বৃষ্টিপাত কম। দেশের গড় বৃষ্টিপাতের অর্ধেক উত্তরাঞ্চলে। দেড় হাজার ফুট নিচেও মিলছে না ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। স্থলে শুকিয়ে গেছে ৮৫টির বেশি নদ-নদীর পানি। সেচ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট উত্তরাঞ্চলের বছরের পর বছর বেড়েই চলেছে। উত্তরাঞ্চল নানান কারণে পানির ভারসাম্য হারাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ দিনে দিনে বাড়ছে। পানির স্তর ক্রমাগত নিম্নমুখী হচ্ছে। কোথাও কোথাও এক হাজার ৫০০ ফিট গভীরেও মিলছে না পানির স্তর।
অপরদিকে এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ জাতীয় গড় বৃষ্টিপাতের তুলনায় অর্ধেক। পদ্মায় দেয়া ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে এ অঞ্চলের ৮৫টির বেশি নদ-নদী বছরের বেশিরভাগ সময় শুষ্ক থাকে (শুধু বর্ষাকাল ছাড়া)। নদীগুলোতে সারাবছর পানি না থাকার কারণে ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ হওয়ার সুযোগ পায় না। সব মিলিয়ে ভারসাম্যহীন অবস্থায় চলছে পানি ব্যবস্থা।
নদীর স্তরের সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির একটা সংযোগ রয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানি নদীতে আবার নদী থেকে পানি ভূগর্ভস্থ স্তরে রিচার্জ হয়ে থাকে। বৃষ্টিপাত কম ও ভারতের অভ্যন্তরে সময়ে-অসময়ে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় এ অঞ্চলের অনেক নদীর এই অবস্থা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বর্তমান ভিসি ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার এ তথ্য জানিয়েছেন।
সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক অ্যাটলাস’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের প্রায় ২২টি জেলা খরার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে খুবই উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে ছয় জেলা। এগুলো হল, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের খরাপ্রবণ জেলাগুলোয় মোট জমি রয়েছে প্রায় ৫৪ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর। খরাপ্রবণ এসব এলাকা মূলত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। এর মধ্যে খরাপ্রবণ জেলা ১৩টি, খরা ও বন্যাপ্রবণ জেলা ছয়টি, খরা ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে তিনটি জেলা। নওগাঁ, রাজশাহী, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, ঠাকুরগাঁও এই ছয়টি জেলা খরা’র খুবই উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও পানি বিশেষজ্ঞ চৌধুরী সারওয়ার জাহান সজল বলেন, দেশের জাতীয় বৃষ্টিপাতের গড় ২ হাজার ৫০০ মিলিমিটার। বরেন্দ্র অঞ্চলে ১ হাজার ২০০ মিলিমিটার বা কোনো কোনো এলাকায় তারও কম বৃষ্টিপাত হয়। একদিকে বৃষ্টিপাত কম, অপরদিকে ভূগর্ভস্থ পানি দিনে দিনে নিচে নেমে যাচ্ছে। যে যেমন করে পারছে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে যাচ্ছে। সে কারণে ভয়াবহ পরিস্থিতে দাঁড়িয়েছে ভূগর্ভস্থ পানি।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) এক হিসাব অনুসারে, বরেন্দ্র অঞ্চলের বার্ষিক ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পরিমাণ ১৩ হাজার ৭১০ মিলিয়ন ঘনমিটারের বেশি। বিএমডিএ’র গভীর নলকূপ ছাড়াও বেসরকারি নলকূপ দিয়েও এসব পানি উত্তোলন হচ্ছে। যে পরিমানে পানি উত্তোলন হয় তা দিয়ে এক বিঘা আয়তনের দুই মিটার গভীরতা বিশিষ্ট ১৮ লাখ পুকুর ভরে দেয়া যাবে। বিএমডিএ ছাড়াও অনেক ইন্ডাস্ট্রিজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিভিন্নভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে।
২০২১ সালে পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) বরেন্দ্র অঞ্চলের পাঁচটি ইউনিয়নের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরীক্ষা চালায়। হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিংয়ের মাধ্যমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ৫০টি জায়গায় প্রায় দেড় হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত বোরিং করে এই জরিপ চালিয়েছে ওয়ারপো। জরিপে কোথাও কোথাও পানি স্তরের সন্ধান পাওয়া যায়নি। জরিপে রাজশাহীর তানোর উপজেলা পাচন্দর ইউনিয়ন, মুন্ডুমালা পৌর এলাকা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, নওগাঁর পোরশার ছাওড় ইউনিয়ন এবং সাপাহার উপজেলার সদর ইউনিয়নের বিশেষ কয়েকটি জায়গায় পানির স্তরই পাওয়া যায়নি।
বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রশীদ বলেন, বিএমডিএ এক হাজার ফুট পর্যন্ত গভীরে গিয়েও পানি পায়নি। সেটা কয়েকটি এলাকায়। ভূগর্ভস্থ পানি শুধু বিএমডিএ একা তুলছে না। ব্যক্তিমালিকানায় সাবমার্সিবল পাম্প বসিয়ে পানি তুলে সেচ দেয়া হচ্ছে। তাতেও পাতালের পানি কমছে। কিন্তু বৃষ্টিপাত হচ্ছে না বলে পানির রিচার্জও হচ্ছে না। এর ফলেই একটা সংকট দেখা দিচ্ছে। সে কারণে আমরা কৃষকদের বেশি সেচ লাগে না এমন ফসল চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করছি।
রাজশাহী ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে রাজশাহী মহানগরীতে দৈনিক পানির চাহিদা ১১ লাখ ১৩ হাজার ২৯০ ঘনমিটার। এর বিপরীতে ওয়াসা ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে ১০৮টি গভীর নলকূপ দিয়ে দৈনিক তুলছে ৯৫ হাজার ঘনমিটার পানি। শুধু বর্ষা-পরবর্তী চার মাস (আগস্ট-নভেম্বর) পদ্মা থেকে দৈনিক ৬ থেকে ৯ মিলিয়ন লিটার পানি পাওয়া যায়।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকনুজ্জামান বলেন, প্রতিদিন মাত্রাতিরিক্ত পানি তোলার ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। নিরাপদ খাবার পানির চাহিদা মেটাতে হলে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার ছাড়া বিকল্প নেই। এ কারণেই ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারে জোর দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) রাজশাহী জেলা কমিটির সভাপতি ও রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, গোটা উত্তরাঞ্চলের পাতাল প্রায় পানিশূন্য। পদ্মায় প্রাণ ফিরিয়ে আনতে হবে। তা না হলে কৃষিভান্ডার উত্তরাঞ্চল নষ্ট হয়ে যাবে।
বিএমডিএ’র চেয়ারম্যান বেগম আখতার জাহান বলেন, বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ ১৯৯২ সালে গঠিত হলেও এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়নি। আগামী ৫০ বছরের জন্য মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন প্রয়োজন। খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ায় ভূউপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যেমে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকের পানির চাহিদা পূরণেও যথাযথ পরিকল্পনার এখনই প্রয়োজন।
আনন্দবাজার/শহক









