টাঙ্গাইল জেলা কারাগার
করোনা সংক্রমণে বন্ধ কারাবন্দি-স্বজনদের সাক্ষাৎ
ধারণক্ষমতার প্রায় চারগুণ কারাবন্দি রয়েছে টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে। কারাগারটিতে দু’ধরণের কারাবন্দি থাকার কথা। একদিকে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি। অন্যদিকে বিচারাধীন হাজতি। টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে ধারণক্ষমতা রয়েছে ৪৬৭ জন কারাবন্দির। অথচ বর্তমানে কারাবন্দির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫শ’র অধিক। অতিরিক্ত বন্দিদের চাপে ব্যবস্থাপনায় অনেকটা হিমশিম খাচ্ছেন কারা কর্তৃপক্ষ। ৪৬৭ জন কারাবন্দির মধ্যে ৪৪৭ জন পুরুষ ও ২০ জন নারী থাকার সুযোগ রয়েছে। অথচ নানা অপরাধে ১৫শ’ বেশি কারাবন্দি রয়েছে কারাগারে। এদের মধ্যে মাত্র ৩০০ জন কয়েদি। বাকি প্রায় সাড়ে ১২শ’ রয়েছে হাজতি। হাজতিদের বেশকিছু মাদক, রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতার আসামি রয়েছে। ২০জন নারীর জায়গায় রয়েছে ৮০ জন নারী। নারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গত সপ্তাহে ১১জন নারীকে টাঙ্গাইল থেকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠিয়েছেন জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষ। এদের সঙ্গে ৪ জন শিশু সন্তান রয়েছে যাদের বয়স ৬ বছরের নিচে। যদিও কারাবন্দিদের করোনা ভ্যাকসিন সম্পন্ন হয়েছে তবুও গাদাগাদি করে কারাবন্দিদের রাখাটাকে স্বাস্থ্যঝুঁকি মনে করছেন স্বজনরা। এ অবস্থায় অতিরিক্ত ভবন নির্মাণসহ ধারণক্ষমতা বাড়ানোর কথা ভাবছেন কারাকর্তৃপক্ষ।
এদিকে টাঙ্গাইল জেলা কারাগারের ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনে নানা পদক্ষেপ হাতে নিয়েছেন বর্তমান জেল সুপার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন। কারাবন্দিরা যেন বাইরে গিয়ে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করে এজন্য কারাবন্দিদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো, মানসম্মত খাবার সরবরহ, ধারণক্ষমতা বাড়ানোসহ একটি আধুনিক কারাগারে রুপান্তরিত করতে কাজ করছেন তিনি।
কারা কর্তৃপক্ষ জানান, কারাবন্দিদের চিকিৎসার জন্য দুইজন চিকিৎসক রয়েছেন। তবে এরা আবাসিক নয়। কারাবন্দিদের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন এসব চিকিৎসক। বর্তমানে কারাগারে সংযোজন করা হয়েছে ইসিজি পরীক্ষা ব্যবস্থা। তবে রোগির জরুরী চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তাদেরকে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। জটিল রোগিদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও পাঠানো হয়ে থাকে। গত সপ্তাহে একজন কয়েদি স্ট্রোক করায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালে আরও উন্নত চিকিৎসার কথাও ভাবছেন কারা কর্তৃপক্ষ।
এদিকে করোনার থাবা পড়েছে কারাগারেও। করোনাকালে কয়েদিদের সাথে সাক্ষাত নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কয়েদি ও তাদের স্বজনরা। প্রতি ১৫ দিনে একবার, বিশেষ প্রয়োজনে সপ্তাহে একবার বা তারও অধিক সময়ে কয়েদিদের সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ করার সুযোগ থাকলেও করোনায় দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষাত বন্ধ রয়েছে। আদালতে হাজতিদের সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাতের সুযোগ থাকলেও কয়েদিরা সাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দ্রুত কয়েদিদের সাথে দেখা করার সুযোগ চালুর দাবি স্বজনদের। সাক্ষাতটা করাটা এখন স্বজন ও বন্দিদের প্রধান চাহিদা। এমনকি জেল সুপার নিজেও চান কয়েদিদের সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি দ্রুত চালু করা হোক। তবে মোবাইলে যোগাযোগ চালু রয়েছে। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে সমাজসেবা ও যুব উন্নয়নের মাধ্যমে কয়েদিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বি করা হলেও করোনার থাবায় প্রশিক্ষণ বন্ধ রয়েছে। পূর্বের প্রশিক্ষিত কয়েদিরা নানা উৎপাদনমূখী কাজ করে যাচ্ছে। কয়েদিরা গামছা, লুঙ্গি ও শো-পিচ তৈরি করছে। উৎপাদিত পণ্যের লাভ্যাংশের অর্ধেক উৎপাদনকারী কয়েদিদের মাঝে বণ্টন করা হয়।
উৎপাদনকারী কাজের সমন্বয়কারী (ইনচার্জ) মধুপুরের কয়েদি মোস্তফা কামাল জানান, তারা নানা ধরণের কাপর ও শো-পিচ তৈরি করছেন। পারিশ্রমিকও পাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, কারাগারে এসেই তিনি প্রশিক্ষিত হয়েছেন। তার সঙ্গে আরও ২৭ জন কয়েদি এসব কাজ করছেন।
অতিরিক্ত কারাবন্দি থাকায় খাবারের সমস্যা হচ্ছে কিনা না জানতে চাইলে কারা কর্তৃপক্ষ জানান, কয়েদির সংখ্যা বাড়লেও প্রতি ব্যক্তি হিসেবে খাবার সরবরহ হয়। সেক্ষেত্রে কয়েদির সংখ্যায় বাড়ায় খাবারের মানের পরিবর্তন হবে না। তবে হাজতির চেয়ে কয়েদির খাবারের মান একটু ভিন্ন। কারণ কয়েদিরা কারাগারে কাজ করেন। খাবারের মেনুতে সাধারণত মাসের ১৬ দিন সকালে সবজি-রুটি, ৮দিন খিচুড়ি ও ৪দিন হালুয়া-রুটি দেওয়া হয়। এছাড়া দুপুর ও রাতে ১৯দিন ভাতের সঙ্গে বিভিন্ন ধরণের মাছ, ৯দিন মাংস। ২৮ দিনই বিভিন্ন ধরণের সবজি থাকে।
কারাব্যবস্থাপনা নিয়ে কারাবন্দিদের স্বজনদের তেমন কোনো অভিযোগ না থাকলেও তাদের দাবি দ্রুত সাক্ষাতের ব্যবস্থা চালু করা। মোবাইলে ভিডিও কলে যোগাযোগেরও দাবি জানান কারাগারের সামনে থাকা স্বজনরা।
বেসরকারি পরিদর্শক বোর্ডের সদস্য টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ ছানোয়ার হোসেন বলেন, করোনাকালে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো কারাগারেও কিছু নিয়ম বেধে দেওয়া হয়েছিল। করোনা পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। এখন স্বজন ও কারাবন্দিদের অন্যতম দাবি সাক্ষাৎ করা। এটা তাদের অধিকারও। সেহেতু আগামী মিটিংয়ে স্বজনদের সাক্ষাতের বিষয়টি তুলে ধরবো। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার প্রস্তাবনা জানাবো। এছাড়া কারাগারে নতুন একটি ভবন তৈরি করা হয়েছে। আরও দুটি ভবনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকা থেকে টিম পরিদর্শন করেছে। শিগগিরই টাঙ্গাইল জেলা কারাগারটি আধুনিক কারাগার রুপান্তরিত হবে।
সরকারি পরিদর্শক বোর্ডের সভাপতি টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. মো. আতাউল গণি বলেন, কারাগারটি অত্যন্ত পুরনো। কারাগারটি আধুনিককরণে নানা পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে। আরও ভবন বাড়ানোর প্রস্তাবনা রয়েছে। এটা বাস্তবায়ন হলে একটি আধুনিক কারাগারে রুপান্তর হবে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের নির্দেশনা পেলেই দ্রুত স্বজনদের সাক্ষাৎ কার্যক্রম পূণরায় চালু করা হবে।
মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার টাঙ্গাইল শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান আজাদ বলেন, টাঙ্গাইল কারাগারে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার নেই। এতে কিছু সময় ভিকটিমদের কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়। কাশিমপুর থেকে টাঙ্গাইল আদালতে আসতে বিড়ম্বনা হয়। বিড়ম্বনা কমাতে টাঙ্গাইল কারাগারে এ সেলটি চালু করাটা জরুরি।
টাঙ্গাইল কারাগারের জেল সুপার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, কারাগারের ব্যবস্থপনা নিয়ে অনেক সময় নানা ধরণের প্রশ্ন উঠে। আমি সেই অবস্থার পরিবর্তন আনতে কাজ করছি। এ মুহুর্তে কারাবন্দি বা স্বজনদের তেমন কোনো অভিযোগ নেই। তবে কারাগারের ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। পুরনো ভবনগুলো পরিবর্তন করে নতুন ভবন তৈরি করাটা জরুরি। ইতিমধ্যে ভবন বাড়ানোসহ আধুনিক প্রশিক্ষণের চাহিদার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। শিগগরিই বাস্তবায়ন হবে। এছাড়া এ কারাগারে চারটি পাওয়ার লোম আছে। সেগুলো দিয়ে ৩০জন কয়েদি কাপড় উৎপন্ন করছেন। প্রশিক্ষণের প্রকার বাড়াতে পারলে আরও বেশি কয়েদি কাজে লাগানো সম্ভব হবে।









