চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আর নিষেধাজ্ঞায় ধাক্কা লাগে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ফলে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি আমদানি ব্যয় বাড়ায় দেশে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে থাকে। এমতাবস্থায় বাণিজ্য ঘাটতি মোকবিলা ও ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেয় সরকার। প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। বেশকিছু বিলাসী পণ্যে আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ব্যয়ের লাগাম টানার চেষ্টা করা হয়।
এসব পদক্ষের পাশাপাশি প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার সতর্কতার সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয় বরাদ্দ করছে। ফলে গেল বছরের তুলনায় চলতি বছরে প্রকল্পের সংখ্যা কমে এসেছে। যেসব প্রকল্প কম গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোর কাজ পিছিয়ে দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যয় সাশ্রয়ের এতো পরিকল্পনা আর পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচন কতটা হচ্ছে তা বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
তবে অতিরিক্ত খরচ, বেতন-ভাতার বিলাসিতা আর এক প্রকল্প শেষ না করেই আরেক প্রকল্প গ্রহণের ফলে পল্লী সড়কে সেতু নির্মাণ প্রকল্পে বাহারি ব্যয়ের চিত্র দেখা যাচ্ছে। মূলত, গ্রামীণ বিভিন্ন সড়ক ও সেতু নির্মাণের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা সরকারের নিয়মিত কাজ। এর মাধ্যমে পরিবহন ব্যয় হ্রাস ও সহজীকরণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করা ছাড়াও আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান বেড়ে যায়। এই লক্ষ্য নিয়েই প্রকল্প হাতে নেয় সরকার।
তথ্যমতে, সরকারের নেয়া ‘পল্লী সড়কে সেতু নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ৫০ কোটি টাকা। চলতি জুলাই থেকে আগামী ২০২৭ সালের জুলাই মাসের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। পাঁচবছর মেয়াদি এ প্রকল্পটি গেল মার্চে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় দেশের ৮ বিভাগের ৩৫ জেলার ৫৮টি উপজেলায় ৮২টি সেতু নির্মাণ হবে। এসব এলাকার বিভিন্ন সড়কে ১৭ কিলোমিটার ৬৯৭ মিটার দৈর্ঘের সেতু বা ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। তাছাড়া ৩৮ কলোমিটার ৮০০ মিটার ব্রিজের সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে। আর চার কিলোমিটার ২৩০ মিটার নদী শাসনের কাজ করা হবে। মোট ৭৫ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ হবে।
এলজিইডি গ্রামীণ সড়কে বছরের পর বছর ধরে ছোট ছোট ব্রিজ নির্মাণ করে থাকলেও শুধু এই প্রকল্পের প্রস্তাবনাতেই বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়। যদিও পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন কমিটির প্রথম বৈঠকেই সেই প্রস্তাবনা বাদ দেয়া হয়। একই সঙ্গে পরামর্শক ব্যয়ও ১৫৫ কোটি থেকে প্রায় অর্ধেকের বেশি কমিয়ে ৭৫ কোটিতে নামিয়ে আনা হয়। তবে স্থানীয় পর্যায়ে প্রকল্পে এতো বেশি পরামর্শক ব্যয় প্রকল্পের ব্যয়ের বোঝাকে আরও বেশি ভারী করে। একই বৈঠকে পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করে বিভিন্ন কাজের ব্যয় চূড়ান্ত করতে বলা হয়। পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণ- নদী শাসন ও ব্রিজের সঙ্গে সংশিষ্ট অন্যান্য ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেয়া হয়। তারপরও প্রকল্পটির বিভিন্ন অংশে ব্যয় সাশ্রয় কতটা যৌক্তিক পর্যায়ে রয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
প্রকল্পটির বিভিন্ন অঙ্গভিত্তিক ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশে প্রশিক্ষণ বাদ দেওয়া হলেও দেশে প্রশিক্ষণের জন্য থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক কোটি ৭০ লাখ টাকা। পাশাপাশি সেমিনারের জন্য রাখা হয়েছে এক কোটি টাকার থোক বরাদ্দ। ফলে সেমিনার-প্রশিক্ষণের ব্যয় দাঁড়ায় এক কোটি ৭০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে শুধুমাত্র সিল ও সিল দেয়ার স্ট্যাম্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে অর্ধকোটি টাকা। আর ফটোকপি বা অনুলিপি ও মুদ্রণ-বাঁধাইয়ের জন্যও বরাদ্দ সাড়ে ৩২ লাখ টাকা। যেখানে ৬টি ফটোকপি মেশিনের দাম ধরা আছে ৩৬ লাখ টাকা। এদিকে ব্রিজের প্রকল্পে অডি-ভিডিও প্রচারণার জন্য রাখা হয়েছে ৮ কোটি টাকা। তাছাড়া প্রকল্পের জন্য ৪০টি মোটরসাইকেল কেনা বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৬ লাখ টাকা। দুটি জিপ এক কোটি ৮৮ লাখ আর ৮টি পিকআপ ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এসবের জ্বালানি খরচ বাবদ বরাদ্দ আছে পাঁচ কোটি টাকা। তারপরেও অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা।
এদিকে, প্রকল্পের ১০ জন অফিসার ও ৪ জন কর্মচারির জন্য বেতন-ভাতা ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এখানে ১৩ ধরনের ভাতা যুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের মেয়াদ ৬০ মাস হিসাবে প্রতি মাসে বেতন-ভাতা পড়ে গড়ে ১২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা করে। তবে ৪ জন কর্মচারীর বেতন কম ধরে হিসাব করলে অফিসারদের বেতন ১৩ লাখ টাকার বেশি পড়বে।
এ প্রকল্পে ব্যয়ের বিলাসিতা নিয়ে জানতে চাওয়া হয় পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) শরিফা খানের কাছে। সরকারের এ সচিব বলেন, আমরা চেষ্টা করি বাস্তবতার নিরিখে যতটুকু সম্ভব ব্যয়টাকে যৌক্তিক পর্যায়ে হ্রাস করার। সবক্ষেত্রে শতভাগ করা তো সম্ভবও না। যেসব জায়গায় প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত না করে ব্যয় কমানের সুযোগ আছে সেসব ক্ষেত্রে আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা করি কমিয়ে দেয়ার।
এর আগে এ প্রকল্পটির ব্যয় প্রস্তাব করো হয়েছিল ৫ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। যেখানে ৯০টি মটরসাইকেল, ৪৪টি পিকআপ কেনার প্রস্তাব করা হয়েছিল। অন্যদিকে পল্লী সড়কে ১৩০টি সেতু নির্মাণের প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পটি এখনো চলমান রয়েছে। ২০১৭ সাাল থেকে ২০২১ সাল মেয়াদের প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। পরে প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়িয়ে ব্যয় ধরা হয় ৬ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। পাঁচ বছরে প্রথম পর্যায়ের প্রকল্প শেষ না করেই কেন দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয় সেটি নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে। এদিকে প্রথম পর্যায়ের প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে একাধিকবার ফোন করলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
একটি প্রকল্প শেষ না করেই আরেকটি প্রকল্পের অনুমোদন বিষয়ে জানতে চাইলে ফাইল না দেখে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন পরিকল্পনা কমিশনের সচিব শরিফা খান। তিনি বলেন, আমার বিভাগে ৪৬৫টি চলমান প্রকল্প রয়েছে। তাছাড়া বেশ কিছু প্রক্রিয়াধীন প্রকল্প রয়েছে। ফলে না দেখে সঠিক তথ্য দেওয়া যাবে না।
তবে একটা প্রকল্প শেষ না করেই আরেকটা প্রকল্প শুরুর বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মূখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, শুধু প্রকল্প বাড়ানোকেই অর্জন হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে। একই ধরণের প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন চলে আসে আগেরটার কী হলো? আপাতদৃষ্টিতে এগুলো যৌক্তিক মনে হয় না। কারণ, একটা প্রকল্প শেষ করতে না পারার পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব রয়েছে। আগের প্রকল্পটা কেন শেষ হলো না, কবে শেষ হবে; এসবের সুনির্দিষ্ট পথনকশা না করে একই ধরণের আরেকটা প্রকল্প নিয়ে নেওয়া। এতে নতুন প্রকল্প পরিচালক, প্রশিক্ষণ ভ্রমণ এসব ব্যয় হয়। তবে মূল কাজ কতটা হবে সেটাই দেখার বিষয়।
প্রকল্প শেষ না হতেই একই ধরণের আরেকটা প্রকল্প নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল এলজিইডি বিভাগের প্রতি। এলজিইডির পরিকল্পনা, ডিজাইন ও গবেষণা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আহসান হাবিব বলেন, এটা যৌক্তিক এ কারণে যেহেতু দেশে অনেক ব্রিজের প্রয়োজন আছে। একেকটা প্রকল্পের মাধ্যমে একেকটা এলাকায় কাজ হয়। চাহিদা বেশি থাকায় একটা প্রকল্পে যেহেতু সব কাজ সম্ভব না, তাই আরেকটা প্রকল্প নেয়া হয়েছে। একটা শেষ করে আরেকটা শুরু করলে অনেক সময় লাগবে তাই পাশাপাশি প্রকল্প নেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, এলজিইডি বিভাগ দেশব্যাপী উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়কে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৯৫১টি কালভার্ট বা সেতু নির্মাণ করেছে। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭০ মিটার। আগামীতে আরও ৬৯ হাজার ১২৩টি সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে সরকারি এ বিভাগটি। তবে এত বিশাল কর্মযজ্ঞে বিশাল ব্যয়েল বহর যৌক্তিক পর্যায়ে কতটা কমানো যাবে তা নিয়ে ভাবতে হবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের।
আনন্দবাজার/শহক









