দেশের উত্তর সীমান্তে ভারতের মেঘালয়ঘেঁষা শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তজুড়ে গারো পাহাড় অবস্থিত। এই বিশাল বনভূমি প্রায় পুরোটাই বন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। এই তিন উপজেলার তিন রেঞ্জের আওতায় প্রায় ২০ হাজার একর বনভূমি রয়েছে। যার মধ্যে দুই হাজার একর পাহাড়ই এখন দখলদারদের কবলে। যার বর্তমান মৌজা অনুযায়ী বাজার মূল্য ১১৬ কোটি টাকার উপরে। পাহাড় কেটে তৈরি করেছে চাষাবাদের জমি, তৈরি হয়েছে নতুন নতুন বাড়ি। আবার দীর্ঘদিন ধরে বসবাসের দোহাই দিয়ে জমি ছাড়ছেন না দখলদাররা। প্রতিনিয়ত দখলের উৎসব চলছে বনভূমিতে। এতে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে গারো পাহাড়।
বন বিভাগ সূত্রমতে, যারা বনের ভেতরে বেশি জমি অবৈধভাবে দখল করে আছে, তাদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ ও ব্যবস্থা নিতে গেলে প্রভাবশালী হওয়ায় উল্টো হামলার শিকার হচ্ছেন তারা। সীমান্তে অবৈধ দখলে থাকা বেশিরভাগ জমিই এখন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় রয়েছে। যে কারণে উচ্ছেদ করতে গেলে নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়।
তবে বনভূমি দেখভাল ও রক্ষায় যে পরিমাণে জনবল থাকা প্রয়োজন, সেই পরিমাণে জনবল নেই বন বিভাগে। জনবল সংকটে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার একাধিক রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে এই সীমান্ত এলাকায় অবৈধভাবে বালু, পাথর উত্তোলনের চেষ্টা করেন কতিপয় ব্যবসায়ী। তাদের বন বিভাগের সর্বশক্তি দিয়ে বাধা প্রদানের চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘসময় দখলে থাকা স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অন্যত্র আবাসনের ব্যবস্থা না করে দিলে তাদের পক্ষে বনের জায়গা ছেড়ে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়।
তথ্যমতে, শেরপুর বন বিভাগের আওতায় রাংটিয়া রেঞ্জে ৮ হাজার ৮৮০ একর, মধুটিলা রেঞ্জে ৪ হাজার ২৩৫ একর এবং বালিজুড়ি রেঞ্জে ৭ হাজার ৩০০ একর বনভূমি রয়েছে। এই তিন রেঞ্জের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাংটিয়া রেঞ্জে ১ হাজার ২০০ একর বনভূমি বেদখলে রয়েছে। যার বর্তমান মৌজাভিত্তিক বাজারমূল্য ৭৫ কোটি ১৩ লাখ ৬০ হাজার ৬২৭ টাকা। বালিজুড়ি রেঞ্জের আওতায় ৪৭০ একর, যার মূল্য ২০ কোটি ৫০ লাখ ৬২ হাজার ২৪৯ টাকা। মধুটিলা রেঞ্জের আওতায় ৬০২ একর বনভূমি বেদখলে রয়েছে। মৌজাভিত্তিক এর বাজারমূল্য ২২ কোটি ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৫৫ টাকা। গেল ৪/৫ মাসে বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের অভিযানে বালিজুড়ি রেঞ্জে ৪০ একর, রাংটিয়া রেঞ্জে ৭০ একর ও মধুটিলা রেঞ্জ থেকে ২৫ একর জমি দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার করেছে। এখনো দুই হাজার একরের উপরে জমি দখলদারদের হাতে রয়েছে।
নালিতাবাড়ীর পানিহাটা গ্রামের বাসিন্দা ফকির মিয়া বলেন, আমার কোনো জায়গা জমি নাই, আমি বনের একটুখানি জমির মধ্যে কোনো মতে থাকি। ঝিনাইগাতীর রাংটিয়া এলাকায় বনের জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন জিতার আলী। তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের আগে থেকে এখানে আমরা থাকি। আমি থাকি, আমার ছেলে থাকে, নাতি- নাতনি থাকে এখানে। আমাদের জায়গা জমি নাই, তাই বনের জায়গাতেই থাকি। বন থেকে সরিয়ে দিলে আমরা কোথায় যাবো। আমাদের আরেক জায়গায় থাকার ব্যবস্থা হলেই আমরা চলে যাবো।
প্রকৃতি ও পরিবেশ বাদী সংগঠন সবুজ আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মেরাজ উদ্দিন বলেন, প্রতিনিয়ত বনের জমি দখল হচ্ছে। এতে বন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এক সময় এই বনের সবুজের সমারোহ ছিল, এখন অনেকটাই কমে গেছে। এটা শুধু দখলদারদের কারণে হয়েছে। তারা বনের গাছগুলো কেটে বসতবাড়ি, চাষাবাদসহ নানা কাজে ব্যবহার করছে। তাই আমরা প্রশাসনেরসু-দৃষ্টি কামনা করি, যাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দখলদারদের কবল থেকে বন রক্ষা করে। আর বন বিভাগের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে যেনো বনের মধ্যে কোনো সবজি বাগান না করে সেখানকার বাসিন্দারা। পাশাপাশি জমি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহণ যেনো করেন।
ঝিনাইগাতী উপজেলা চেয়ারম্যান এসএমএ ওয়ারেজ নাঈম বলেন, সীমান্তের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এখানে বাসবাস করছেন। হুট করেইতো আর তাদের সরানো যাবে না। পর্যায়ক্রমে তাদের পুর্নবাসন করে সরাতে হবে।
শ্রীবরদী উপজেলা চেয়ারম্যান এডিএম শহিদুল ইসলাম বলেন, ইতোমধ্যে বনের কিছু জায়গা উদ্ধার করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি বনের ভেতরে যারা বিভিন্ন খামার, স্থাপনা নির্মাণ করছে বা করা রয়েছে সেগুলো প্রশাসনের মাধ্যমে অভিযান করে ভাঙা হচ্ছে।
শেরপুরের সহকারী বন সংরক্ষক আবু ইউসুফ বলেন, যারা বনের ভেতরে বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা, বিভিন্ন ধরণের খামার, বনের জমিতে অবৈধভাবে বাগান তৈরি করছেন তাদের প্রশাসনের সহায়তায় আমরা উচ্ছেদের কার্যক্রম পরিচালিত শুরু করেছি। ইতোমধ্যে তিন রেঞ্জে অনেক জমি উদ্ধার করেছি। তবে যারা বনের ভেতরে দীর্ঘ সময় ধরে বসবাস করে আসছেন, তাদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে বন থেকে উচ্ছেদ করা হবে। তিনি আশা করছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে বনের জায়গা বাড়তে থাকবে। তিনি আরও বলেন, আমরা দখলদারদের তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছি। উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জবরদখলকারী যেই হোক না কেন, আমরা আমাদের বন বিভাগের জমি অবশ্যই অবৈধ দখলমুক্ত করার চেষ্টা করব।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোমিনুর রশীদ বলেন, জবরদখকারীদের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স, এটা যেই হোক না কেন। ইতোমধ্যে জেলার কয়েকটি জায়গায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যারা দীর্ঘ সময় ধরে বনের ভেতরে বসবাস করে আসছেন, তাদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে উচ্ছেদ করা হবে। পাশাপাশি বন বিভাগের জমিগুলো যেনো বেদখল না হয়, সেদিকেও আমরা কাজ করছি।
আনন্দবাজার/শহক









