বেড়েছে তদারকি, ঢিলেমির সুযোগ নেই: আইএমইডি সচিব
পদ্মা সেতুর সড়কপথের কার্পেটিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। গত ১০ নভেম্বর সকাল থেকে এ কার্পেটিং শুরু হয়। ওয়াটার প্রুফ লেয়ারের ওপরে ১০০ মিলিমিটার পুরুত্বের এই কার্পেটিং হচ্ছে দুই লেয়ারে। সেতুর ৪০ নম্বর খুঁটির কাছ থেকে ৬০ মিলিমিটার পুরুত্বের প্রথম লেয়ারের কাজ চলছে বলে আনন্দবাজারকে জানিয়েছেন পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, দ্বিতীয় লেয়ারে আরও ৪০ মিলিমিটার পুরুত্বের কার্পেটিং করা হবে। দুই লেয়ারে ১০০ মিলিমিটার পুরুত্বের এই কার্পেটিং বিশ্বমানের।
প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৗশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মো. জাহাঙ্গীর জানান, প্যারাপেট ওয়াল স্থাপন ও ডিভাইডার নির্মাণ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। এক্সপানশন জয়েন্টের কাজও চলছে পুরোদমে। মূল সেতুর অগ্রগতি ৯৫ শতাংশের বেশি। আর সেতুর সার্বিক অগ্রগতি প্রায় ৮৯ শতাংশ। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুতে ৪২টি পিলারের ওপর ৪১টি স্প্যান (মূল কাঠামো) বসানো হয়েছে। এসব স্প্যানের ওপরে সড়কপথ ও নিচে রেললাইন তৈরি করা হচ্ছে। আগামী ২০২২ সালের জুন মাসে যানবাহন চলাচলের জন্য পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
সরকারের আরেক মেগা প্রকল্প মেট্রোরেলের কাজও এগিয়ে চলেছে। এরই মধ্যে পরীক্ষামূলক কোচ চালানো হয়েছে। শুরুর দিকে যথেষ্ট ধীরগতি থাকলেও সরকারের বেশকিছু মেগা প্রকল্পই এখন এরকম অনেকটাই হয়ে উঠেছে দৃশ্যমান। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিও বেড়েছে। সার্বিকভাবে সাত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি অবশ্য এখনো ৫০ শতাংশ অতিক্রম করেনি। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে প্রকল্পগুলোতে কিছুটা স্থবিরতাও ছিল। তবে সবগুলো প্রকল্পেই এখন কাজ চলছে পুরোদমে। তাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী আনন্দবাজারকে বলেন, আমরা এমনিতেই প্রকল্পগুলো কঠোরভাবে মনিটরিং করছি। তার ওপর আবার আমাদের কাছে নির্দেশনা রয়েছে, প্রতিটি ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত প্রকল্প প্রতি চার মাসে অন্তত একবার সরেজমিন পরিদর্শন করতে হবে এবং তার প্রতিবেদন দিতে হবে। প্রকল্পগুলোতে তাই কোনো ধরনের ঢিলেমির সুযোগ নেই।
সরকারের সাত অগ্রাধিকার মেগা প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে, পদ্মা বহুমুখী সেতু, রূপপুর পরামাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, মেট্রোরেল লাইন-৬, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ এবং দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছাকাছি ঘুনধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প। এই সাত প্রকল্পের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬২ হাজার ৯২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডির সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত প্রকল্পগুলোতে খরচ হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে এখন পর্যন্ত সাত প্রকল্পের মোট আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৪২ শতাংশ। আইএমইডি’র প্রতিবেদনটি বলছে, শুরুতে ধীর গতি থাকলেও এখন যেভাবে প্রকল্পগুলোতে গতি ফিরেছে তাতে নতুন করে আশার আলো দেকা যাচ্ছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন নিয়ে নজরদারিও বেড়েছে। ফলে প্রকল্পগুলো এখন দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনের তথ্য মতে, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৬ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৮৬ দশমিক ২৫ শতাংশে, ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৯৫ শতাংশ। গত বছরের প্রায় একই সময়ে প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি ছিল ৮১ শতাংশ। আগামী বছরের জুন নাগাদ প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছে কাজ।
এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের প্রকল্পটি হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ৪৩ হাজার ১৭৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৩৮ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এক বছর আগেও প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ছিল ২৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। সে হিসাবে ১১ শতাংশেরও বেশি কাজ এগিয়েছে এর মধ্যে। প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্পটি এখন ১২টি প্রকল্পের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো কার্যক্রম নামে অভিহিত করা এই প্রকল্পে। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ৫০ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৫৯ শতাংশ। অথচ গত বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ছিল ৩১ দশমিক ৬০ শতাংশ। সে হিসাবে এই সময়ের মধ্যে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি এগিয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ।
রাজধানীবাসীর স্বপ্নের মেট্রোরেল প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় করা হচ্ছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১৬ হাজার ৫৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৭৩ দশমিক ৩৪ শতাংশে। প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৫০ শতাংশের বেশি। ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়িত হচ্ছে প্রকল্পটি। তবে প্রকল্পের উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশের কাজ প্রায় শেষ দিকে। সরেজমিনে দেখা গেছে, আগারগাঁও অংশে স্টেশন নির্মাণের কাজ চলছে রাতদিন। আগামী বছর ডিসেম্বর মাসে এ অংশটিতে যাত্রী নিয়ে ট্রেন চলাচল করবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৭০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি ৭০ দশমিক ১৯ শতাংশ। এর ভৌত অগ্রগতিও ৮৩ শতাংশ পেরিয়ে গেছে। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রাও তাই পূরণ হবে বলেই আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।
পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ১৯ হাজার ৫৬৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৪৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। আর প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৪৪ দশমিক ৫০ শতাংশে। গত বছরের জুলাইয়ে এই প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ছিল ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ এই সময়ে প্রায় ২০ শতাংশ এগিয়েছে প্রকল্পটির কাজ। এটি ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।
অন্যদিকে, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছাকাছি ঘুনধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণের প্রকল্পটির খরচ ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এতে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৮১ শতাংশে। এছাড়া প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৬৩ শতাংশ, যা গত বছরের জুলাইয়ে ছিল ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে প্রায় ২২ শতাংশ কাজ এগিয়েছে এই প্রকল্পটির।
সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা এসব মেগা প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আইএমইডি সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী আনন্দবাজারকে বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে প্রকল্পগুলোর কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। তবে এখন সবগুলো প্রকল্পই এগিয়ে চলেছে। পুরোদমে কাজ চলছে। প্রকল্পের গতি বাড়াতে আমরা বিভিন্ন সময় প্রয়োজনীয় সুপারিশগুলো দিয়ে যাচ্ছি।
আনন্দবাজার/শহক









