করা হতো। শিল্পপ্রতিষ্ঠান কম থাকা রাজশাহীতে ডালমিলগুলো দেখাতে শুরু করে আশার আলো। তবে সেই আশা বেশিদিন টেকসই হয়নি। এখন সেখানে মাত্র ৩০টির মতো ডালমিল চালু রয়েছে, তাও নিয়মিত নয়। আর মিলগুলোর দুরাবস্থা দেখে কৃষকেরাও এ অঞ্চলে ডাল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন।
বানেশ্বরের একাধিক ডালমিলের মালিক জানান, পরিকল্পনার অভাবে বিদেশ থেকে ডাল আমদানি ও গুটি কয়েক বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের মুনাফামুখি প্রবণতার কারণে রাজশাহীর ছোট পরিসরের এ ডালমিলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ৪ বছর আগে এ ডালমিল মালিকদের কপাল পোড়া শুরু হয়। ৫০ কেজি ডাল দেশের বাজার থেকে ৬ হাজার টাকায় কিনে সেই ডাল দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে ডালমিল মালিকেদের। এখানেই শেষ নয়, ডাল ব্যবসায়ীদেরকে সুকৌশলে প্রলোভন দেখিয়ে ব্যাংকগুলো ঋণ ধরিয়ে দিয়েছে। যার ১০ লাখ টাকা দরকার ছিল, তাকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ ধরিয়ে দেয়া হয়। সামলে উঠতে পারবে এমন ভরসায় ব্যবসায়ীরাও ঋণ নিয়েছিলো। এখন ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া। ঋণের দায়ে কারো জমি নিলামে উঠেছে, কেউবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, আবার আদালতের বারান্দায় কাউকে প্রহর গুণতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন চাপ। ঋণগ্রস্থ এ্যকাউন্টগুলোর ওপর ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা ট্যাক্সের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।
বানেশ্বরের সালাম-কালাম ডাল মিলের সত্ত্বাধিকারী মো. সালাম বলেন, লোকসানের কারণে মিল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। উন্মুক্ত বাণিজ্যের নামে দেশের ডাল ব্যবসায় ধস নেমেছে। ৫০ কেজি ডাল ৬ হাজার টাকয় কিনে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। ঋণের দায়ে ডুবেছি। এখন বাঁচতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। সুদ মওকুফ করে দিলে, হয়তো মূল টাকাগুলো শোধ করতে পারতাম। একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে, সুদ সমেত এখন সেই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা। এর সঙ্গে আবার নতুন করে ট্যাক্স ধার্য্য করা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ টাকা। যেখানে ঋণের টাকা দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে এ ট্যাক্সের টাকা মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিসমিল্লা ডাল মিলের সত্ত্বাধিকারী ও ডালমিল সংগঠনের সভাপতি মো. শাজাহান বলেন, ২০১৫ সাল থেকে ধস নামে দেশীয় ডালের বাজারে। বিদেশি ডাল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি। দেশের ডালের থেকে যা ২৫ থেকে ৩০ টাকা কম। বানেশ্বরের ৩০০ মিলের মধ্যে এখন ৩০টা মিল ধুকে ধুকে চলছে। তাও নিয়মিত না। সিটি, মেঘনা ও বসুন্ধরা গ্রæপের মতো প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ডাল আমদানি করছে। এর পর তা কেজি হিসেবে গ্রামে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে। তাদের কাছে আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীরা টিকতে পারছে না। বাধ্য হয়ে ডালমিল বন্ধ করতে হয়েছে। তবে এর মাঝে নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখতে ঋণ করতে হয়েছে। ব্যবসা না থাকলেও এখনও সেই ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
বিসমিল্লাসহ রাকিব বাবু ডালমিল, বদি চেয়ারম্যানের ডালমিল, আদর্শ ডালমিল, আয়নাল হক ডালমিল, জাহিদ ট্রেডার্সের ডালমিলসহ বানেশ্বরের রাস্তার ধারে যতগুলো মিল ছিল সবগুলোই এখন বন্ধ। মিলগুলোতে ঘাস গজিয়েছে। বানেশ্বরের ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত লোন ধরিয়ে দিয়েছে। যার ১০ টাকা ঋণের দরকার ছিল তাকে ১০০ টাকা দিয়েছে। প্রণোদনাসহ সুদ মওকুফ ও ট্যাক্স মওকুফ না হলে ঋণের বোঝা নিয়ে আমাদেরকে আত্মহত্যা করতে হবে। আমরা কার কাছে যাবো! কাকে বলবো আমাদের দু:খের কথা! কে আমাদেরকে সমাধান দিবে!
বেলপুকুরের চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বদি বলেন, আমার পরিবারের ৩টা মিল ছিল। সবগুলোই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। এক সময় ডালমিলগুলোতে ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতো। এখন মিলের কর্মচারীদের থেকেও খারাপ অবস্থা মিল মালিকদের। অপরিকল্পিভাবে বিদেশী ডাল আসছে। সেই সঙ্গে রয়েছে ব্যবসায়ীদের অসম প্রতিযোগীতা। ব্যাংকঅলারা ব্যবসায়ীদের প্রলোভন দেখিয়ে অতিরিক্ত ঋণ দিয়েছে। এখন সেই ঋণের বোঝায় দেউলিয়া ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে পুঁজি হারিয়ে ফেলেছে ব্যবসায়ীরা। চামড়া ব্যবসার মতো দেশের ডাল ব্যবসাতেও ধস নেমেছে। ব্যাংকগুলো যদি ঋণগ্রস্তদের এ্যকাউন্ট বøক করে সুদ মাফ করে, নতুন করে স্বল্প সুদে ঋণ দেয় তাহলে ব্যবসায়ীরা মূল টাকাটা ব্যাংকগুলোকে ফিরিয়ে দিতে পারতো।
জেলা পরিষদের সদস্য ও স্থানীয় একটি ডালমিলের মালিক মাসুদ জানান, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ডাল মিলের ব্যবসা করার সাহস পাচ্ছি না। মাসুদ নিজেও তার ডাল মিল বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। ২০১৫ সালের পর ডাল ব্যবসায় ধস নামে। ব্যাংকের দায়-দেনায় মিলগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ডালের দামকমে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধ দূরের কথা মিল চালানোই সম্ভব হচ্ছে না।
বানেশ্বর ডাল ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও হাওয়া গ্রুপের স সত্ত্বাধিকারী ওবায়দুর রহমান বলেন, ব্যাংক ঋণে জর্জরিত হয়ে এখন আমরা পুঁজিহারা। রাজশাহীতে দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে এ ব্যবসা বিকশিত হয়েছে। সারাদেশের ৭০ শতাংশ ডাল এখান থেকে সরবরাহ করা হত। ২০ থেকে ৩০ টা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দিয়ে শুরু হয়ে এক পর্যায়ে ৩০০ তে দাঁড়ায় ডালমিলের সংখ্যা। সালাম-কালাম, যারযিশ এর মতো প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রস্ত হয়ে এখন ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নিলামে উঠেছে। এর ওপর আবার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ইনকাম ট্যাক্স আরোপ করা হয়েছে।
মান নয়, দামের কারণে দেশে উৎপাদিত ডাল বিদেশ থেকে আমদানি করা ডালের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। দেশীয় ডাল যেখানে ৮০ টাকা সেখানে আমদারি করা ডালের সাথে এ ডালের দামের ফারাক ২০ থেকে ৩০ টাকা। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউক্রেন, তুরস্ক, তানজেনিয়া, মুজামবিক, মায়ানমার থেকে আসছে আমদানি করা ডাল। দাম না পাওয়ায় কৃষকও ডাল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এক সময় এ ডালমিলের মাধ্যমে স্থানীয় ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ শিল্পটাকে ধরে রাখতে হলে বা ব্যবসায়ীদের প্রাণরক্ষা করতে চাইলে প্রণোদনার পাশাপাশি ঋণ ও ট্যাক্স মওকুফের প্রয়োজন।
আনন্দবাজার/এম.আর









